কল্যাণীতে মঙ্গলবার জম্মু-কাশ্মীরের বিরুদ্ধে বাংলা প্রথম ইনিংসে যে ২৬ রানের লিড পেয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিলেন এক এবং একমাত্র মহম্মদ শামি। ৯০ রানে ৮ উইকেট নিয়ে যিনি শুধু প্রতিপক্ষকে গুড়িয়ে দিলেন না, প্রথম শ্রেণির কেরিয়ারে নিজের সেরা বোলিংটাও করলেন। বঙ্গ পেসারের এমন বোলিংয়ে মুগ্ধ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক বলছিলেন, “শামি পুরো মরশুমেই ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করেছে। সেমিফাইনালেও তো আটটা উইকেট নিল। তারপরও জাতীয় দলের বাইরে। জাতীয় নির্বাচকরা ঘুরে ঘুরে ম্যাচ দেখছে। জানি না শামিকে নিয়ে নতুন করে দেখার কী আছে?” বস্তুত জাতীয় দলের জার্সিতে সেই ২০২৩ সাল থেকেই ব্রাত্য শামি। মাঝে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ডাক পেলেও ফের বাদ পড়তে হয়েছে। এত দীর্ঘ সময় তাঁকে কেন জাতীয় দলের বাইরে রাখা হচ্ছে, সে প্রশ্নে হতবাক অনেকেই। সেই তালিকায় নাম লেখালেন সৌরভও। এদিন দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলা দলের ব্যাটিং ব্যর্থতায় হতাশ সৌরভ। স্পষ্টই জানিয়েছেন, ৯৯ রানে অলআউট হওয়া মেনে নেওয়া যায় না। পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের পারফরম্যান্সে খুশি তিনি। যদিও মনে করছেন, টিম ইন্ডিয়ার আসল লড়াই শুরু হবে সুপার এইট পর্ব থেকে। যা শুরু ২২ ফেব্রুয়ারি।
দেওয়াল লিখন স্পষ্টই ছিল। বুধবার তাতে সিলমোহর পড়ল। বাংলাকে ৬ উইকেটে হারিয়ে রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে উঠল জম্মু-কাশ্মীর। শামির ৮ উইকেটের দাম দিতে ব্যর্থ বাংলার ব্যাটারেরা। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে ইনিংসে জয়। এক্সপ্রেস গতিতে এগোচ্ছিল বাংলা। জম্মু-কাশ্মীর এই দলের বিরুদ্ধে কল্যাণীতে বাংলার ঘরের মাঠেই ভোগালো। দু’ঘণ্টার এক সেশনের খারাপ ব্যাটিং গোটা মরসুমের ভাল পারফরম্যান্সে ইতি টেনে দিল। জম্মু-কাশ্মীরের কাছে হেরে বিদায় নিল বাংলা। অন্য দিকে প্রথম বার রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে উঠল জম্মু-কাশ্মীর। ৯৯ রানেই দ্বিতীয় ইনিংস শেষ! বাংলার ৩২৮ রানের জবাবে জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম ইনিংস শেষ হল ৩০২ রানে।
শামি প্রথম ইনিংসে নিলেন ৮ উইকেট। বাংলার পেসারের রঞ্জি কেরিয়ারের সেরা বোলিং ফিগার। বাংলার প্রথম ইনিংসের রান টপকে যেতে দিলেন না মহম্মদ শামি। বাংলাকে গুরুত্বপূর্ণ লিড এনে দিলেন। কল্যাণীর মাঠে দাপট দেখালেন মহম্মদ শামি। দ্বিতীয় দিনের শেষে জম্মু-কাশ্মীরের রান ছিল ৫ উইকেটে ২০৫। ক্রিজে ছিলেন কানহাইয়া ওয়াধাওয়ান ও আবিদ মুশতাক। মঙ্গলবার সকালে তাঁদের বেশি রানের জুটি গড়তে দেননি শামি। কানহাইয়াকে ২৯ ও আবিদকে ২৭ রানে ফেরান। বংশরাজ শর্মাকেও আউট করেন শামি। ২৩১ রামে ৮ উইকেট পড়ে গিয়েছিল জম্মু-কাশ্মীরের। বাংলার লিড পাওয়া সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন আকিব নবি ও যুদ্ধবীর সিংহ। বল হাতে ৫ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাট হাতেও গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন আকিব। তাঁদের মধ্যে ৬৪ রানের জুটি হয়। সেই জুটি ভাঙতে পারছিল না বাংলা। সেই সময় দেখে মনে হচ্ছিল, এই জুটিই জম্মু-কাশ্মীরকে লিড এনে দেবে। ৩৩ রানের মাথায় যুদ্ধবীরকে বোল্ড করলেন। ৪২ রানের মাথায় আকিবকে আউট করে জম্মু-কাশ্মীরকে অল আউট করে দিলেন তিনি। ৩০২ রানে শেষ হল জম্মু-কাশ্মীর। ২৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পেল বাংলা। দ্বিতীয় দিন শামি ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। তৃতীয় দিন সকালে বাকি ৫ উইকেটই নিলেন। ২২.১ ওভারে ৯০ রান দিয়ে ৮ উইকেট নিলেন বাংলার পেসার। জাতীয় দলে ব্রাত্য হয়ে গেলেও শামি দেখাচ্ছেন, এখনও কথা বলছে তাঁর বল। খেলা শেষে শামি যখন সাজঘরে ফিরছেন তখন দেখা যায়, গোটা বাংলা দল উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। এই পারফরম্যান্সের পর ভারতীয় দলে ঢোকার দাবি আরও জোরালো করলেন শামি। অথচ কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ দিয়েছে বোর্ড।
দ্বিতীয় সেশনে ছবিটা পুরোপুরি পাল্টে যায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলার টপ অর্ডার কার্যত তাসের বাড়ির মতো ভেঙে পড়ে। আকিব নবি ও সুনীল কুমারের শুরুর স্পেলে বিপর্যয়। সুদীপ ঘরামি গোল্ডেন ডাক। অভিমন্যু ঈশ্বরন ইনসুইংয়ে পরাস্ত। অনুষ্টুপ মজুমদার এলবিডব্লিউ। স্কোরবোর্ডে ২০ রানও ওঠেনি, ততক্ষণে চার উইকেট পড়ে গিয়েছে! পিচে বাড়তি বাউন্স ও মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে বোলাররা বাংলার ব্যাটারদের চাপে রাখে। অভিমন্যু ঈশ্বরণেরা প্রথম ইনিংসে এগিয়ে থাকার সুবিধা হারালেন। হঠাৎ করেই ম্যাচে কামব্যাক জম্মু ও কাশ্মীরের। দ্বিতীয় ইনিংসে জঘন্য ব্যাটিং করে তৃতীয় দিনের শেষেই রঞ্জি ট্রফির সেমিফাইনাল হারের অপেক্ষায় লক্ষ্মীরতন শুক্লর দল! প্রথম ইনিংসে ২৬ রানে এগিয়ে থাকা বাংলার দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে গেল ৯৯ রানে। জয়ের জন্য ১২৬ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে জম্মু-কাশ্মীরের রান ২ উইকেটে ৪৩। বাংলার ব্যাটারেরা তাঁর চেষ্টার মান রাখতে পারলেন না। ইনিংসের শুরু থেকেই পর পর উইকেট হারালেন ঈশ্বরণেরা। প্রথম সারির কোনও ব্যাটারই চেনা পিচে দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারলেন না। ঈশ্বরণ (৫), সুদীপ চট্টোপাধ্যায় (০), সুদীপ ঘরামি (০), অনুষ্টুপ মজুমদার (১২), সুরজ সিন্ধু জয়সওয়াল (১৪), সুমন্ত গুপ্ত (৮), হাবিব গান্ধীরা (১০) মাঠে নেমেছেন এবং সাজঘরে ফিরে গিয়েছেন। এমন বিপর্যয়ের মধ্যে কিছুটা চেষ্টা করেন শাহবাজ আহমেদ। ২৪ রান এসেছে অলরাউন্ডারের ব্যাট থেকে। বাংলাকে ৯৯ রানে অলআউট করে মঙ্গলবারই ব্যাট করতে নেমে গিয়েছিল জম্মু-কাশ্মীর। দিনের শেষে তারা জয় থেকে ৮৩ রান দূরে। হাতে রয়েছে ৮ উইকেট। শুভম পুন্ডির ২৩ এবং বংশরাজ শর্মা ৯ রানে অপরাজিত। আউট দুই ওপেনার শুভম খাজুরিয়া (১) এবং ইয়ায়ির হাসান (৬)। ২টি উইকেটই নেন আকাশ দীপ। বুধবার জম্মু-কাশ্মীরের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৮৩ রান। হাতে ছিল ৮ উইকেট। এই পরিস্থিতিতে বাংলার জয়ের আশা খুব কম ছিল। ক্রিকেটে অসম্ভবও সম্ভব হয়। দিনের শুরুতে আকাশদীপ ২ উইকেট তুলে নেওয়ায় সেই সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। বংশরাজ শর্মা ও আব্দুল সামাদকে আউট করতে পারলেন না মহম্মদ শামিরা। এই দু’জন দলকে জয়ে নিয়ে গেলেন। বংশরাজ ৪৩ ও সামাদ ৩০ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়লেন। প্রথম বার রঞ্জির ফাইনালে ওঠার পর জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটারদের উল্লাস ছিল দেখার মতো। গত কয়েক মরসুমে এই দলের উত্থান স্বপ্নের মতো। সারা বছর সেখানে ক্লাব ক্রিকেট হয় না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খেলেন। জম্মু-কাশ্মীরের সামনে লক্ষ্য ছিল ১২৬ রান। ৪ উইকেট হারিয়ে রান তাড়া করে জিতে ফাইনালে। গ্রুপ পর্বে দুরন্ত পারফরম্যান্স। কিন্তু নকআউটে গেলেই কাগুজে বাঘ। গত কয়েকবছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে এটাই বাংলার ছবি। রনজি, বিজয় হাজারে, সৈয়দ মুস্তাক আলি-সমস্ত টুর্নামেন্টের শুরুতেই ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আশা জাগায় বাংলা। কিন্তু নকআউট পর্বে স্বপ্নের সলিল সমাধি। বাংলার ক্রিকেট সমর্থকদের প্রত্যাশার কথা বাদই দেওয়া যাক। অন্তত মহম্মদ শামির পারফরম্যান্সকে ‘সম্মান’ জানাতে ম্যাচটা জেতা উচিত ছিল বাংলার।
রঞ্জি ট্রফির অন্য সেমিফাইনালে কর্নাটক প্রথম ইনিংসে তুলেছে ৭৩৬ রান। জবাবে উত্তরাখণ্ডের ধস অব্যাহত। দেবদত্ত পাড়িক্কল, লোকেশ রাহুলদের ফাইনালে ওঠা এক রকম নিশ্চিত।





