RK NEWZ মোহনবাগান ক্লাব এবং টুটু বসু সমার্থক। তাঁর হাত ধরেই মোহনবাগান ক্লাবে একের পর এক ইতিহাস তৈরি হয়। টুটুর মৃত্যুতে ময়দানে শোকের ছায়া। প্রয়াত স্বপন সাধন বসু, যাঁর পরিচিতি টুটু বসু নামে। মঙ্গলবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। সোমবার সন্ধ্যায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন বর্ষীয়ান ক্রীড়া প্রশাসক। দক্ষিণ কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল তাঁকে। ভেন্টিলেশনে ছিলেন। মঙ্গলবার তাঁকে হাসপাতালে দেখতে যান রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। সঙ্গে ছিলেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও টুটুবাবুর খোঁজ নিয়েছিলেন। মোহনবাগান ক্লাব এবং টুটু বসু সমার্থক। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি মোহনবাগানের সচিব ছিলেন। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে ফের তিনি সচিব নির্বাচিত হন। দায়িত্ব সামলেছিলেন দু’বছর। এরপর ২০২০-২২ এবং ২০২২-২০২৫, দু’দফায় ফের তিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত বছর মোহনবাগানের নির্বাচনের আগে তিনি সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরেই মোহনবাগান ক্লাবে একের পর এক ইতিহাস তৈরি হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কার হাতে ক্লাবের মালিকানা তুলে দেওয়া। মোহনবাগানের নামের আগে তখন যুক্ত হয় ‘এটিকে’। তা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। তারও আগে তিনি মোহনবাগান ক্লাবে আরও এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। যে সবুজ-মেরুনে কখনও বিদেশি ফুটবলার খেলতে দেখা যায়নি, সেখানেই চিমা ওকেরিকে সই করিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন টুটু। চিমাই মোহনবাগানের প্রথম বিদেশি। তাঁর পুত্র সৃঞ্জয় এখন মোহনবাগানের সচিব পদে রয়েছেন। ফুটবল প্রশাসক ছাড়াও একাধিক পরিচয় ছিল টুটু বসুর। তিনি রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী এবং সংবাদপত্রের মালিকও। বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন টুটু। হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করা কার্যত অসম্ভব ছিল। এই কারণে গত কয়েক বছর তিনি সেভাবে ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। গত বছর মোহনবাগান দিবসের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিলেন টুটু বসুই। তিনি প্রশাসক থাকাকালীন ‘মোহনবাগান রত্ন’ দেওয়া শুরু হয়। সেই সম্মানই গত বছর তুলে দেওয়া হয়েছিল টুটুর হাতে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, বাইচুং ভুটিয়া, আইএম বিজয়ন, জোসে ব্যারেটো, সুব্রত ভট্টাচার্যদের মতো তারকাখচিত অনুষ্ঠানে সম্মানিত করা হয়েছিল। মোহনবাগান ভক্ত এবং ফুটবল অনুরাগীদের মনে টুটুই ছিলেন সবুজ-মেরুনের অভিভাবক।

প্রাক্তন মোহনবাগান সভাপতি তথা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বপনসাধন বোস ওরফে টুটুবাবুর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার সকালে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর পরিবারকে সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন তিনি। লিখলেন, ‘ক্রীড়া প্রশাসনে ওঁর অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ টুটুবাবু বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সোমবার সন্ধেয় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। তাঁকে প্রথম থেকেই রাখা হয় ভেন্টিলেশনে। তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়েই হাসপাতালে পৌঁছে যান সদ্য দায়িত্ব নেওয়া ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। খোঁজখবর নেন মোহনবাগানের প্রাণপুরুষের। হাসপাতালে যান সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবেও। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও টুটুবাবুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে খোঁজ নেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য বিশেষ টিমও তৈরি হয়। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় আর বাঁচানো যায়নি টুটুবাবুকে। গভীর রাতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর পরিবারের তরফে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয় রাতেই। সকালে সোশাল মিডিয়ায় শোকপ্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি লেখেন, ‘মোহনবাগান ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি, প্রাক্তন সাংসদ তথা বর্ষীয়ান ক্রীড়া প্রশাসক শ্রী স্বপনসাধন বসু (টুটু বসু) মহাশয়ের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। মোহনবাগান ক্লাব ও টুটু বোস একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়া প্রশাসনে ওঁর অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওঁর নেতৃত্ব, দূরদৃষ্টি এবং খেলাধুলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, পরিজন, শুভানুধ্যায়ী এবং অসংখ্য অনুরাগীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে ওনার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করি। ওঁ শান্তি।’ শোকজ্ঞাপন করেছেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। বোস পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সকালে টুটুবাবুর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে বালিগঞ্জের বাসভবনে। সকাল ৮টা ৩০ থেকে ১০টা পর্যন্ত দেহ শায়িত থাকবে। সেখান থেকে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে তাঁর নশ্বর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে ভবানীপুর ক্লাব ও সংবাদ প্রতিদিন-এর দপ্তরে। তারপর ১১টা ৩০ মিনিট নাগাদ টুটুবাবুর প্রাণ প্রিয় মোহনবাগান ক্লাবে তাঁর দেহ শেষবারের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তাঁকে শেষ বিদায় জানাবেন অনুরাগীরা। তারপর বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। বুধবার তাঁর শেষকৃত্য। বসত বাড়ি, প্রতিদিনের কলকাতার সদর দপ্তর, ভবানীপুর ক্লাব ও মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে তাঁকে শেষ সম্মান জানাতে পারবেন অনুরাগীরা।
টুটুবাবুর প্রয়াণে যেমন শোকের ছায়া ময়দানে। তেমনভাবেই শোকাগ্রস্ত রাজনৈতিক মহলও। তাঁর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, ‘স্বপনসাধন বোসের প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। কয়েক দশক ধরে টুটু বোস তাঁর জীবন, শক্তি এবং আবেগ মোহনবাগানের জন্য উৎসর্গ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে মোহনবাগান ভারতের সেরা ক্লাব হিসাবে নিজেদের তুলে ধরেছে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন মোহনবাগানের চেতনার এক প্রতীক।’ শোকপ্রকাশ করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও। তিনি বলেন, “টুটুবাবুর প্রয়াণ সংবাদে আমরা স্তম্ভিত। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গ এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। প্রয়াত টুটু বোসের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।”





