RK NEWZ শুক্রবার কলকাতার নন্দন চত্বরে ভিড়। পরিচালক অনীক দত্তকে শেষ বারের মতো দেখার উদ্গ্রীব অনুরাগীদের। বুধবার আচমকাই আসে পরিচালক অনীকের দুর্ঘটনার খবর। পরে হাসপাতালের তরফে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এখনও তাঁর চলে যাওয়া মন থেকে মানতে পারছেন না অনেকে। বৃহস্পতিবার ‘পিস ওয়ার্ল্ড’-এ রাখা ছিল পরিচালকের দেহ। মেয়ে ঐশী দত্ত বিদেশ থেকে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন সকলে। তার পরেই শেষকৃত্য হওয়ার কথা। সেই মতো শুক্রবার সকালে নন্দনে নিয়ে আসা হল অনীকের নিথর দেহ। নন্দনের মূল দরজার সামনে বড় ফ্রেমে অনীকের ছবি। ফুলে মোড়া চারিদিক। সেই ছবির সামনেই এসে দাঁড়াল তাঁর শববাহী গাড়ি। পরিবারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, গাড়ি থেকে বার করা হবে না প্রয়াত পরিচালককে। গরমে সমস্যা হতে পারে, তাই এই সিদ্ধান্ত। শেষযাত্রায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জনা বসু, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, প্রযোজক ফিরদৌসল হাসান, পাপিয়া অধিকারী-সহ অনেকেই। প্রথম থেকেই সবকিছুর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন রুদ্রনীল ঘোষ।

২২ মে জন্মদিন ছিল অনীক দত্তের। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে যেন বদলে গেল সব। অনেকেই বলেছেন, অবসাদে ভুগছিলেন অনীক। কিন্তু আদতে কেমন মানুষ ছিলেন তিনি? অনীক দত্তের চলে যাওযাটা বাংলার সৃজনশীলতার বৃত্তে একটা অঘটন। বিষয়টি এ ভাবেই দেখছেন এই জগতের সঙ্গে, মানুষটির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষজন। অনীকের মতো অনন্য প্রতিভার মানুষের এমন বিদায় মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অনুরাগীরাও। অনীকের জন্ম কলকাতায়। পাঠভবন স্কুলে পড়াশোনার শুরু। তার পর সেন্ট জ়েভির্য়াস কলেজ থেকে স্নাতক। অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা তাঁর। একটা লম্বা সময় বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় কাজ করেছেন। তার পর সিনেমার পরিচালনায় আসা। মোট সাতটি ছবি তাঁর ঝুলিতে। তবে প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ থেকেই স্রষ্টা হিসেবে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন অনীক। অনীক বরাবরই বামপন্থী। তাঁর কাজেও সেই আদর্শের ছাপ মেলে। ব্যক্তিগত ভাবে তিনি তৎকালীন তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন কাজের প্রতিবাদ করেছেন। বছর কয়েক আগে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব চত্বর জুড়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি-সহ পোস্টারের ছড়াছড়ি দেখে প্রতিবাদ করেছিলেন। উৎসব প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। পরে তীব্র সমালোচনাও করেন। এই ঘটনার জেরে নাকি তাঁর ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ সরিয়ে নেওয়ার হয় বাংলার অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহ থেকে। কেন সে দিন মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করেছিলেন অনীক? সেই প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘আমি কলেজ জীবন থেকে যাচ্ছি নন্দনে। ওখানে গেলে গর্ব হত। এই রকম একটা সংস্কৃতির কেন্দ্র তো অন্য কোনও শহরে নেই। যেখানে সত্যজিৎ রায়ের নিজের ডিজ়াইন করা লোগো রয়েছে। সেখানে চারদিকে ওঁর ছবি ভীষণ বেমানান। যেটা সত্যি সেটাই বলেছি, এর মধ্যে বীরত্বের তো কিছু নেই। এটা যেমন দৃশ্যদূষণ, তেমনই পরিবেশ দূষণও। বর্ধমান যাচ্ছি, দু’পাশে সুন্দর ধানক্ষেত। তার মাঝেই ওই ছবি! বাইরে থেকে কোনও লোক এলে তো ভাববে, এখানে স্বৈরতন্ত্র চলছে।’’ অনীকের দত্তের দাদু নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত ছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। তবে মানুষ অনীকের জীবনচর্যায় কখনওই পারিবারিক আভিজাত্যের প্রভাব পড়েনি। বরং সোজাসাপটা কথা বলতে ভালবাসতেন। অনৈতিক সুবিধা পাওয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না। এই মানসিকতার কারণে অনীককে যেমন অনেকে সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখতেন, তেমনই অনেকেরই কাছেই তিনি চক্ষুশূল ছিলেন। যদিও তা নিয়ে কোনও দিন ভাবিত ছিলেন না অনীক। পাশ্চাত্য সঙ্গীত থেকে সিনেমা— সবটাই ছিল তাঁর আয়ত্তে। সেই কারণেই হয়তো অনীক ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের গুণমুগ্ধ অনুরাগী। তাঁকে নিয়েই অনীক তৈরি করেন ‘অপরাজিত’ । সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’র নির্মাণের আখ্যান বড়পর্দায় ফুটিয়ে তুললেন অনীক, নিজের মতো করে। সেই সময় বড় বড় হিন্দি ছবিকে বক্সঅফিসে টেক্কা দিয়েছিল এই ছবি। ছোটপর্দার অভিনেতা জীতু কমলকে বাঙালির কাছে ‘সত্যজিৎ’-রূপে এনে তাক লাগিয়ে দেন অনীক। বড়পর্দার অভিনেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন জীতু। অনীকের রাগ নিয়ে নানা কথা চালু আছে। বন্ধুবান্ধবেরা বলেন, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা কাজের সময় মাঝেমধ্যে নাকি ছদ্ম রাগ দেখাতেন অনীক।

তবে একটা কথা একবাক্যে সবাই স্বীকার করেছেন যে, অনীক দত্ত এমন এক জন মানুষ, যাঁর সঙ্গে ঠাট্টা করা যায় আবার তাঁর সঙ্গে ঝগড়াও করা যায়। কারও প্রতি বিদ্বেষ পুষে রাখতেন না অনীক। নিজের কাজ নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকতেন সবসময়। চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরির সিনপ্সিসটা পর্যন্ত চাইতেন সবিস্তারে। কাজ নিয়ে খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন অনীক। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তাই মশকরা করে তাঁকে ‘প্যানিক দত্ত’ বলেও ডাকতেন। একটি বিস্কুট কোম্পানির বিজ্ঞাপনী শুটে ২০ বার ‘টেক’ নিয়েছিলেন অনীক। তার পর থেকেই নাকি এই নামে ডাকা হত তাঁকে! অনীকের কাছের লোকজন বলেন, তীব্র রসবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন তিনি। গল্প করতে, আড্ডা দিতে অসম্ভব ভালবাসতেন। এ ছাড়া তাঁর একটা দুর্লতা ছিল চা। ঘন ঘন চা খেতেন। তবে শেষের দিনগুলো একাকিত্বে ভুগতেন বলে অনেকে জানিয়েছেন। এমনকি, কথা বলার লোক পেতেন না। অনীকের মৃত্যুর পর টলিউডের অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেন ওরফে ঋ আক্ষেপ করে লেখেন, ‘‘উনি ফোন করেছিলেন, দেখা করতেও বলেছিলেন। কথা বলার লোক পেতেন না। ইশ্, যদি সে দিন কথা বলতাম!’’ অনীকের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সন্ধি দত্তের বিচ্ছেদ হয়ে যায় গত বছর। তার পর থেকেই নাকি একাকিত্ব ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। মৃত্যুর দিন নিজের ডোভার লেনের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে প্রাক্তন স্ত্রী সন্ধির ফ্ল্যাটের ছাদে উঠে সেখান থেকে ঝাঁপ দেন অনীক। পছন্দের লোকজনের সঙ্গে হইহই করে মিশতেন। ২০২৩ সালে প্রায় পাঁচ দিন ধরে ধর্মেন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে হইহই করে এসেছেন অনীক। সে সব ছবিও নিজের সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। অনীক সম্পর্কে সানি দেওলের বেয়াই। সানির পুত্রবধূ দৃশা আচার্য হলেন অনীকের তুতোবোনের মেয়ে। তাঁদের সম্পর্কের গোড়ায় রয়েছে বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক বিমল রায়। বিমল রায় হলেন অনীকের মায়ের জ্যেঠা, অন্য দিকে দৃশার মায়ের দাদু। সে দিকে থেকে অনীক ছিলেন দৃশার মামা। অনীক বরাবরই প্রতিবাদী। যখনই কোথাও অন্যায় কিছু দেখেছেন, প্রতিবাদ করতে দু’বার ভাবেননি।

এ জন্য কাজও হারিয়েছেন। তবু কখনও সেই আক্ষেপ শোনা যায়নি তাঁর মুখে। একটা সময় বাংলা ছবির প্রিমিয়ারে যাওয়া কমিয়ে দেন তিনি। পরিচালক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘প্রিমিয়ার থেকে বেরিয়ে এসে মিথ্যে কথা বলতে হয় বা পালিয়ে যেতে হয়। সে বড় বিড়ম্বনার!’’ অনীকের শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতায়’ ছবিটার মুক্তি নিয়ে ছবির নায়ক আবীর চট্টোপাধ্যায় ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযোজক-পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধ হয়। একই সময়ে মুক্তি পেয়েছিল শিবপ্রসাদের ‘রক্তবীজ’। একই সময়ে মুক্তি পাওয়া দু’টি ছবিতেই নায়ক ছিলেন আবীর। তবে প্রচার করতে পারবেন শুধু শিবপ্রসাদের ছবিতে। যদিও আবীরের দাবি ছিল, তিনি আগে থেকেই শিবপ্রসাদের সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। সেই সময় মনঃক্ষুণ্ণ হন আবীরের প্রতি। পরে অবশ্য ছবিটি ২৫ দিন পার করতেই নায়কের সঙ্গে কেক কাটতে দেখা গিয়েছিল অনীককে। অনীকের ইচ্ছা ছিল সলিল চৌধুরীর জীবনীচিত্র করবেন। সুরকারের চরিত্রে তাঁর পছন্দ ছিল অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে। রূপটানশিল্পী সোমনাথ কুণ্ডুকে জানিয়েছিলেন তাঁর এই ইচ্ছার কথা। একাধিক বার নাকি অনির্বাণকে ফোন করেন। কিন্তু তাঁকে ফোনে পাননি পরিচালক। এ ছাড়াও ‘অপরাজিত ২’–এর খসড়া তৈরি করছিলেন অনীক। কিন্তু সব ইচ্ছাই অপূর্ণ রয়ে গেল তাঁর। শুক্রবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনীকের। প্রথমে কথা ছিল নন্দনে শায়িত থাকবে তাঁর মরদেহ। সেখান থেকে কেওড়াতলা শ্মশানে। কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্তে ঠিক হয়, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এনটি ওয়ান (নিউ থিয়েটার) স্টুডিয়োর চতুর্থ তলায় শায়িত থাকবে পরিচালকের মরদেহ। সেখানে তাঁর পরিবার, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুরাগীরা পরিচালককে শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে পারবেন। সেখান থেকেই শুরু হবে শেষযাত্রা।





