মেক্সিকো: ২ (জুলিয়ান, রাউল)
দক্ষিণ আফ্রিকা: ০
RK NEWZ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত সূচনা মেক্সিকোর। ম্যাচে গোলের পাশাপাশি ছিল তিনটি লাল কার্ড, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসেও বিরল ঘটনা। সালটা ১৯৮৬। ১ লক্ষ ১৪ হাজারেরও বেশি দর্শকে গমগম করছে মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়াম। যে উন্মাদনার সামনে পশ্চিম জার্মানিকে ৫ গোলের মালা পরিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলেছিল ডিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্টিনা। আজ সেই মাঠেই ২০২৬ ফুটবলের মহাযুদ্ধের উদ্বোধনী ম্যাচে তৃপ্তির হাসি হাসল হোম ফেভারিটরা। ১৬ বছর আগে ২০১০ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে এই দক্ষিণ আফ্রিকার কাছেই আটকে গিয়েছিল মেক্সিকো। মহাযজ্ঞের সূচনায় যেন তারই মধুর প্রতিশোধ নিলেন হাভিয়ের আগুইরিওর ছেলেরা। গোটা ম্যাচে দাপট দেখিয়ে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের জমকালো সূচনা ঘটাল মেক্সিকো। উদ্বোধনী আসরে শাকিরা ছিলেন। ম্যাচে ছিল গোল। ছিল উত্তেজনা আর বিশ্বকাপ-রেকর্ড-ছোঁয়া তিনটি লাল কার্ড! সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ২০২৬-এর প্রথম ম্যাচে ফুটবলের পাশাপাশি শৃঙ্খলাভঙ্গও সমানভাবে আলোচনায় চলে এল। মেক্সিকো সিটিকে বা মেক্সিকো সিটির স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল মেক্সিকো। স্কোরলাইন হয়তো ২-০। কিন্তু খেলার ছবিটা আরও একপেশে। বল দখল, আক্রমণ, সুযোগ তৈরি—প্রায় সব বিভাগেই এগিয়ে সহ-আয়োজক টিম। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা আক্রমণে নিষ্প্রভ, রক্ষণে অগোছালো এবং আচরণে বেপরোয়া। শেষ পর্যন্ত দুই লাল কার্ড দেখে নয়জন নিয়ে ম্যাচ শেষ করতে হয় তাদের। শুরুতেই ভুল, শুরুতেই শাস্তি
ম্যাচের নবম মিনিটেই এগিয়ে যায় মেক্সিকো। মাত্র ৯ মিনিটেই দুরন্ত গোল করে দলকে এগিয়ে দেন জুলিয়ান কিনিওনেস। বক্সের সামনে দাঁড়ানো সতীর্থ ডিফেন্ডারকে উদ্দেশ্য করে পাস করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা গোলকিপার রনওয়েন উইলিয়ামস। সেই বল কেড়ে নেন মেক্সিকোর এরিক লিরা। সাজিয়ে দেন জুলিয়ান কুইনোনেসকে। ভুল করেননি মেক্সিকান উইঙ্গার। এবছর সৌদি প্রো লিগে ইভান টোনি-ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মতো তারকাকে টেক্কা দিয়ে গোল্ডেন বুট জিতে বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন জুলিয়ান। তাঁর শট দক্ষিণ আফ্রিকা গোলকিপারের পাঁয়ের ফাঁক দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। এরপর জুলিয়ানের একটা দুরন্ত শট পোস্টে লেগে না ফিরলে প্রথমার্ধেই দু’গোলে এগিয়ে যেত মেক্সিকো। দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস মাঝমাঠে ভুল পাস বাড়ান। সেই সুযোগ কাজে লাগান গুতিয়েরেস। তাঁর পাস থেকে জুলিয়ান কিনিওনেস একা গোলের সামনে পৌঁছে বল জালে জড়ান। এটাই ছিল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর প্রথম, একইসঙ্গে বিশ্বকাপে মেক্সিকোর তৃতীয় দ্রুততম গোল। এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেয় মেক্সিকো। দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ গড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে তারা। প্রথমার্ধে রাউল হিমেনেস গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান। কিনিওনেসের একটি শট পোস্টেও লাগে। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে তখন ১-০ ব্যবধানই যেন স্বস্তির। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বিপদ আরও বাড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার। ৫০ মিনিটে ইয়াইয়া সিথোলে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। গুতিয়েরেসকে ফাউল করে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। একজন বেশি নিয়ে খেলতে নেমে চাপ বাড়ায় মেক্সিকো। ফল মেলে ৬৭ মিনিটে। রবার্তো আলভারাদোর নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করেন রাউল হিমেনেস। ২০২০ সালে ভয়াবহ মাথার চোটে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের নাম লেখালেন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। গোলের পর তাঁকে তুলে নেন কোচ। ম্যাচের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার থেম্বা জোয়ানে নিয়মবিরুদ্ধ আগ্রাসী আচরণের জন্য দ্বিতীয় লাল কার্ড দেখেন। ২০০৬ সালের পর বিশ্বকাপে এক ম্যাচে দু-দুটো লাল কার্ড দেখা প্রথম দলের অনভিপ্রেত রেকর্ড অর্জন করল দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের অন্তিম লগ্নে নাটকের শেষ অঙ্কের নায়ক মেক্সিকোর অধিনায়ক সিজার মন্টেস। অতিরিক্ত সময়ে প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সুযোগ আটকাতে গিয়ে তিনিও লাল কার্ড দেখেন। যার অর্থ চলতি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তিন-তিনটি রেড কার্ড। উল্লেখ্য, ২০২২ বিশ্বকাপের পুরো আসরে মোট চারটি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। লড়াইয়ের পরিসংখ্যানেও মেক্সিকোর আধিপত্য স্পষ্ট। ৬১ শতাংশ বল দখল, ১৫টি শট এবং পুরো ম্যাচ জুড়ে নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। দক্ষিণ আফ্রিকার শট মাত্র চারটি। ৮২ মিনিটে প্রতিপক্ষের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে লাল কার্ড দেখেন তাঁর সতীর্থ তেম্বা জওয়ানে। প্রাথমিকভাবে হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন রেফারি। তবে ভিএআর দেখে নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেন তিনি। শেষ লাল কার্ডটা দেখলেন মেক্সিকান ডিফেন্ডার সিজার মন্টেস। বক্সের মুখে প্রতিপক্ষকে ফাউল করে। সঙ্গে আরও তিন ফুটবলারকে হলুদ কার্ডও দেখিয়েছেন রেফারি। সবমিলিয়ে হাজারো বিতর্কের মাঝে প্রত্যাশিত উত্তেজনা নিয়েই বিশ্বকাপের ঢাকে কাঠি পড়ল। এই জয়ের সুবাদে গ্রুপ ‘এ’-তে শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট তুলে নিল মেক্সিকো। পরের ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে এখন কঠিন সমীকরণ। চেকিয়ার বিরুদ্ধে জয় না পেলে নকআউটের রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।





