RK NEWZ দলটির বয়স ২৮ বছর পাঁচ মাস। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে মমতা তৃণমূল তৈরি করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। ৩ জুন, ২০২৬ ভেঙে গেল তৃণমূল। তীব্র বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে এসে দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকার পর মাত্র ১৩ দিনে লন্ডভন্ড হয়ে গেল দিদির জোড়াফুলের বাগান। ২২ মে যার সূচনা হয়েছিল দিল্লির বঙ্গভবনে। যে দিন রাজধানীতে ‘আচমকা’ দেখা হয়ে গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রতের। ভোটের ফলপ্রকাশ হয়েছিল ৪ মে। জুনের ৪ তারিখ আসার আগেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল তৃণমূল। ২২ মে-র আগেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। যা কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিনের ভিতপুজো করে দিয়েছিল। ৪ মে ফল ঘোষণার পরে ৬ মে কালীঘাটের বাড়ির লাগোয়া দফতরে জয়ী বিধায়কদের বৈঠক ডেকেছিলেন মমতা। সেই বৈঠকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাকে সম্মান জানাতে সকলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতা। যা তৃণমূলের অনেককেই ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল। তার পর থেকেই তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ঐক্যের সুর কাটতে শুরু করে। ১৯ মে ফের একটি বৈঠক হয় কালীঘাটে। সেখানেই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটান ঋতব্রত এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। ফলতার জাহাঙ্গির খান ভোটের মাঠ ছাড়ার ঘোষণার পরেও কেন তাঁকে দল বহিষ্কার করছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন ঋতব্রত এবং সন্দীপন। তৃণমূল তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, জাহাঙ্গির অভিষেকের লোক। ফলে ঋতব্রতদের নিশানায় যে আসলে ছিল অভিষেক, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। রুশ দেশের বলশেভিক বিপ্লব নিয়ে জন রি়ড লিখেছিলেন ‘দুনিয়া কাঁপানো ১০ দিন’। যে বিপ্লবের পরে ভেঙে পড়েছিল জারের শাসন। প্রাক্তন সিপিএম নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ দেখল ‘কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিন’! এ-ও এক বিপ্লবই বটে। যার জেরে ভেঙে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। দল থেকে সিপিএম বহিষ্কার করার পরে তৃণমূল করেছেন ঋতব্রত। গত পাঁচ বছরে একাধিক বার বলেছেন, মমতার মধ্যে তিনি লেনিনকে দেখতে পান। বলশেভিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেনিনই। আর তৃণমূল চুরমার করার নেতৃত্ব দিলেন মমতাকে ‘লেনিন’ বলা ঋতব্রত।

সকাল ১০টা থেকে বিধানসভায় প্রবেশ করতে শুরু করেন তৃণমূল বিধায়কেরা। ৫৮ জনের স্বাক্ষরিত চিঠি স্পিকারের হাতে জমা দেন ঋতব্রত, সন্দীপনেরা। যেখানে ঋতব্রতকে বিরোধীদলনেতা হিসাবে মেনে নিয়েছেন বাকিরা। চার উপদলনেতার মধ্যে রয়েছেন জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, সন্দীপন ও শিউলি সাহা। মুখ্যসচেতক করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। তার পরেই ঋতব্রত, সন্দীপনেরা চলে যান নবান্নে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে। যেমনটা ঋতব্রত জানিয়েছিলেন ২২ মে। দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। শুধু ঋতব্রতেরা নন। তাঁদের সঙ্গে না-থাকা নয়না, কুণাল, ববিরাও হাজির ছিলেন নবান্ন-বৈঠকে। স্পিকারের সচিবালয়ে অভিষেকের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ফের শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা, নয়না ও অসীমাকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক করার দাবি জানানো হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে কুণালদের চিঠি গ্রহণ করেনি স্পিকারের সচিবালয়। তাঁরা টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসেন। অন্য দিকে ঋতব্রতদের শিবিরে সমর্থন বাড়তে থাকে। নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, সই জাল-কাণ্ডে ঋতব্রত এবং সন্দীপনের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি তদন্ত শুরু করেছে। ২৭ তারিখে যে তাঁরা চিঠি দিয়েছিলেন, তা চাপা ছিল। শুভেন্দু দু’জনের নাম বলে দিতেই পদক্ষেপ করে তৃণমূল। সাংবাদিক বৈঠক শেষ হওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। তার পরে দেখা যায়, তাঁরা মূল নিশানা করছেন ‘যুবরাজ’ অভিষেককে। সেই সূত্রেই বিদ্রোহী শিবিরের অন্দরে এই গোটা অভিযানের নামকরণ হয় ‘অপারেশন ক্রাউন প্রিন্স’। বিধানসভা ভোটের ঘোষণার এক মাসের মধ্যে ভাঙনের মুখে তৃণমূল। সেই দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। পাশে পেয়েছেন ৫৮ তৃণমূল বিধায়ককে। এমন অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবার খোঁচা দিলেন কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। তিনি জানালেন, ঘাসফুলের ‘নিচুতলার’ নেতাকর্মীদের জন্য হাতশিবিরের দরজা খোলা।

ভোটের মুখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে দল ভাঙানোর অভিযোগ করেছিলেন বহরমপুরের কংগ্রেস প্রার্থী। তাঁর অভিযোগ ছিল, আগে ভাগে ফোন করে নানা রকম প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে তাঁর দলের প্রার্থীদের। নির্বাচনের ফলপ্রকাশ হতেই টানাপড়েনে সেই তৃণমূল। একের পর এক নেতা ‘বেসুরো’ হচ্ছেন। তাঁদের সিংহভাগ নেতা অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অধীরের বার্তা, “যাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী রয়েছেন, যাঁরা দলের জন্য বুথে বুথে ভোট করেছেন, মার খেয়েছেন এবং এখনও তৃণমূলকে ভালবাসেন, তাঁদের বলছি, আপনাদের জন্য কংগ্রেসের দরজা সবসময় খোলা।” মঙ্গলবার বহরমপুরে সাংবাদিক বৈঠকে অধীর এ-ও বলেন, “আপনারা আসুন। আলোচনা করে আমরা আগামিদিনে বিজেপি এবং তথাকথিত তৃণমূলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলব। বাংলায় বাকি বিরোধী দলগুলিকে একজোট করে একটা মঞ্চ তৈরি করে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি। না হলে বাংলায় সুস্থ রাজনীতি বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।” সম্প্রতি ঠিক একই কথা শোনা গিয়েছে মমতার গলায়। তৃণমূলনেত্রীর আহ্বান ছিল, ‘ইগো’ বাদ দিয়ে বিজেপি বিরোধিতায় তৃণমূলের হাত শক্ত করুক বাকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। ‘অতিবামেও’ তাঁর আপত্তি নেই। এখন মমতাকে খোঁচা দিয়ে অধীরের মন্তব্য, ‘‘যে দলবদলের খেলা একদিন আপনারা শুরু করেছিলেন, যার আম্পায়ার এবং রেফারি ছিলেন আপনারা নিজেই, আজ ঠিক সেই একই খেলাই উল্টো দিকে চলছে। শুধু রেফারি আর আম্পায়ার বদলে গিয়েছে।” তৃণমূলের যে বিধায়কেরা বিক্ষুব্ধ এবং বিদ্রোহী তাঁদের সম্পর্কে অধীরের পর্যবেক্ষণ, তাঁদের বেশির ভাগই মূলত মুসলমান ভোটব্যাঙ্কের জোরে বিধানসভা ভোটে জয়ী হয়েছেন। তাই তাঁরা যদি বিজেপিতে যান জনরোষের মুখে পড়তে পারেন। এমন বিধায়কদের নিয়ে কংগ্রেস নেতা বলেন, ‘‘আপাতত বিজেপি থেকে ‘দো গজ কি দূরি’ বজায় রেখে চলছেন এঁরা। সরাসরি পদ্মশিবিরে যোগ না দিলেও এঁদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করছে। তাই জনসমক্ষে বিজেপি থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে ওঁদের বিজেপির নির্দেশে উঠতে-বসতে হবে।’’





