RK NEWZ বিএসএফ-কে দ্রুত জমি দেওয়ায় শুভেন্দুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ অমিত শাহ। গান্ধীনগরে এক সভায় শাহ বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় থাকার সময় প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটত। আমাদের সরকার আসার পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-র পরিকাঠামো গড়ার উদ্দেশ্যে জমি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তিনি। শুরু করেছেন অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে রাজ্যছাড়া করার প্রক্রিয়া। শুভেন্দু অধিকারীর এই পদক্ষেপের প্রশংসা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গান্ধীনগরে এক সভায় শাহ বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় থাকার সময় প্রতি দিন সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটত। আমাদের সরকার আসার পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছেন। বিএসএফ-কে জমি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।’’ নিজের সংসদীয় কেন্দ্রে জনসভা থেকে শাহ জানিয়েছেন, যে সব বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চান, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে না। প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু আগে এমনই ঘোষণা করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, যাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) অন্তর্ভুক্ত নন, তাঁদের গ্রেফতার করে ফেরত পাঠানোর জন্য সরাসরি তুলে দেওয়া হবে বিএসএফের হাতে। পর্যন্ত রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিএসএফ-কে মোট ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তাঁর ঘোষণা, ওই জমিতে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের নতুন আউটপোস্ট (সীমান্ত চৌকি) তৈরি করা হবে। কোন জেলায় ঠিক কত পরিমাণ জমি দেওয়া হয়েছে, বুধবার রাতে তা-ও নিজের ফেসবুক হ্যান্ডলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সবচেয়ে বেশি জমি দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদেই। অন্য দিকে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে জনবিন্যাসের চরিত্রের বদল খতিয়ে দেখতে কমিটি মঙ্গলবার উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠন করেছেন শাহ। আগামী দিনে সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে (বিএসএফের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকা) জনবিন্যাসের চরিত্র বদল হচ্ছে কি না, তা নজর রাখার জন্য বিএসএফকে বুধবার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এ বার স্পষ্ট ভাষায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপকে সমর্থন করলেন।
অনুপ্রবেশকারীদের ফেরানোর পদ্ধতিও বদলে গিয়েছে ছ’মাসের মধ্যে। আগে যাঁরা বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছিলেন, তাঁদের সীমান্ত পার করানোর পুরো প্রক্রিয়া বিএসএফ-এর হাত দিয়েই হচ্ছিল। তখন হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে ভিড় জমানো অনুপ্রবেশকারীদের ভাগে ভাগে চেকপোস্টের ভিতরে ডাকা হচ্ছিল। তাঁদের বাংলাদেশি নথি পরীক্ষা করে নাম-ঠিকানা নথিভুক্ত করা হচ্ছিল। তার পরে একসঙ্গে ৫০-১০০ জনকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল সীমান্তের নিকটবর্তী বিএসএফ ক্যাম্পে। সেখানে তাঁদের নাম-ঠিকানা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-র হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। তালিকা যাচাইয়ের পরে বিজিবি-র তরফে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হলে বিএসএফ ক্যাম্পে অপেক্ষারতদের তুলে দেওয়া হচ্ছিল বিজিবি-হাতে। এ বার পদ্ধতি ভিন্ন। হাকিমপুর সীমান্তে যাঁরা ভিড় করেছেন, তাঁদের অনেকেরই প্রশ্ন, বিএসএফ চেকপোস্টে নাম নথিভুক্ত করার পরে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? এ বার আর সরাসরি সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না শুনে তাঁদের আশঙ্কা, তবে কি গ্রেফতার করবে? তাঁদের জন্য আশ্বাস আসছে জমায়েতের মধ্যে থেকেই, “না না, গ্রেফতার করবে কেন? শুভেন্দু অধিকারী তো বলেছেন, কাউকে আটকাব না। যারা চলে যেতে চায়, তাদের চলে যেতে দেওয়া হবে।” তা হলে হোল্ডিং সেন্টার কেন? সেখানে ক’দিন থাকতে হবে? থাকা-খাওয়া ঠিকঠাক মিলছে তো? আমাদের নামে মামলা হবে না তো? চিন্তান্বিত মুখ নিয়ে এমন নানা প্রশ্ন নানা জনের। আসলে অনুপ্রবেশকারী বলে কেউ চিহ্নিত হলেই তাঁকে হোল্ডিং সেন্টারে (আটক শিবির) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। সে জন্য জেলায় জেলায় অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারও খুলে গিয়েছে রাতারাতি। অতএব গত চার-পাঁচ দিন ধরে যাঁরা হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে এসে জড়ো হচ্ছেন, তাঁদের বাংলাদেশি নথি বিএসএফ-এর পাশাপাশি পুলিশও পরীক্ষা করে দেখছে। তাঁদের নাম নথিভুক্ত করার পরে ১০০ থেকে ১৫০ অনুপ্রবেশকারীর এক একটি দলকে বাসে চাপিয়ে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে। সেখানে আটকদের থাকাখাওয়ার বন্দোবস্ত করছে স্থানীয় প্রশাসন। তার পরে বাংলাদেশ থেকে বিএসএফের কাছে বার্তা এলে হোল্ডিং সেন্টার থেকে আটকদের ফের সীমান্তে আনছে পুলিশ। তাঁদের সীমান্ত পার করিয়ে বিজিবি-র হাতে তুলে দিচ্ছে বিএসএফ।
স্বরূপনগরে তিনটি হোল্ডিং সেন্টার আপাতত চলছে। একটি তেঁতুলিয়ায় ‘পথের সাথী’ অতিথিশালায়। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার জন্য রাজ্য জুড়ে এমন বহু অতিথিশালা তৈরি হয়েছিল তৃণমূল আমলে। দ্বিতীয় হোল্ডিং সেন্টারটি চলছে চারঘাট হাইস্কুল সংলগ্ন ফ্লাড শেল্টারে। তৃতীয়টি মেদিয়ার একটি স্কুলে। সর্বত্রই পুলিশ মোতায়েন। আটকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের জন্য আশা কর্মীরা যাতায়াত করছেন। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন স্থানীয় মেডিক্যাল অফিসার সৌরভ আচার্যও। বুধবার তেঁতুলিয়ার হোল্ডিং সেন্টারে আটক অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল ১১৬। তাঁদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিডিও অফিসের পক্ষ থেকে। অন্য দিকে, চারঘাট হাইস্কুলে আটক ৬৩ জন এবং মেদিয়ার স্কুলের হোল্ডিং সেন্টারে আটক ৫২ জনের জন্য রান্নার দায়িত্ব পড়েছে স্কুলেরই মিড ডে মিল কর্মীদের উপর। তাঁদের গরমের ছুটি আপাতত বাতিল। দুপুরে এবং সন্ধ্যায় স্কুলে গিয়ে রান্না করছেন মিড ডে মিল কর্মীরা। আর জলখাবারের জন্য স্বরূপনগর বিডিও অফিস থেকে নানা রকম শুকনো খাবার পাঠানো হচ্ছে। বুধবার দুপুরে চারঘাট হাইস্কুল চত্বরে যখন দাঁড়িয়ে আছি, তখনই খবর এল, আরও ৭০ জন অনুপ্রবেশকারীকে আনা হচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে। ফলে তৎপরতা বাড়ল। হোল্ডিং সেন্টারগুলির পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনা দেখভাল করতে স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরাও সক্রিয়। চারঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য রাজেশ মণ্ডল এবং বিজেপি সমর্থিত নির্দল সদস্য মানস বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, মঙ্গলবার রাতে বিডিও-র তরফ থেকে তাঁদের হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করার কথা জানানো হয়। মধ্যরাত থেকেই পঞ্চায়েত সদস্যরা সক্রিয় হন। কেউ কেউ বুধবার ভোর পর্যন্ত স্কুলে দাঁড়িয়ে থেকে সব বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত করে তার পর ঘরে ফিরেছেন। ছ’মাস আগের আর এখনকার পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক আরও এক জায়গায়। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে যাঁরা বাংলাদেশে ফিরছিলেন তাদের বক্তব্য ছিল, “এসআইআর হচ্ছে, আমাদের তো আর থাকতে দেবে না, তাই চলে যাচ্ছি।’’ অর্থাৎ, সে বার নিজেদের ইচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অনুপ্রবেশকারীরা। সে দফায় মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকারা এ বার ফিরে যাচ্ছেন বাধ্য হয়ে। নিউটাউন সংলগ্ন ঘুনি বস্তি হোক বা এয়ারপোর্টের কাছে বাঁকড়া, হাওড়ার কোনও বস্তি থেকে আসা পরিবার হোক বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বারাসত থেকে আসা মহিলা, সবার মুখে একই কথা। “যাদের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, তারা আর থাকতে দিচ্ছে না। বলছে, তোমরা থাকলে আমাদের বিপদ হবে। পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে। আমাদের বাড়ি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে দেবে। তোমরা চলে যাও।’’ ঘুনি বস্তি থেকে সীমান্তে পৌঁছোনো মফিজুল মোল্লা পুলিশি হানার কথাও শোনাচ্ছেন। বলছেন, ‘’আগের বারই পুরো বস্তি প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমরা ২০-২২ ঘর রয়ে গিয়েছিলাম। তার পরে আগুন লেগে পুরো বস্তি পুড়ে গেল। পাশের পাড়াগুলোয় ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলাম। কিন্তু সরকার বদলে যাওয়ার পরে মাঝেমধ্যেই পুলিশ আসছিল। ভয়ে রাতে বাড়িতে থাকতে পারছিলাম না। বাড়িওয়ালাও বলল, আর এক দিনও থাকা যাবে না। এখনই চলে যাও।’’ ফারাক আরও একটা চোখে পড়ছে হাকিমপুরে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে চেকপোস্টের বাইরের জমায়েতকে ঘিরে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশমুখী অনুপ্রবেশকারীরা কী খাবেন, তাঁদের মাথার উপরে কী রকম ছাউনি দিতে হবে, সমস্ত দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারা। এমনকি এই অনুপ্রবেশকারীরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন কি না, বললে ক’জনের সঙ্গে বলবেন, কতটুকু বলবেন, কী প্রশ্ন করা যাবে আর কী যাবে না, সে সবের নিয়ন্ত্রণও ছিল তৃণমূলের হাতে। সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধির উপরে সে বার হামলাও হয়েছিল। এ বার সে সব ছবি উধাাও। সেই থমথমে আবহ এ বার নেই। হাকিমপুর চেকপোস্টের ত্রিসীমানায় আর কোনও তৃণমূল নেতাকে দেখা যাচ্ছে না। শাসানি, চোখরাঙানি অতীত। অথচ স্থানীয় পঞ্চায়েতের বোর্ড ছ’মাস আগে যাদের দখলে ছিল, এখনও তাদের দখলেই রয়েছে। প্রধান, উপ-প্রধান তখন যাঁরা ছিলেন, এখনও তাঁরাই রয়েছেন। শুধু ছ’মাস আগের স্বঘোষিত ‘দায়দায়িত্ব বোধ’ গায়েব হয়ে গিয়েছে।




