এসআরএইচ: ২০১/৩ (ঈশান ৮০, অনিকেত ৪৩, ডাফি ২২/৩, শেফার্ড ৫৪/৩)
আরসিবি: ২০৩/৪ (বিরাট ৬৯*, দেবদত্ত ৬১, পেইন ৩৫/২, হর্ষ ৩৫/১)
৬ উইকেটে জয়ী রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
দশ মাস পর টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে নেমে একার হাতে বেঙ্গালুরুকে জেতালেন বিরাট কোহলি। ম্যাচের পর তিনি জানালেন, যথেষ্ট তৈরি হয়েই আইপিএল খেলতে নেমেছেন। আইপিএলের প্রথম ম্যাচে এতটাই সাবলীল লেগেছে বিরাট কোহলির খেলা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্রিজে টিকে থেকে বেঙ্গালুরুকে ম্যাচ জিতিয়েছেন। ম্যাচের পর কোহলি স্বীকার করে নিয়েছেন, এখন যে বিরতি পান তাতে আসলে শরীর অনেক বেশি তরতাজা থাকে। তিনি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই আইপিএলে খেলতে এসেছেন। ১৬তম ওভারে হর্ষল পটেলের চার বলে ১৮ রান নিয়ে দলকে জেতানোর পর কোহলিকে দেখা গেল হাত আকাশের দিকে তুলতে। গ্যালারিতে বসে থাকা স্ত্রী অনুষ্কা শর্মার দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দিলেন। পাল্টা চুমু দিলেন অনুষ্কাও। এর পর রজত পাটিদারকে জড়িয়ে ধরলেন কোহলি। পাতিদার না থাকলে রান তাড়া করা আরও কঠিন হত।
টস জিতল বিরাটের দল। বেঙ্গালুরু অধিনায়ক রজত পাতিদার বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। হায়দরাবাদে ছিলেন ট্র্যাভিস হেড এবং অভিষেক শর্মার মতো আগ্রাসী ব্যাটার। নিজেদের দিনে প্রতিপক্ষকে দুরমুশ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন তাঁরা। যদিও প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ তাঁরা। হেড ফিরলেন ১১ রানে। ৭-এর বেশি এগোল না অভিষেকের ইনিংস। চারে নামা নীতীশ কুমার রেড্ডি (১) ফ্লপ। একটা সময় ২৯ রানে ৩ উইকেট খুইয়ে চাপে পড়ে যাওয়া দলকে টেনে তুললেন অধিনায়ক ঈশান কিষান এবং হেনরিক ক্লাসেন। তাঁদের জুটিতে ওঠে অতি গুরুত্বপূর্ণ ৯৭ রান। প্রোটিয়া তারকা ২২ বলে ৩১ রানে ফিরে যান। বাউন্ডারি লাইনে তাঁর ক্যাচ নেন ফিল সল্ট। তবে ক্যাচ নেওয়ার সময় তাঁর পা বাউন্ডারি দড়িতে লেগেছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য রিপ্লের সহায়তা নেন আম্পায়ার। আউট দেওয়া হয় ক্লাসেনকে। সাজঘরে ফেরার সময় তাঁর চোখেমুখে অবিশ্বাস ধরা পড়েছিল। প্রোটিয়া ব্যাটার ফিরে গেলেও দমানো যায়নি ঈশানকে। একটা সময় অদম্য মনে হওয়া আরসিবি বোলিংকে ঈশানের সামনে অসহায় মনে হল। যেভাবে খেলছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল সেঞ্চুরি অবধারিত। শেষ পর্যন্ত সল্টের দুরন্ত ক্যাচ তাঁকে সাজঘরের রাস্তা দেখায়। উইকেট পান অভিনন্দন সিং। ৩৮ বলে ৮০ রানের সাইক্লোনিক এই ইনিংস সাজানো ৮ চার, ৫ ছক্কায়। শেষের দিকে অনিকেত বর্মার ১৮ বলে ৪৩ রানের মারমুখী ইনিংসে ভর করে ২০০-র গণ্ডি পেরয় এসআরএইচ। আরসিবি’র হয়ে জ্যাকব ডাফি পান ২২ রানে ৩ উইকেট। রোমারিও শেফার্ড ৩ উইকেট নিলেও দেন ৫৪ রান। ভুবনেশ্বর কুমার, সুয়শ শর্মা এবং অভিনন্দন সিং ভাগ করে নেন ১টি করে উইকেট। ২০২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ফিল সল্টের (৮) উইকেট খোয়ায় আরসিবি। এরপর হাল ধরেন বিরাট কোহলি এবং দেবদত্ত পড়িক্কল। এই সময়টা বেশি আগ্রাসী ছিলেন পড়িক্কল। দু’জনের জুটিতে ওঠে ১০১ রান। ৮.১ ওভারেই ১০০ পেরিয়ে যায় বেঙ্গালুরু। ২৬ বলে ৬১ রানের দুরন্ত ইনিংস খেলেন ২৫ বছর বয়সি বাঁহাতি তারকা। তিনি আউট হলেও অসাধারণ ছন্দে ছিলেন ‘চেজমাস্টার’ বিরাট। তবে অধিনায়ক রজত পাতিদারের ১২ বলে ৩১ রানের ঝোড়ো ইনিংস ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিল। যদিও পাতিদার ফিরতে না ফিরতেই আউট হলেন জিতেশ শর্মা (০)। টানা দু’বলে উইকেট খুইয়েও বিশেষ চাপে পড়েনি আরসিবি। কারণ সেই সময় ওভার পিছু মাত্র ৫ রান করে দরকার ছিল। শেষ পর্যন্ত থেকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন বিরাট। ৩৮ বলে ৬৯ রানের অনিন্দ্যসুন্দর ইনিংস খেলেন। কখনও দেখে মনে হয়নি গত জানুয়ারি মাসের পর আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়নি তাঁকে। প্রয়োজনে ধরে খেললেন। আবার প্রয়োজনে হাত খুলে মারলেন। এটাই যেন তাঁর রসায়ন। তাঁকে নিয়ে চিন্নাস্বামীর গ্যালারিতে ছিল উৎসবের মেজাজ। তাঁদের উৎসব আরও বাড়িয়ে দিল বেঙ্গালুরুর দাপুটে জয়। ২৬ বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করে আরসিবি বুঝিয়ে দিল ‘এ সালা কাপ নামদু ২.০’-এর জন্য তৈরি তারা।
কোহলি বলেন, “আবার ক্রিকেট মাঠে ফিরতে পেরে খুব ভাল লাগছে। এক বছর আগে এই মাঠেই শেষ বার টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিলাম। তবে সাম্প্রতিক কালে এক দিনের সিরিজ়ে যে ভাবে খেলেছি সেটা আমাকে ছন্দ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। যে ধরনের শর্ট খেলি না, সেই শট খেলার চেষ্টা করিনি। আমি জানি যতক্ষণ আমার ছন্দ রয়েছে এবং যত ক্ষণ নিজের ফিটনেস নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে পারছি, তত ক্ষণ সব ঠিকঠাকই হবে। আজ আরও এক বার মাঠে নেমে সেটা দেখাতে পেরেছি।” ভারতের হয়ে এখন একটি ফরম্যাটেই খেলেন কোহলি। তাতে কি অসুবিধা হয় না? ভারতের প্রাক্তন অধিনায়কের জবাব, “গত ১৫ বছর ধরে যে ধরনের সূচির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং যতগুলো ম্যাচ আমরা খেলেছি, তাতে সব সময় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ার একটা ঝুঁকি থাকতই। তাই এখন এই বিরতিগুলো আমাকে প্রচন্ড সাহায্য করে। আমি তরতাজা থাকি, উত্তেজিত থাকি। মাঠে ফিরলে সব সময় ১২০% দেওয়ার চেষ্টা করি। কম প্রস্তুতি নিয়ে কখনও খেলতে নামি না। আসলে এই বিরতিগুলো আমাকে মানসিকভাবে তরতাজা রাখে। যত ক্ষণ আপনি শারীরিকভাবে ফিট থাকছেন এবং মানসিক ভাবে তরতাজা থাকছেন, তত ক্ষণ সবকিছুই ঠিকঠাক হবে এবং দলের জন্য আপনি অবদানও রাখতে পারবেন। ক্রিকেটার হিসেবে সেটাই তো আমার কাজ। আমি কখনও জায়গা ধরে রাখতে চাই না। সব সময় ভাল খেলতে চাই এবং দলের হয়ে অবদান রাখতে চাই।” হায়দরাবাদের অধিনায়ক ঈশান কিশন স্বীকার করে নিয়েছেন, কোহলিকে আউট করা দরকার ছিল। সেটা পারেননি বলেই তাঁদের হারতে হয়েছে। ঈশান বলেন, “বিপক্ষের ব্যাটারেরা দারুণ খেলেছে। বিশেষ করে বিরাট ভাই। ওর উইকেট নেওয়া দরকার ছিল। আমাদের আরও পরিশ্রম করতে হবে। প্রথম ম্যাচে এ ধরনের ভুল মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ভবিষ্যতে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে।” এ দিনের ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বেঙ্গালুরুর দেবদত্ত পাড়িক্কল। শুরু থেকে যে আগ্রাসী ব্যাটিং তিনি করেছেন তা বেঙ্গালুর কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। সতীর্থের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন কোহলি। বলেছেন, “অসাধারণ একটা ইনিংস দেখলাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভাল খেলেছে। আমি চেয়েছিলাম পাওয়ার প্লে-তে আগ্রাসী ব্যাটিং করতে। কিন্তু ওকে ও ভাবে খেলতে দেখার পর নিজে কিছুটা গুটিয়ে গিয়ে ওকে যতটা সম্ভব খেলার সুযোগ করে দিয়েছি। ও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপক্ষের হাত থেকে ম্যাচ কেড়ে নিয়েছে। একটা শটের কথা এখন আমার মনে পড়ছে। স্লোয়ার বলে মিড-অনের ওপর দিয়ে একটা ছক্কা মারল। তার পরেই ওকে আমি বললাম, এ ভাবেই চালিয়ে যাও। অসাধারণ বল মারছো। চেষ্টা করো বিপক্ষের হাত থেকে ম্যাচটা কেড়ে নিতে।” চ্যাম্পিয়নের মতো শুরু চ্যাম্পিয়নদের। গত বছর যেখানে শেষ করেছিল, ঠিক সেখান থেকেই শুরু করল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে কার্যত উড়িয়ে দিল তারা। উদ্বোধনী ম্যাচে হায়দরাবাদে যদি ‘ঈশান’ কোণে ঝড় ওঠে, তাহলে বেঙ্গালুরুই বা বাদ যাবে কেন? আরসিবি’র আকাশে আবারও ‘বিরাট’ নক্ষত্র জ্বলজ্বল করে উঠল। কম গেলেন না দেবদত্ত পড়িক্কল অথবা রজত পাতিদাররাও। এসআরএইচের দেওয়া ২০২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তাই বিশেষ কাঠখড় পোড়াতে হল না আরসিবি’কে। প্রথম ম্যাচে ৬ উইকেটে জিতে আইপিএল শুরু করল বেঙ্গালুরু।





