কলম্বোর প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে ঈশান কিষান যে ঝড়টা শুরু করে দিয়েছিলেন, তা মাঝে কিছুটা থমকাল। শেষ দিকে শিবম দুবে-রিঙ্কু সিংরা মিলে টিম ইন্ডিয়ার রান যথেষ্ট লড়াইয়ের জায়গায় নিয়ে গেলেন। ঈশানের রানের গতি বজায় থাকলে হয়তো আরও বড় রান উঠত। তবে তা শেষ হল ১৭৫ রানে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত এটাই ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান। কলম্বোর স্টেডিয়ামের পিচ স্লো। স্পিনারদের সহযোগিতা করেছে। টসে হেরে পাক-মহড়ায় ভারত প্রথমে ব্যাট করতে নামল জোড়া বদল করে। তার মধ্যে প্রথমজন ফ্লপ। পেটের সমস্যা সারিয়ে কি একটু তড়িঘড়ি অভিষেক শর্মাকে প্রথম একাদশে ফেরানো হল? টানা দুই ম্যাচে রানের দেখা পেলেন না তিনি। চমক দিয়ে পাক বোলিংয়ের শুরুটা করলেন সলমন আলি আঘা। তাঁর ঘূর্ণিতে ধরা পড়লেন অভিষেক। এরকম হাইভোল্টেজ ম্যাচে প্রথমে উইকেট হারালে চাপ বাড়াটা স্বাভাবিক। সেটা হতে দিলেন না ঈশান কিষান। পাকিস্তানের বোলারদের যেভাবে তিনি মাঠের বাইরে ফেললেন, তাতে মনেই হবে না দু’মাস আগেও টিম ইন্ডিয়ার র্যাডারে ছিলেন না। মাত্র ২৭ বলে হাফসেঞ্চুরি করলেন। শাদাব খান, শাহিন আফ্রিদি এক-একটা করে বল করছেন, আর ভারতের ভক্তরা অপেক্ষা করছেন সেই বলটা ঈশান মাঠের কোনদিকে পাঠান। এভাবেই ১০টা চার ও ৩টি ছক্কায় ৪০ বলে ৭৭ রান করে ফেলেন। সাইম আয়ুবের বলে যখন তিনি আউট হচ্ছেন, তখন ভারতের ইনিংস শক্ত ভিতের উপর। বিতর্কিত অ্যাকশনের স্পিনার উসমান তারিক কখন বল করতে আসেন, সেটাই দেখার ছিল। পাক অধিনায়ক তাঁকে ঈশানের ব্যাটিংয়ের সময় আনলেনই না। ১১তম ওভারে উসমান বল করতে এলেন, আর প্রথম বলেই চার মেরে তাঁকে স্বাগত জানালেন সূর্যকুমার যাদব। আর পরে শিবম দুবেও প্রমাণ করলেন, তাঁকে সামলানো এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। তবে পিচ ও অদ্ভুত অ্যাকশনের জন্য সামান্য সমস্যা হল ঠিকই। যে কারণে মাঝের দিকে রানের গতি সামান্য থমকেও যায়। পরপর আউট হয়ে টিম ইন্ডিয়াকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিলেন তিলক বর্মা ও হার্দিক পাণ্ডিয়া। সাইম আয়ুবের বলের ফ্লাইট মিস করে এলবিডব্লু হন এশিয়া কাপে পাক-বধের নায়ক তিলক। আর তার ঠিক পরের বলেই ক্যাচ তুলে ফিরলেন হার্দিক। ঈশান থাকাকালীন যেখানে ৮ ওভারে ৮০ রান উঠে গিয়েছিল, সেখানে পরের দশ ওভারে উঠল মাত্র ৭০ রান। সূর্য ধরে খেললেন, কিন্তু দরকারের সময় রানের গতি বাড়াতে পারলেন না। ৩২ রান করে উসমানের বলেই ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন ভারতের অধিনায়ক। শেষ ওভারে রিঙ্কু চার-ছক্কায় রানটাকে ১৭৫-এ পৌঁছে দেন। শেষ দুই বলে শিবম ও অক্ষর প্যাটেল আউট হওয়ায় রানটা আর এগোল না।
প্রথম দুই ওভারেই পাক ব্যাটিংয়ের কোমর ভেঙে গেল। তার জন্য স্পিনারদের ডাকার প্রয়োজনই পড়েনি। প্রথম ওভারেই সাহিবজাদা ফারহানকে আউট করেন হার্দিক। এশিয়া কাপে পাক ব্যাটার ব্যাট দিয়ে স্টেনগান সেলিব্রেশন করেছিলেন। এদিন গোলাবারুদ সবই জলে গেল। পরের ওভারে মিসাইল ছুড়লেন জশপ্রীত বুমরাহ। সাইম আয়ুব ও সলমন আলি আঘার জন্য দু’টো ‘বুম বুম’ এবং দুই পাক ব্যাটার সোজা ড্রেসিংরুমে। ম্যাচের ভাগ্য ওখানেই ঠিক হয়ে যায়। এরপর বাবর আজম ‘টেস্ট ব্যাটিং’য়ের ধারা বজায় রাখলেন। অক্ষর প্যাটেলের বলটা যেন তাঁর উইকেট ভাঙল না, ছুরির মতো সোজা গিয়ে বিঁধল। কিছুটা মরিয়া মনোভাব দেখিয়েছিলেন উসমান খান। কিন্তু তা যেন একা কুম্ভের লড়াই। কারণ বিপরীতে শাদাব খান, মহম্মদ নওয়াজরা মাঠে আসা ও ড্রেসিংরুমে ফেরার ধারা বজায় রেখেছিলেন। তিলক বর্মা ফেরালেন শাদাবকে এবং কুলদীপের শিকার নওয়াজ। আর অক্ষর প্যাটেলের ধাঁধার কোনও উত্তর খুঁজে না পেয়ে আউট উসমান! পাকিস্তান যে ১০০-র মধ্যেই গুটিয়ে গেল না, তার জন্য ভারতের দু’টো ক্যাচ মিস দায়ী। আর শাহিন আফ্রিদি ১৯ বলে ২৩ রান করে কিছুটা লজ্জা বাঁচালেন। হার্দিক, জশপ্রীত, অক্ষর, বরুণ- চার বোলারের সংগ্রহ দু’টি করে উইকেট। ভারত চলে গেল সুপার এইটে। আর পাকিস্তানের বিশ্বকাপ ভাগ্যে ফের রেড ফ্ল্যাগ!
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ভারতের শেষ ম্যাচ নিয়মরক্ষার হয়ে দাঁড়াল। রবিবার কলম্বোর মাঠে পাকিস্তানকে ৬১ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপের সুপার এইট নিশ্চিত করে ফেলেছে ভারত। সেখানে তিনটি ম্যাচ খেলতে হবে সূর্যকুমার যাদবদের। কবে কবে সেই ম্যাচ হবে তা-ও জানা গিয়েছে। বিশ্বকাপের সুপার এইটে দু’টি গ্রুপ রয়েছে। গ্রুপ ‘এক্স’ ও গ্রুপ ‘ওয়াই’। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি দল থেকে যে দুই দল নক আউটে উঠবে তাদের আলাদা আলাদা গ্রুপে রাখা হবে। তবে সুপার এইটে আটটি দল আগে থেকে ধরে রাখা হয়েছে। তারা গ্রুপ পর্বে যে স্থানেই শেষ করুক না কেন, নক আউটে নির্দিষ্ট জায়গাতেই খেলবে। ভারত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হোক, বা দ্বিতীয় স্থানেই শেষ করুক, তারা এক্স গ্রুপের প্রথম দল (এক্স ১)। এই গ্রুপের বাকি তিন দল ধরা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া (এক্স ২), ওয়েস্ট ইন্ডিজ় (এক্স ৩) ও দক্ষিণ আফ্রিকা (এক্স ৪)। তার মধ্যে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের সুপার এইট পাকা। ঠিক তেমনই ওয়াই গ্রুপের চারটি দল ধরে রাখা আছে ইংল্যান্ড (ওয়াই ১), নিউ জ়িল্যান্ড (ওয়াই ২), পাকিস্তান (ওয়াই ৩) ও শ্রীলঙ্কা (ওয়াই ৪)। যদি কোনও দল এই তালিকায় থাকা কোনও দলের বদলে সুপার এইটে ওঠে, তা হলে তার জায়গা নেবে তারা। যেমন, যদি অস্ট্রেলিয়ার বদলে সেই গ্রুপ থেকে জ়িম্বাবোয়ে ওঠে তা হলে অস্ট্রেলিয়ার বদলে তাদের জায়গা হবে এক্স ২। ১ মার্চ ‘এক্স ১’ বনাম ‘এক্স ৩’ ম্যাচ রয়েছে। অর্থাৎ, সে দিন কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ম্যাচ হবে। এই ম্যাচের সূচি ঠিক হয়ে গিয়েছে। ভারতের বাকি দুই ম্যাচ ২২ ফেব্রুয়ারি ও ২৬ ফেব্রুয়ারি। ২২ তারিখ অহমদাবাদ ও ২৬ তারিখ চেন্নাইয়ের মাঠে খেলা। এখনও পর্যন্ত যা অবস্থা তাতে ২২ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২৬ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের খেলা পড়বে। প্রতিটি ম্য়াচই শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টা থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকার সুপার এইটে ওঠা প্রায় পাকা। ইতিমধ্যেই গ্রুপ ডি-র শীর্ষে তারা। অস্ট্রেলিয়া অবশ্য চাপে রয়েছে। তাদের বদলে নক আউটে ওঠার সুযোগ রয়েছে জ়িম্বাবোয়ের। যদি তেমনটা হয়, তা হলে ২৬ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার বদলে জ়িম্বাবোয়ের মুখোমুখি হবেন সূর্যেরা।





