পুলওয়ামায় হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সব রকম ক্রিকেটীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার ডাক দিয়েছিলেন গম্ভীর। সেই মন্তব্যকে হাতিয়ার করেছেন অনেক পাকিস্তান সমর্থক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে শ্রীলঙ্কায় পৌঁছে গিয়েছে পাকিস্তান। ভারতের বিরুদ্ধে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ খেলবে না। পাকিস্তানের বয়কট-বিতর্কের মাঝেই গৌতম গম্ভীরের একটি পুরনো মন্তব্য ভাইরাল। ২০১৯-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের সেনাবাহিনীর একটি কনভয় জম্মু ও কাশ্মীরের হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি কনভয়ে ঢুকে পড়ে এবং সেনাবাহিনীর একটি বাসকে ধাক্কা মারে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ হয়। মারা যান ৪০ জন সেনা। মৃত্যু হয় আত্মঘাতী জঙ্গিরও। ওই জঙ্গির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদতের প্রমাণ পরে পাওয়া গিয়েছিল। সেই ঘটনার এক মাস পরে এক সাক্ষাৎকারে গম্ভীর বলেছিলেন, “শর্তসাপেক্ষে নির্বাসন কখনওই মানা যায় না। হয় পাকিস্তানকে সব দিক থেকে নির্বাসিত করুন, না হলে সব জায়গায় খেলুন। পুলওয়ামায় যা হয়েছে তা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইসিসি প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে বয়কট করা কঠিন হতে পারে ভারতের জন্য। কিন্তু এশিয়া কাপে বয়কট করাই যায়। জানি অনেক ঝামেলা হতে পারে। আমরা হয়তো সেমিফাইনালে গেলামই না। পাকিস্তানকে বয়কট করলে কোনও সংবাদমাধ্যমই ভারতীয় দলকে দোষী বানাতে পারবে না। দু’পয়েন্ট অতটাও দরকারি নয়। দেশ সকলের আগে। ক্রিকেট ম্যাচের থেকে ওই ৪০ জন জওয়ানের মৃত্যু অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য বিশ্বকাপ ফাইনাল ছাড়তে হলেও দেশবাসীর সমর্থন থাকা উচিত।” ২০১৯ বিশ্বকাপ ভারত খেলেছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বিরাট কোহলির দল জিতেছিল ৮৯ রানে। এর পর থেকে প্রতি বছরই কোনও না কোনও আইসিসি বা এশীয় প্রতিযোগিতায় দু’দেশের সাক্ষাৎ হয়েছে। অন্য দেশে খেলা হলেও কখনও কোনও দেশ এই ম্যাচ বয়কট করেনি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তানের সরকার। সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডও (পিসিবি)। তবে আইসিসি-কে এ কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে জানাবে না তারা। সূত্রের খবর, ভারতের বিরুদ্ধে না খেলার বিষয়টি জানিয়ে আইসিসি-কে কোনও ‘ই-মেল’ পাঠাবে না পিসিবি। তবে ম্যাচের দিন তারা মাঠে হাজির থাকবে না। অর্থাৎ বল এখন পুরোটাই আইসিসি-র কোর্টে। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা দেরি হতে পারে। পিসিবি-র সূত্রকে উদ্ধৃত করে ‘এনডিটিভি’ জানিয়েছে, আইসিসি-কে কোনও ই-মেল পাঠানো হবে না। আইসিসি ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা পিসিবি-র তরফে আনুষ্ঠানিক বার্তার অপেক্ষা করে আছে। তা না পাঠানো হলে আইসিসি-কে নিজের থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ম্যাচের দিন পাকিস্তান দল মাঠে হাজির না হলে, তার পরে শাস্তি হিসাবে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আইসিসি-কে সরকারি ভাবে পিসিবি কিছু না জানালে এখনই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। পাকিস্তান সরকার এক্স মাধ্যমে পোস্ট করে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। তারা বলেছিল, “পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে না পাকিস্তান।” পাকিস্তানকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আইসিসি। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা বলেছিল, “জাতীয় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের ভূমিকাকে আইসিসি সম্মান করে। কিন্তু পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব ক্রিকেটের স্বার্থের পরিপন্থী। গোটা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ক্রিকেটপ্রেমী, যাঁদের মধ্যে পাকিস্তানের সমর্থকেরাও রয়েছেন, তাঁদের ভালর কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নয়।” আইসিসি জানিয়েছিল, তারা প্রত্যাশা করে পাকিস্তান সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আইসিসি লিখেছিল, “পিসিবি তাদের দেশের ক্রিকেটের উপর এর সুদূরপ্রসারী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের কথা বিবেচনা করবে। কারণ এটি বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, যার অন্যতম সদস্য এবং সুবিধাভোগী পিসিবি নিজেই।” আইসিসি আরও লিখেছিল, “পাকিস্তানের ‘বাছাই করা ম্যাচ খেলার’ অবস্থান বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তির সঙ্গে মেলানো কঠিন। কারণ, এ ধরণের প্রতিযোগিতায় যোগ্যতা অর্জন করা সকল দলের কাছে প্রত্যাশা থাকে যে, তারা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সমান শর্তে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।” পাক বোর্ডকে নিজেদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়ে আইসিসি শেষে লিখেছে, “আইসিসির অগ্রাধিকার হল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সফল ভাবে আয়োজন করা। পিসিবি-সহ এর সকল সদস্যেরও এটা দায়িত্ব হওয়া উচিত। আইসিসি আশা করে পিসিবি একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করবে যা বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত সকলের স্বার্থ রক্ষা করবে।
প্রতিক্রিয়াহীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েই এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বিতর্কের শুরু আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে বাংলাদেশের জোরে বোলারকে দল থেকে বাদ দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। তার পরই ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলার ব্যাপারে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ। ভারতের ক্রিকেটার, কর্তা, সমর্থকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তাঁর নির্দেশেই বিসিবি ভারতের দল না পাঠানোর কঠোর অবস্থান নেয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার আইসিসি কর্তারা দফায় দফায় আলোচনা করেও সমাধান করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আইসিসির বোর্ডের বৈঠকে ভোটাভুটিতে ১৪-২ ভোটে খারিজ হয়ে যায় আমিনুল ইসলামদের দাবি। বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ক্রমতালিকার ভিত্তিতে। আইসিসির বোর্ডের বৈঠকে দু’টি ভোট পেয়েছিল বাংলাদেশ। একটি নিজেদের। আর অন্যটি পাকিস্তানের। বিসিবির সঙ্গে আইসিসির আলোচনার সময় থেকেই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বাংলাদেশের পাশে ছিল। বাংলাদেশের দাবিতে সমর্থন করে আইসিসির সমালোচনাও করেছিলেন মহসিন নকভিরা। আইসিসির বোর্ডে সুবিধা না হওয়ার পর পাকিস্তান নতুন অবস্থান নেয়। গত ২৬ জানুয়ারি পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজের সঙ্গে বৈঠকের পর পিসিবি চেয়ারম্যান নকভি জানান, পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিত জানিয়েছেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে ৩০ জানুয়ারি অথবা ২ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যেই রবিবার ১ ফেব্রুয়ারি পাক সরকার সমাজমাধ্যমে জানিয়ে দেয়, পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেললেও ভারত-ম্যাচ বয়কট করবে। এই সিদ্ধান্তের কারণ অবশ্য জানানো হয়নি। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। শাস্তি এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকির কথা জেনেই পদক্ষেপ করেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে নিজেদের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনাই ক্ষীণ করে দিয়েছে পাকিস্তান। তাদের এই পদক্ষেপের পর ২২ ঘণ্টার বেশি সময় কেটে গিয়েছে। তার পরও বিসিবি সরকারি ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বাংলাদেশের এই অবস্থানে বিস্মিত ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ।





