RK NEWZ মাটির নীচে ঠিক কত পরিমাণ ওষুধ লুকিয়ে রাখা হয়েছে তা নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নামাতে হয়েছে জেসিবি। উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ ওষুধের মোট বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সরকারি ও বেসরকারি স্তরের এত বিপুল পরিমাণ ওষুধ কোথা থেকে এল? মাটি খুঁড়তেই একের পর এক প্লাস্টিকের বস্তায় বেরিয়ে আসছে বিপুল পরিমাণ জীবনদায়ী ওষুধ! চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার সরিষার হিঞ্চাবেড়িয়া এলাকায়। মাটির নীচে ঠিক কত পরিমাণ ওষুধ লুকিয়ে রাখা হয়েছে তা নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নামাতে হয়েছে জেসিবি। উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ ওষুধের মোট বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সরকারি ও বেসরকারি স্তরের এত বিপুল পরিমাণ ওষুধ কোথা থেকে এল? এর পেছনে কি কোনও বড়সড় জাল ওষুধ পাচার চক্র কাজ করছে, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কোনও গভীর রাজনৈতিক দুর্নীতি? রহস্যভেদে ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন ড্রাগ কন্ট্রোল বোর্ডের সদস্য এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পারুলিয়া কোস্টাল থানার পুলিশ। উদ্ধার হওয়া এই কোটি কোটি টাকার ওষুধের বস্তাগুলি ঘিরে সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে একটি বিশেষ কারণে। মাটিতে পুঁতে রাখা প্রতিটি ওষুধের পাত ও প্যাকেটের গায়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা স্থানীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘সেবাশ্রয়’-এর অফিশিয়াল লোগো লাগানো রয়েছে। তাই স্বভাবতই চরম অস্বস্তিতে পড়েছে জোড়াফুল শিবির। কেন সাধারণ মানুষের জন্য আনা কোটি টাকার ওষুধ এভাবে মাটির নীচে লোকচক্ষুর আড়ালে পুঁতে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে হাজারো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই ঘটনা সামনে আসতেই কোমর বেঁধে ময়দানে নেমে পড়েছে পদ্ম শিবির। ডায়মন্ড হারবারে মাটির নীচে ওষুধ পুঁতে রাখার এই ঘটনাকে এক বিরাট আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি বলে দেগে দিয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগের তির ছোড়া হয়েছে মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক শামীম আহমেদের দিকে। বিজেপির দাবি, সাধারণ ও গরিব মানুষের চিকিৎসার নামে ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরের আড়ালে এভাবেই কোটি কোটি টাকার ওষুধ চুরি করা হয়েছিল। যে ওষুধগুলি উদ্ধার হয়েছে সেগুলির সিংহভাগেরই এখনও মেয়াদের সময়সীমা রয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর নিজেদের চুরির প্রমাণ ও বিপুল দুর্নীতি ঢাকতেই তড়িঘড়ি সেগুলি মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। বিজেপির তোলা সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। মগরাহাটের বিধায়ক বা স্থানীয় নেতৃত্ব এই ঘটনার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নন বলে দাবি করা হয়েছে। ডায়মন্ড হারবার তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, মাটির নীচ থেকে যে সমস্ত ওষুধপত্র উদ্ধার হচ্ছে, তার বেশিরভাগই আসলে বহু আগে ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ’ বা এক্সপায়ারড হয়ে গিয়েছিল। মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া ওষুধ তো আর মানুষকে দেওয়া যায় না, তাই হয়তো তা মাটিতে পুঁতে নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল। তবে দলেরই একাংশ আবার এর দায় সরাসরি এড়াতে চেয়ে বল ঠেলে দিয়েছেন স্বয়ং অভিষেকের কোর্টে। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, “ওই ওষুধগুলি সাংসদ নিজে ডায়মন্ড হারবারের মানুষের জন্য এনেছিলেন। তাই এই ওষুধের বিষয়ে যা বলার বা উত্তর দেওয়ার, তা তিনিই দিতে পারবেন।” বিগত দিনে করোনা পরিস্থিতি এবং তার পরবর্তী সময়েও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব উদ্যোগে ও পরিকল্পনায় ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ৭টি বিধানসভা এলাকাতেই অত্যন্ত সাড়ম্বরে চালু হয়েছিল এই ‘সেবাশ্রয়’ শিবির। এই সমস্ত শিবিরের মাধ্যমে এলাকার সাধারণ ও দুঃস্থ মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নতমানের চিকিৎসা পরিষেবা ও বিভিন্ন জটিল মেডিক্যাল পরীক্ষা করানোর সুযোগ দেওয়া হত। একই সঙ্গে শিবির থেকে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিখরচায় ওষুধও বিলি করা হত। নিজের এই ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বারংবার গর্ব প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এমনকি ডায়মন্ড হারবারের সাফল্য দেখে রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও এই পরিষেবা চালু করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই গর্বের ‘সেবাশ্রয়’-এর কোটি কোটি টাকার ওষুধ যেভাবে আবর্জনার মতো পোঁতা অবস্থায় উদ্ধার হল, তা ডায়মন্ড হারবার মডেলের স্বচ্ছতা ও উদ্দেশ্য নিয়েই এক বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।
আলিপুরের ভবানী ভবনে হাজিরা দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দর থেকে নেমে প্রথমে কালীঘাটের বাড়ি যান এবং সেখান থেকে সরাসরি সিআইডি দফতরে পৌঁছান তিনি। আদালতের তরফ থেকে রক্ষাকবচ দেওয়া থাকলেও, সিআইডির বিশেষ তদন্তকারী দলের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় এই তৃণমূল সাংসদকে। দীর্ঘ প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে চলে এই জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব। অবশেষে সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ভবানী ভবন থেকে বাইরে বের হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানী ভবন থেকে বেরিয়ে সোজা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে যান অভিষেক। সেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে সম্পূর্ণটা জানান। বৃহস্পতিবার বিকেল ৬টার মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতার সিআইডি সদর দফতর অর্থাৎ ভবানী ভবনে হাজিরা দিতে হত। কলকাতা হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া সেই চরম ডেডলাইনের মাত্র ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট আগে তিনি কলকাতায় নামায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে উত্তেজনা পারদ এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে যায়। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি নিয়ে অভিষেক প্রথমে নিজের বাড়ি যান। তার তিনি ভবানী ভবনে পৌঁছন।
এই মামলায় সিআইডি তরফে বলা হয়, তিনটে নোটিস দেওয়া হয়েছে। সব নোটিসেরই মেয়াদ শেষ। তাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আবেদন আর গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি চাইলে সিআইডি অফিসে যেতে পারেন। রক্ষাকবজ দেওয়ার দরকার নেই। তদন্তকারী সংস্থার তরফে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই অধ্যক্ষকে রেজোলিউশন পাঠিয়েছিলেন। যেখানে সবার স্বাক্ষর ছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বিধায়ক অভিযোগ জানান স্বাক্ষর নিয়ে। সিআইডি-র অভিযোগ, অনেক বিধায়কই বলছেন যে তাঁরা সেদিন ছিলেন না, যেদিন রেজোলিউশন ডেট বলা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষিতে তদন্তে উঠে আসছে প্রাথমিকভাবে এই অপরাধ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন। এই প্রেক্ষিতেই তাঁদের প্রশ্ন, হেফাজতে না নিলে তদন্ত কীভাবে হবে?





