RK NEWZ সোনারপুরে মার খাওয়ার পর তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে যখন হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এই দুঃসময়ে কোথাও দেখা গেল না চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য কিংবা ইন্দ্রনীল সেনের মতো প্রথম সারির হেভিওয়েট মন্ত্রীদের। এমনকি, ফুটবল তারকা মেসির পাশে যাকে প্রায়শই ফ্রেমবন্দি হতে দেখা যায়, সেই অরূপ বিশ্বাসকেও এই কঠিন পরিস্থিতিতে দলনেত্রীর পাশে দাঁড়াতে দেখা গেল না। পরবর্তীতে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বেলভিউ হাসপাতালে অভিষেককে দেখতে এলেও, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাকিদের মধ্যে কোনও সাড়াশব্দ মেলেনি। তবে এই সমস্ত চেনা মুখের মহানিষ্ক্রমণের মাঝে, মমতার পাশে এসে দাঁড়ালেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। দলনেত্রীর ‘প্রিয় কানন’। শনি বিকেলে বাইপাসের ধারের হাসপাতাল থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যখন মিন্টো পার্কের বেলভিউ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হচ্ছিল, তখন গাড়ির ভেতরে অভিষেকের সঙ্গেই ছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন মেয়র বলেন, “ওঁর (অভিষেকের) মাথায় একটু চোট আছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত লেগেছে। ও বলছে ওর গা বমি ভাব আছে। চিকিৎসা শুরু হলে চিকিৎসকেরাই এই বিষয়ে সঠিক ও চূড়ান্ত কথা বলতে পারবেন।” রাজনীতির এই ক্রান্তিকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে শোভন স্পষ্ট ভাষায় জানান, ”আমি সেই পরিবারের পাশে আছি যে পরিবারের অভিভাবক ছিলেন গায়ত্রী দেবী, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যার প্রধান। সেই পরিবারের জন্য আমার পক্ষে যতটুকু করার, আমি সবটুকু করব।” শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক অনেকের কাছেই ঈর্ষনীয়। খুব অল্প বয়সে কংগ্রেসের কাউন্সিলর হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা শোভন, ১৯৯৮ সালে মমতা কংগ্রেস ছাড়ার পর ২০০০ সাল থেকেই দলনেত্রীর ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁদের সম্পর্কে নানা চড়াই-উতরাই এলেও, মমতা-শোভন সমীকরণ অন্য স্তরের। শোভন মমতার একেবারে ঘরের লোক। মমতার মা প্রয়াত গায়ত্রী দেবীর অসুস্থতা থেকে শুরু করে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের যাবতীয় অন্দরমহলের দায়িত্ব একসময়ে একা হাতে সামলেছেন তিনি। অভিষেকের ক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। এককালে এই ‘ভাই-দিদি’র ঠাট্টা-খুনসুটি রাজনৈতিক মহলে চর্চার বিষয় ছিল। একবার রসিকতা করেই সবার সামনে শোভনকে সুইমিং পুলের জলে ফেলে দিয়েছিলেন মমতা। শোভনও বিন্দুমাত্র অনুযোগ না করে হাসতে হাসতেই জল থেকে উঠে এসেছিলেন। এহেন ‘কানন’ মমতার দুঃসময়ের সঙ্গী হবেন না, তা তো নয়। বরং চোখে লাগার মতো হল বাকিদের টুঁ শব্দটি না পাওয়া। বৃত্তটা রয়ে গেল ফিরহাদ হাকিম, ডেরেক ও ব্রায়েন, কুণাল ঘোষ-সহ বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীদের মধ্যেই।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল নেত্রী প্রশ্ন তোলেন, “বেলভিউতে অভিষেককে প্রথমে আইটিইউ-তে নিয়ে যাওয়া হয়। যদি ভর্তি করার প্রয়োজন না থাকে তাহলে কেন সেখানে রাখা হল?” মমতার সঙ্গে ছিলেন রাজ্যসভার ডেরেক ও’ব্রায়েন। তিনি চিকিৎসকদের দেওয়া রিপোর্ট পড়ে জানান, একাধিক টেস্ট দেওয়া হয়েছে অভিষেককে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, “আমার সামনেই হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্তৃপক্ষদের ফোন করে পুলিশের তরফে হুমকি আসছিল যাতে অভিষেককে ভর্তি করা না হয়।” এমনকি তিনি এও দাবি করেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তাঁকে জানান, বিজেপি নেতা ও পুলিশের থেকে ক্রমাগত হুমকি ফোন আসছে, সেই কারণেই অভিষেককে ভর্তি করতে পারবেন না।” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই হাসপাতাল থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। মমতা জানান, ৮টায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল, ১১টা নাগাদ হাতে স্যালাইন বাঁধা অবস্থায় বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে অভিষেকের জন্য হাসপাতালের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হবে। পারিবারিক চিকিৎসক সমস্ত বিষয়টা নজরে রাখবেন। বিজেপির উদ্দেশে ক্ষোভ উগরে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, “ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই অত্যাচার শুরু করেছে বিজেপি। আমি জানি না পশ্চিমবঙ্গে কী হচ্ছে? এখানে মারবে অথচ চিকিৎসা করতে দেবে না।” সোনারপুরে অভিষেকের উপর হামলা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আশঙ্কা জানান, “যেভাবে পাথর ছোঁড়া হয়েছিল, “স্পট ডেড হয়ে যেতে পারত। যদি স্থানীয় ছেলেরা সেইসময় বুদ্ধি করে হেলমেট টা না দিত, প্রাণ চলে যেত। চিকিৎসকেরাই বলেছেন ওর বুকের মাঝখানে রক্ত জমে আছে। কিন্তু চাকরি চলে যাওয়ার ভয় হাসপাতালে ভর্তি নিতে পারছে না।” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলা নিয়ে বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, আপ সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল-সহ ইন্ডিয়া জোটের সদস্যরা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও খবর পেয়ে ফোন করেছিলেন বলে জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রয়োজনে হায়দরাবাদে চিকিৎসার জন্য সবরকম সাহায্য করবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন কংগ্রেসের সাংসদ। বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদেরও সরকার ছিল। আমরা আপনাদের গায়ে আঁচর লাগতে দিইনি। অভিষেক আজকে মানুষের আশীর্বাদে বেঁচেছে। এভাবে অত্যাচার করে সরকার চালানো যায় না। এর জবাব জনগণ দেবে।” সাংবাদিকদের সামনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, “২ তারিখ থেকে আমিও কর্মসূচি শুরু করছি রানি রাসমণি রোড থেকে।” কর্মসূচিতে সরকারি অনুমতি নিয়ে তিনি বলেন, “অন্য রাজনৈতিক দলকে অনুমতি দিতে পারলে আমার কর্মসূচিতে কেন বাধা দেবে? নিয়ম অনুযায়ী সব কাজ করবে।”রাজ্যে পালাবদলের পর শনিবার প্রথম স্বঘোষিত কর্মসূচিতে রাস্তায় নেমেছিলেন অভিষেক। সোনারপুরের দলের নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ‘আক্রান্ত’ হন তিনি। তাঁকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় ডিম, জুতো, ঢিল। ধাক্কাধাক্কি, ধস্তাধস্তিতে ছিঁড়ে যায় অভিষেকের জামা। সেই অবস্থাতেই পৌঁছন নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। সাংবাদিকদের সামনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভও উগরে দেন। বেশ কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে ঘটনাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। সেখান থেকে কলকাতায় ফিরে প্রথমে চলে যান অ্যাপোলোতে, হুইল চেয়ারে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের ভিতরে। অভিষেককে দেখতে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেখানে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অ্যাপোলোর তরফে জানানো হয়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। এরপরই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অ্যাপোলোতে সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না, তাই অভিষেককে অন্য শিফট করছি। বেলভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তারাও প্রাথমিকভাবে তৃণমূল সাংসদকে ভর্তি নিতে চায়নি।





