প্রজাতন্ত্র দিবসের সকাল থেকে খবরের শিরোনামে আগুন আর আগুন। একাধিক স্থানে অগ্নিকাণ্ড। আনন্দপুরে একটি গোডাউনে আগুন লাগার ঘটনা। রবিবার রাত পেরিয়ে সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত, আনন্দপুরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে রীতিমতো বেগ পেতে হয় দমকলকর্মীদের। ফের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল মল্লিকবাজারের একটি ফ্ল্যাটে। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ এজেসি বোস রোডের মন্দির গলি একটি ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় তলে আগুন লাগে। স্থানীয় সূত্রে খবর, সেসময় বাড়িতে ছিলেন এক বৃদ্ধা-সহ ৪ জন। দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে নামিয়ে আনা হয়। দমকল আসার আগে, আগুন নেভাতে কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, এলাকার মানুষই। হাত লাগান আগুন নেভানোর কাজে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানালেন, এলাকার মানুষই সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু আগুন নিভছিল না। পরে দমকল আসে। ওই বাড়িতে এক দম্পতি তাঁদের শিশুকে নিয়ে থাকতেন, সঙ্গে থাকতেন বৃদ্ধা মা-ও। পুলিশ এসে প্রথমেই তৎপরতার সঙ্গে পাশাপাশির বাড়িগুলি খালি করে দেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন, স্থানীয় ৬১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মঞ্জুর ইকবাল। শেষমেশ দেড় ঘণ্টা ধরে ৪টি ইঞ্জিনের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কীভাবে আগুন লাগে, খতিয়ে দেখা যাচ্ছে। সকালেই কলকাতার আনন্দপুরের কাছে নাজিরাবাদে ভয়াবহ আগুন লাগে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুন বাড়তে থাকে। গোডাউনের বিস্তীর্ণ অংশ জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায়। ধৌঁয়ায় ঢেকে যায় এলাকা। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায় দমকলের ১২টি ইঞ্জিন। ৬ জন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে দমকল। নিখোঁজদের মধ্যে ২ জন খাদ্য সামগ্রী সরবরাহকারী সংস্থার গোডাউনের কর্মী ও একজন নিরাপত্তারক্ষী, বাকি তিনজনের পরিচয় ওখনও জানা যায়নি। সোম ভোরে প্রথমে ডেকরেটার্সের গোডাউনে আগুন লাগে। চোখের নিমেষে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের খাদ্য সামগ্রী সরবরাকারী সংস্থার গোডাউনে ও একটি মেসে। এদিন দুপুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছন অরূপ বিশ্বাস। নিখোঁজ কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এদিকে, অগ্নিকাণ্ড নিয়ে রাজ্য় প্রশাসনকে আক্রমণ করতে ছাড়েনি বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘সরকার থাকলে তো আগুন নেভাবে। সরকার নেই। ছুটি কাটাচ্ছে প্রজাতন্ত্র দিবসে।’ রাজনীতি, দোষারোপের পালাও চলবে। কিন্তু প্রাণগুলোর খোঁজ নেই, তাঁদের পরিবারের কী হবে? আতঙ্কে কাঁটা ওঁরা।
অগ্নিকাণ্ডে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গুদাম দুটো কি বেআইনিভাবে তৈরি করা হয়েছিল? অভিযোগ, ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড অর্থাৎ জলাভূমি বুজিয়ে তৈরি করা হয়েছিল অভিশপ্ত গুদাম দুটি। এখন তুঙ্গে উঠেছে তরজা। ধারাবাহিকভাবে এই গোডাউনগুলি এখানে হচ্ছে, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টি গোডাউন আছে এখানে। ওয়েস্টবেঙ্গলে প্রশাসন কাজ করে না। এখানে পলিটিক্যাল লোকজনকে ব্লেম করে কিছু কাজ হবে না। একটু ছ্যাকাতেই কতটা কষ্ট হয় আমাদের। আর, জীবন্ত দ্বগ্ধ হয়ে এভাবে তিলে তিলে মৃত্যু! একজন নয়, একাধিক! আনন্দপুরের কাছে নাজিরাবাদে, ২টি গুদামে ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডে যখন স্বজনহারাদের কান্না বাঁধ মানছে না, তখন অগ্নিকাণ্ডে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই গুদাম দুটো কি বেআইনিভাবে তৈরি করা হয়েছিল? ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড অর্থাৎ জলাভূমি বুজিয়ে তৈরি করা হয়েছিল অভিশপ্ত এই দুটি গুদাম? পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত বলেন, প্রায় ৩০ ভাগ ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড ভরাট হয়ে গেছে এবং সেখানে নির্মাণ হয়েছে বা হচ্ছে। বেআইনিটাই তো এখন আইনি। ভোটব্যাঙ্ক, নোটব্যাঙ্ক দুটো ব্যাঙ্ক যদি এক সাথে চলে আসে এবং কেউ তো দেউলিয়া হতে চায় না, সুতরাং পলিটিক্যাল স্ট্যান্ডটা হচ্ছে আমাদের ভোট আর নোটের উপর নির্ভর করে। আর দুটোই যেহেতু এই অবৈধ নির্মাণ থেকে ক্যাটার করা হচ্ছে, তাদেরকে কেউ ছুঁতে পারবে না। উত্তরে কলকাতায় আর জায়গা নেই। দক্ষিণেও একই অবস্থা। পশ্চিমে গঙ্গা। ফলে জায়গা শুধু রয়েছে পূবে। অর্থাৎ, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের ধারে। কারণ সেখানেই রয়েছে বিঘার পর বিঘার জলাজমি। দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর যদি কলকাতার ফুসফুস হয়ে থাকে। তাহলে পূর্বের এই বিস্তৃর্ণ জলাভূমি হচ্ছে কলকাতার কিডনি। আর এখানেই বেআইনিভাবে জলাজমি ভরানোর অভিযোগ উঠছে!প্রশাসন কিংবা রাজনীতিবিদদের চোখের সামনে বেআইনিভাবে জলভূমি ভরাট করে নির্মাণ কি আদৌ সম্ভব? আর এখানেই বেআইনিভাবে জলাজমি ভরানোর অভিযোগ উঠছে! প্রশাসন কিংবা রাজনীতিবিদদের চোখের সামনে বেআইনিভাবে জলভূমি ভরাট করে নির্মাণ কি আদৌ সম্ভব? টাকার বিনিময়ে জলাজমি ভরাট করছে। এই টাকার ভাগ যাচ্ছে নিচতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত। নেতা-মন্ত্রী-সান্ত্রী-এমএলএ-এমপি-কালীঘাট-ক্ক্যামাক স্ট্রিট কেউ বাদ যায় না এই টাকা নিতে।
দমকলমন্ত্রী বলছেন, জলাজমি ভরাট হচ্ছে কি না, তাঁর দেখার দায়িত্ব নয়! প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে দেখবে কে? যাঁর দেখার দায়িত্ব তিনি কি দেখেও চোখ বন্ধ করে আছেন? দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু বলেন, ওয়েটল্যান্ডের মধ্যে যদি কারখানা হয়ে থাকে, এটা ফায়ারের সাবজেক্ট না। ফায়ারের সাবজেক্ট হচ্ছে আগুন যেখানে লাগছে, সেখানে আগুন নেভানোর কাজ আমাদের। ওয়েটল্যান্ডের জন্য যদি কোনও কারখানা হয়ে থাকে, ওখানে যারা দেখার দায়িত্বে আছে, তারা দেখবে। যদি এমনি ধরনের ঘটনা হয়ে থাকে, যেটা আইনগত ব্যবস্থা আছে, নেওয়া হবে। দমকল মন্ত্রী বলেন, ‘অনেক বড় জায়গা জুড়ে দুই খানা গোডাউন ছিল। আমরা সকাল থেকে এটা ফলো করছি। ফায়ারের এনকোয়ারি হয়। ফায়ারের রিপোর্ট হয়, কিন্তু মানুষেরও কিছু অসতর্কতা থাকে। এতবড় শহরের মধ্যে অনেকে অনেক কিছু ঘটনা ঘটায়। অনেকে নিজেরা বুঝতে পারে না, অনেকে লাইফটার থেকে ব্যবসাটাকে মনে করে বড়! আমরা এগুলি খতিয়ে দেখব সব। কিন্তু ওখানে অত লোক থাকবে কেন রাত্রিবেলায় ? একটা গোডাউনের মধ্যে অতলোক থাকবে কেন ? এগুলি এনকোয়ারি হচ্ছে।’সালটা ছিল ১৯৭১। গোটা বিশ্বের জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে একটি সম্মেলন হয়েছিল ইরানের রামসর শহরে। গঠিত হয় জলাভূমি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক কমিটি আরএএমএসএআর ১৯৮২ সালে, জলাভূমি সংরক্ষণ সংক্রান্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ কমিটি আরএএমএসএআর কনভেনশনে স্বাক্ষর করে ভারত। আরএএমএসএআর দ্বারা ভারতের ৯৬টি ওয়েটল্যান্ডকে চিহ্নিত করা একটি ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড।
আনন্দপুরের কাছে নাজিরাবাদের দুটি গুদামে আগুন, মৃত ৭, নিখোঁজ ২০। গিয়েছে ৭ জনের অগ্নিদগ্ধ দেহ উদ্ধার। কিন্তু তাঁদের এখনও সনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি। এদিকে গুদামের ভিতরে এখনও জ্বলছে আগুন। আগুন লাগার পর থেকেই নিখোঁজ ২০ জন। ওই ২০ জনের নামে নিখোঁজের ডায়রি দায়ের করা হয়েছে। গুদামের ভিতর থেকে ২জনের দেহ বার করা সম্ভব হয়েছে।আগুন লাগার পর ভয় পেয়ে ভিতর থেকে ফোন করেছিলেন আটকে পড়া পঙ্কজ হালদার, বলেছিল, আর বাঁচব না, দাবি জানিয়েছেন, গোডাউনের নিখোঁজ কর্মচারীর আত্মীয়র। আগুনের সঙ্গে ১১ ঘণ্টা ধরে লড়াই দমকলের ১২টি ইঞ্জিনের। গোডাউনে প্রচুর নরম পানীয় ও খাদ্য সামগ্রী মজুত ছিল বলে জানা গিয়েছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গোডাউনের পাশের মেস ও একটি বাড়ি খালি করা হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে আসেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। এলাকাটি সোনারপুর উত্তর বিধানসভা এলাকা ও নরেন্দ্রপুর থানার অন্তর্গত। অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে এলাকা গিয়েছেন বিধায়ক ফিরদৌসী বেগম। শেষ অবধি পাওয়া খবরে, এখনও অবধি ৭ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। এবং গোডাউনের পিছন দিয়ে দুটি চেন দেওয়া ব্যাগ বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে। এখন ব্যাগের মধ্যে এক-বা একাধিক দেহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তার কারণ অনেকেই দাবি জানিয়েছেন, এই অগ্নিকাণ্ডে উত্তাপ এতটাই বেশি ছিল, যে দেহ সম্পূর্ণ ঝলসে গিয়েছে। যারা নিখোঁজ রয়েছেন, বা যাদের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যাটা কী ? বারুইপুর জেলার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তাঁরা পুরো বিষয়টা তদন্ত করে দেখছেন। পরে গোটা বিষয়টা নিয়ে অফিশিয়াল কমিউনিকেশন করা হবে। কিন্তু এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কিন্তু কিছু বলতে চাননি। অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে এখনও পর্যন্ত, ২০ জন ব্যাক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশের কাছে মিসিং ডায়রি হয়েছে। ৭ জনের মৃত্যুর খবর এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। ঘটনাস্থলে একাধিক দমকলের ইঞ্জিন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করে চলেছে। নিয়ে আসা হয়েছে জেসিবিও।





