‘হীরক রাজার দেশ’-এ হীরার খনির শ্রমিকদের মতোই এঁদের জীবন। প্রান্তিক মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমে তৈরি হয় সুস্বাদু সব মোমোর পদ। চড়া দামে বিক্রি হয় গোটা দেশজুড়ে। ‘হীরক রাজার দেশ’-এ হীরার খনির শ্রমিকদের মতোই এঁদের জীবন। সুস্বাদু খাবার তৈরি করলেও নিজেরা সেসবের স্বাদ পাননি কস্মিনকালেও। শুধু দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটাতে মেদিনীপুর থেকে এসেছিলেন এসব শ্রমিকরা। সেই ক্ষুণ্ণিবৃত্তির তাগিদ তাঁদের পৌঁছে দিল মৃত্যুর দোরগোড়ায়। দেশের মধ্যে অন্যতম বড় ফুড জায়েন্টের নাম এখন ‘ওয়াও মোমো’। ব্যবসা তাদের দিনদিন ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিন্তু সবই কি অসদুপায়ে? নাজিরাবাদে সংস্থার ছাই হয়ে যাওয়া কারখানা এই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে? দায় কার? যাঁরা কাজ দিয়েছেন, তাঁদেরই। দরিদ্র মানুষের কাজের সংস্থান করেছেন বলে আর কোনও ন্যূনতম দায়িত্ব নেবেন না, তা তো হয় না। মুনাফার অর্থ নিজেদের পকেটে ভরতে এতটাই বুঁদ যে কর্মী সুরক্ষায় এতটুকুও নজর নেই মালিকদের! এই অবহেলার দহনও কম নয়। সেই জ্বালায় জ্বলতে থাকা জীবন থেকে মানুষগুলোর প্রশ্ন কিন্তু এভাবেই অগ্নিশলাকার মতো ধেয়ে আসবে ওই মালিকদের দিকে। তখন নিজেদের আগুনের আঁচ থেকে বাঁচাতে পারবেন তো?

আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে কেন হঠাৎ এত শোরগোল, এত সমালোচনা? তা বোঝার আগে ঘটনা পরম্পরা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। রবিবার গভীর রাতে নাজিরাবাদের ‘ওয়াও মোমো’র কারখানায় ঘুমের মধ্যেই আগুনের তাপ টের পান শ্রমিকরা। মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিবলয় ঘিরে ধরে তাঁদের। পালানোর পথ ছিল না। কারখানার প্রথম দরজাটি খোলাই যায়নি। ফলে বদ্ধ কারখানায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় আটজনের। তবে এই সংখ্যা বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা সকলের। দেড় দিন পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপে আটকে আরও অনেকে। নিখোঁজের সংখ্যা পেরিয়েছে ১৫। দমকল যখন আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে, তখন লেলিহান শিখার গ্রাসে চলে গিয়েছে কারখানা এবং তার পাশের একটু গুদামও। একগাদা দাহ্য পদার্থেই জতুগৃহ হয়ে উঠেছে এলাকা। যেদিকে দু’চোখ যায়, কালো, পোড়া জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। মঙ্গলবার সকালে নাজিরাবাদে গিয়ে অনেক কিছুই জানা গেল। নামী মোমো প্রস্তুতকারক সংস্থার ওই কারখানায় তিনটি রান্নাঘর ছিল। প্রথমটিতে রান্না হতো না। সেখানে হতো প্যাকেজিংয়ের কাজ। দুই এবং তিন নম্বর রান্নাঘরে রান্না হতো। রবিবার রাতে তিন নম্বর রান্নাঘর থেকে যখন আগুন ছড়ায়, তখন ঘুমোচ্ছিলেন সকলে। প্রথম রান্নাঘর পেরিয়ে মূল দরজা খুলে বেরতে চেয়েও পারেননি। আগুন থেকে বাঁচতে অসহায় শ্রমিকদের আকুতি পর্যবসিত হয়েছিল ‘ব্যর্থ পরিহাসে’। ফলস্বরূপ কারখানা থেকে উদ্ধার হয়েছে দগ্ধ মৃতদেহ, এখনও কতজন যে নিখোঁজ, তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই প্রশাসনেরও।

যদিও ঘটনার দেড়দিন পর কারখানার সুপারভাইজার ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে জবাব দিলেন, ”এখানে বেআইনি কিছু হচ্ছিল না।” তবে যে দমকলের ডিজি নিজে জানিয়েছেন, তাঁদের অনুমতি ছাড়া কারখানা চলছিল? তার জবাব আর দিতে পারেননি সুপারভাইজার। এখন প্রশ্ন হল, মোটা অঙ্কের মুনাফার স্বার্থে এই যে নিরাপত্তাহীনতার ‘বলি’ হল ৮টি প্রাণ, তাদের পরিবারকে জবাব কে দেবে? নামেই যত চমক! কাজের বেলায় চরম উদাসীনতার পরিচয় দিল নামী ফুড জায়েন্ট ‘ওয়াও মোমো’।

উধাও গঙ্গাধর দাস। তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ। গঙ্গাধর বাবুর চারজন ছেলে। একজন আমেরিকায় চাকরি করেন। দু’জন কলকাতায় ব্যবসা করেন এবং ছোটছেলে পড়াশোনা করে। খেজুরির বাড়িতে স্ত্রী কল্পনা দাস একাই থাকেন। মাঝেমধ্যে গঙ্গাধরবাবু গ্রামের বাড়িতে যান বলে খবর। ঘটনার পর খেজুরির বাড়িও বন্ধ। বাড়িতে কেউ আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না! পুলিশ ওই ব্যবসায়ীর খোঁজ করতে শুরু করেছে। নরেন্দ্রপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে বলেও খবর। কেমন মানুষ এই গঙ্গাধর দাস? স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মানুষ হিসেবে তাঁর এলাকায় যথেষ্ঠ সুনাম আছে। খেজুরিতে একটি নার্সারি স্কুল ও একটি বিএড কলেজ রয়েছে তাঁর। গ্রামের মানুষের আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়ান। কোটি টাকার ব্যবসা করলেও গ্রামে সকলের সঙ্গেই সাধারণের মতো মেলামেশা করেন। আনন্দপুরে প্রায় চার বিঘা জমির উপর ওই কারখানা ছিল। সরকারি, বেসরকারি টেন্ডার নিয়ে তিনি কাজ করতেন। ওই সংস্থায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন শ্রমিক কাজ করতেন বলে খবর। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, ব্যবসার এইসব উপকরণ দেশের বিভিন্ন অংশ, বিদেশ থেকে আসত। আনন্দপুরের গোডাউনে ওই বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম রাখা হত। প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, ফুল, কাঠ, কাপড়, ওড়না, চেয়ার-সহ ডেকোরেশনের সামগ্রী সবই প্রায় দাহ্যবস্তু। ফলে রবিবার রাতে দ্রুত সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে অনুমান। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার খেজুরি থানার পূর্বচড়া এলাকার বাসিন্দা গঙ্গাধর দাস। বছর ৪০-এর বেশি সময় ধরে তিনি ডেকোরেশনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে। বিদেশ থেকে প্লাস্টিক ফুল নিয়ে আসা হত। ওই ফুল দিয়ে অনুষ্ঠান বাড়ি, সভা, সমিতির মঞ্চ-সহ অন্যান্য জায়গা সাজানোর কাজ হত। পূর্ব মেদিনীপুরের পাশাপাশি কলকাতার অদূরে আনন্দপুরেও গঙ্গাধর দাসের কারখানা ও গোডাউন ছিল। সেখানেই রবিবার রাতে ভয়াবহ আগুন লাগে। আনন্দপুরে বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত মোমো কারখানা। ওই কারখানার পাশেই ছিল একটি ডেকরেটরস-এর কারখানা ও গোডাউন। সেটিও সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছে। ওই কারখানায় থানা কোনও কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, কিনা এখনও স্পষ্ট নয়। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই পলাতক ওই কারখানার মালিক গঙ্গাধর দাস। আজ, মঙ্গলবার তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে বলে খবর।বাইপাস লাগোয়া আনন্দপুরের প্রত্যন্ত এলাকা নাজিরাবাদের জলাজমিতে দমকলের অনুমতি ছাড়াই তৈরি হয়ে গিয়েছিল কারখানা। প্রশাসনের নজরদারির আড়ালে ব্যবসা তরতরিয়ে বেড়ে উঠবে, এমনটাই বোধহয় ভেবেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিপদ যখন আসে, কাউকে রেয়াত করে না। তাই কারখানার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আট আটটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া, কারখানা ভস্মীভূত করে দেওয়ার পাশাপাশি ফাঁস করে দিল কর্তৃপক্ষের এই উদাসীন মনোভাব।





