ভোট ঘোষণার আগেই পশ্চিমবঙ্গে এসে পৌঁছেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হয়েছে শনিবার। তার পরেই পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়ে গেল বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই রাজ্যের উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক, জেলাশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করবে নির্বাচন কমিশন। শুধু তা-ই নয়, আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করবে। আংশিক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর ভোটের প্রস্তুতিতে জোর দেওয়া শুরু করল কমিশন। জানা গিয়েছে, সোমবার (২ মার্চ) রাজ্যের নির্বাচনের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বৈঠকে বসবে তারা। সোমবার সকালে বৈঠকে থাকবেন রাজ্যের আইজি, ডিআইজি, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) বা জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং এসএসপিরা। কমিশনের বৈঠকে থাকবেন রাজ্য পুলিশের নোডাল অফিসার। এ ছাড়াও, আধাসামরিক বাহিনীর (সিএপিএফ) নোডাল অফিসারের সঙ্গে বৈঠক করবে কমিশন। সূত্রের খবর, সেই বৈঠকে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। এ ছাড়াও, নির্বাচনের সময় কত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে এই বৈঠকে। ভার্চুয়ালি হবে এই বৈঠক। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিত করে টহল ও রুটমার্চ হবে। ভোটের আগে যাতে কোনও ধরনের ভীতির পরিবেশ বা অস্থিরতা তৈরি না হয়, সেদিকেই বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় থানাগুলির সঙ্গেও সমন্বয় রেখে কেন্দ্রীয় বাহিনী কাজ করবে। প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী যে ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪ জনের নাম রয়েছে, তার মধ্যে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম এখনও বিবেচনাধীন পর্যায়ে রয়েছে। যা বিবেচনা করছেন বিচারকেরা। এর মধ্যে থেকে আরও কিছু নাম বাদ যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ভোটারদের নামও যুক্ত হবে। প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকা থেকে আপাতত বাদ গেল ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম। খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জন। ফলে সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত বাদের হিসাব দাঁড়াল ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনে। ৬ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে নতুন নাম যুক্ত হয়েছে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জনের। ৮ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে নাম যুক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৬৭১ জনের। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো বিচারবিভাগীয় ঝাড়াইবাছাইয়ের পর আবার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন। অনেকের মতে, তার আগেই হয়তো রাজ্যে ভোট ঘোষণা হয়ে যেতে পারে।
অভিষেক দাবি করেন, আগের বারের থেকে আসন এবং ভোট, দুই-ই বাড়বে তৃণমূলের। তাঁর কথায়, “এসআইআর-ই করুন বা এফআইআর, ২০২৬-এ আপনারা (বিজেপি) ৫০-এর নীচে নেমে যাবেন। এক বছর আগে যা বলেছি, আজও তাই বলছি। তৃণমূলের ভোট, আসন দুটোই বাড়বে।’’ বিচারব্যবস্থার একাংশকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবাংলার বিধানসভা ভোট বিজেপি পিছিয়ে দিতে চাইছে বলে দাবি করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে তাঁর এ-ও অনুমান, ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গে সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তা হলে কি পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন বা অনুরূপ কোনও সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে বিধানসভা নির্বাচন হবে? এই প্রশ্নে কার্যত হুঁশিয়ারির সুরে অভিষেক রবিবার বলেছেন, ‘‘করে দেখুক না!’’ এসআইআর প্রক্রিয়ার পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে শনিবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকার আংশিক প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। সেই তালিকা অনুযায়ী ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের ভবিষ্যৎ এখনও বিবেচনাধীন। তাঁদের বিষয়টি দেখছেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো নিযুক্ত বিচারক এবং বিচারবিভাগের আধিকারিকেরা। সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরে অভিষেক বলেন, ‘‘৫০০ জন এই কাজে নিযুক্ত হয়েছেন। ৬০ লক্ষ মানুষের নাম, নথি স্ক্রুটিনি করতে তিন-চার মাস লেগে যাবে। তা হলে কোন জাদুকাঠির বলে মে মাসের ৫ তারিখের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে?’’ অভিষেকের বক্তব্য, যদি মে মাসের ৫ তারিখের মধ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, তা হলে ২০ মার্চের মধ্যে ভোট ঘোষণা করতে হবে। এর মধ্যে ৬০ লক্ষ মানুষের নামের বিবেচনা করা ৫০০ আধিকারিকের পক্ষে সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করেন অভিষেক। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, এই ৬০ লক্ষ মানুষের নাম খসড়া তালিকায় ছিল। ফলে তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারই তাঁদের এই বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন। প্রয়োজনে জ্ঞানেশের সেই কথা সুপ্রিম কোর্টে পেশ করার কথাও বলেছেন তৃণমূলের সেনাপতি। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানাব, যাতে বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা ৬০ লক্ষ মানুষকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সংস্থান আদালত করে দেয়।’’ অভিষেক পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করেন, শনিবার কমিশন যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তা যদি গত ২০ ফেব্রুয়ারির কমিশন প্রদত্ত তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়, তা হলে দেখা যাবে, নতুন ভোটারের সংখ্যা কমে গিয়েছে এবং ৭ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে বাতিল ভোটারের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। তাঁর এ-ও অভিযোগ, বিবেচনাধীন তালিকায় ৪৬ লক্ষ নাম জবরদস্তি অন্তর্ভুক্ত করেছে কমিশন। এবং তা করা হয়েছে ‘বিজেপি-র বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা’ অনুযায়ীই। রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা, গোলাম রব্বানি, বীরভূমের জেলা পরিষদ সভাধিপতি কাজল শেখদের নাম রয়েছে বিবেচনাধীন তালিকায়। সেই প্রসঙ্গে অভিষেক জানিয়েছেন, স্ক্রুটিনি সম্পন্ন না-হলে যদি ভোট ঘোষণা হয়ে যায়, এবং বিবেচনাধীনদের যদি ভোটাধিকার না-দেওয়া হয়, তা হলে প্রার্থিতালিকাও চূড়ান্ত করা যাবে না। তৃণমূলের সেনাপতির অভিযোগ, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের বহু বিধানসভায় ৭০-৮০ শতাংশের নাম বিবেচনাধীন তালিকায় রাখা হয়েছে। বেছে বেছে মহিলা, তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষ এবং সংখ্যালঘুদের নাম নিয়ে এই কারসাজি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। অভিষেকের বক্তব্য, ‘‘এঁরা বিজেপি-কে ভোট দেন না বলেই অভিসন্ধি নিয়ে এঁদের টার্গেট করা হয়েছে।’’ ঘটনাচক্রে গত দেড় দশক ধরে এই অংশ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং মহিলা ভোটের বিরাট সমর্থন তৃণমূলের দিকেই রয়েছে। অভিষেক দাবি করেছেন, আগের বারের থেকে আসন এবং ভোট, দুই-ই বাড়বে তৃণমূলের। তাঁর কথায়, “এসআইআর-ই করুন বা এফআইআর, ২০২৬-এ আপনারা (বিজেপি) ৫০-এর নীচে নেমে যাবেন। এক বছর আগে যা বলেছি, আজও তাই বলছি। তৃণমূলের ভোট, আসন দুটোই বাড়বে।’’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানাবিধ আলচনা রয়েছে। বিজেপি-ও নানাবিধ দাবি করতে শুরু করেছে। সেই প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, ‘‘ভবানীপুরে এখনও পর্যন্ত ১ লক্ষ ৪৮ হাজারের নাম আছে। ৮০ শতাংশ যদি ভোট পড়ে তা হলে এক লক্ষ ভোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাবেন।’’ এসআইআর পর্বে তিন ভাবে দলকে সক্রিয় রেখেছিলেন মমতা এবং অভিষেক। এক, নিচুতলার সংগঠনকে বুথস্তরে পৌঁছে দেওয়া। দুই, আদালতে দৌত্য চালানো এবং তিন, রাস্তার আন্দোলন। শনিবার প্রথম তালিকা প্রকাশের পরেও সেই অভিমুখেও অগ্রসর হওয়ার কথা বললেন অভিষেক। কমিশনের ‘কারচুপি’ নিয়ে ফের আদালতে যাবে তৃণণূল। ৬ মার্চ ধর্মতলায় ধর্নায় বসছেন মমতা। আর নতুন করে নাম তোলাতে সাংগঠনিক সক্রিয়তাও জারি রাখার বার্তা দেন।





