RK NEWZ শাহের জনসংযোগ কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল দুপুরের পর থেকে। পৌনে তিনটেয় পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে প্রথম জনসভা। বিকেলে হাওড়ার শ্যামপুরে জনসভা। তার পরে হাওড়ার রামরাজাতলা এবং দক্ষিণ কলকাতার রানিকুঠিতে রোড শো। কলকাতা থেকে জামালপুর হেলিকপ্টারে পৌঁছতে বড়জোর আধ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই বেলা পৌনে তিনটেয় সভা থাকলে দুপুর ২টো ১৫ নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ওড়াই যথেষ্ট। অতএব শাহের জন্য বরাদ্দ হেলিকপ্টার শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বরাদ্দ করে দেওয়া হয় সুকান্তের জন্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্য ভারতীয় বায়ুসেনার তিনটি হেলিকপ্টার এখন কলকাতা বিমানবন্দরেই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে দিনগুলিতে পশ্চিমবঙ্গে থাকছেন, সে সব দিনে আরও দু’টি করে হেলিকপ্টার বিমানবন্দরে এনে রাখা হয় ‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসাবে। অর্থাৎ, যে তিনটি কপ্টারের বহর নিয়ে তিনি যাতায়াত করেন, তার মধ্যে কোনওটিতে সমস্যা থাকলে যাতে তৎক্ষণাৎ বিকল্পের ব্যবস্থা করা যায়। শনিবার প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় ছিলেন না-বলে অতিরিক্ত দু’টি হেলিকপ্টার বিমানবন্দরে এনে রাখা হয়নি। বাকি তিনটি বিমানবন্দরের টারম্যাকে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তার কারণে সেগুলি অন্য কারও জন্য বরাদ্দ করার অবকাশ ছিল না। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই শাহের হেলিকপ্টারও সাধারণত আলাদা রাখা হয়। অন্য কাউকে তা দেওয়া হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এ ধরনের প্রোটোকল বা নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের গেরো যাতে প্রচারাভিযানের গতিরোধ না-করে, শাহ সে বিষয়ে সতর্ক। তাই নিজের জন্য বরাদ্দ হেলিকপ্টারটি তিনি বসিয়ে রাখার পক্ষপাতী নন। শাহের মতো সুকান্তেরও শনিবার চারটি কর্মসূচি ছিল। সবক’টিই রোড শো। প্রথমে পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ এবং মেমারিতে। তার পরে কলকাতায় ফিরে বেহালা পশ্চিম এবং কলকাতা বন্দর বিধানসভা কেন্দ্রে। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছে যান সুকান্ত। টারম্যাকে পৌঁছে বুঝতে পারেন, এত দিন যেটিতে যাতায়াত করেছেন, এটি সেই হেলিকপ্টার নয়। নতুন এবং আধুনিক সুবিধাযুক্ত। উড়ান শুরুর আগে পাইলট যখন সওয়ারিদের নিয়মমাফিক ‘ব্রিফ’ করছেন, তখন জানা যায় যে, যানটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্যই এসেছে এবং সেটি একেবারেই নতুন। ১০টা ২০ নাগাদ কলকাতা থেকে উড়ে ১০টা ৪৮ মিনিটে খণ্ডঘোষ পৌঁছোন সুকান্ত। সেখানকার রোড শো সেরে আবার হেলিপ্যাড এবং আকাশপথে মেমারি। তখন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে ১২টা। ওই সময়ের মধ্যেই হেলিকপ্টার ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল সুকান্তের। তাই তাঁকে মেমারিতে নামিয়ে সেটি কলকাতা ফিরে আসে শাহকে নিয়ে জামালপুর রওনা দেওয়ার জন্য। আর মেমারির কর্মসূচি সেরে সড়কপথে বিকেলের মধ্যেই কলকাতা ফিরে আসেন সুকান্ত। শনিবার শাহ ছাড়াও বিজেপির কেন্দ্রীয় স্তর থেকে আসা একঝাঁক ‘ওজনদার’ নাম দক্ষিণবঙ্গ চষে বেড়িয়েছেন। রাজনাথ সিংহ, জেপি নড্ডা, নিতিন নবীন, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, স্মৃতি ইরানি, মনোজ তিওয়ারি তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও ঘন ঘন যাওয়া আসা করছেন। তাই প্রচারের ‘স্লগ ওভারে’ বিজেপিতে হেলিকপ্টারের চাহিদা তুঙ্গে। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হচ্ছে ‘শাহি’ প্রোটোকলকেও। বিজেপির রাজ্য নেতারা আড়ালে-আবডালে বলছেন ‘কার্পেট বম্বিং’। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের উপর আকাশ থেকে ভারী মাত্রায় বোমাবর্ষণ। পশ্চিমবঙ্গে প্রচারাভিযানের ‘ওজন’ বিজেপি যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, রূপকার্থে তাকে তৃণমূলের উপরে ‘বোমাবর্ষণ’ বললে ভুল হয় না বলে অনেকে মনে করছেন। সে সব ‘বোমা’ যে আকাশ থেকেই বর্ষিত হচ্ছে, তা আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। কারণ, প্রতিদিন যত বেশি সম্ভব কর্মসূচিতে ‘তারকা প্রচারক’দের পাঠানোর তাগিদে ঢালাও হেলিকপ্টারের বন্দোবস্ত হয়েছে। আকাশপথে রাজ্য চষে ফেলছেন বিজেপি নেতারা। প্রচারপর্বের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গতি আরও বাড়াতে অমিত শাহ নিজের জন্য বরাদ্দ হেলিকপ্টারটিও অন্যদের জন্য মাঝেমধ্যে ছেড়ে দিচ্ছেন।
অমিত শাহ বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে গুন্ডারাজ শেষ হবেই। আরজি করের নির্যাতিতার মা এবং সন্দেশখালিতে অত্যাচারিত রেখা পাত্রকে আমরা টিকিট দিয়েছি। তাঁদের বিধানসভায় পাঠিয়ে গুন্ডাদের শিক্ষা দেওয়া হবে। ভাইপোর আশীর্বাদে সারা বাংলায় গরু পাচার বেড়ে গিয়েছে। গরু পাচারকারীরা সাবধান হয়ে যান। ৫ তারিখের পর কেউ গরু পাচারের চেষ্টা করলে জেলে ঢোকানো হবে। মমতাদি এবং তৃণমূলের নেতারা ২৬ হাজার যুবকের নিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকা খেয়েছে, তা সব ফেরত দিতে হবে। মমতাদি নিজের ভোটব্যাঙ্কের জন্য অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকাচ্ছেন। বিজেপি সরকারকে আসতে দিন, ৫ তারিখের পর সব অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে খুঁজে বার করে দেশের বাইরে পাঠানো হবে।৫ তারিখের পর আর আপনাদের কাটমানির নামে ভাইপো-ট্যাক্স দিতে হবে না।তৃণমলের গুন্ডারা শুনুন, ২৯ তারিখ বাড়ির বাইরে বার হবেন না। তা না হলে ৫ তারিখের পর উল্টো ঝুলিয়ে সোজা করে দেওয়া হবে। তৃণমূল ও মমতাদির খেলা শেষ হতে চলেছে। কাল ভোট হয়েছে। সেই ১৫২ আসনের মধ্যে ১১০টি জিতবে বিজেপি। গোটা পশ্চিমবাংলায় বেকারত্ব বাড়িয়েছে দিদির সরকার। ৭ হাজার কারখানা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমরা ২ বছরে সব কারখানা আবার বাংলায় ফিরিয়ে নিয়ে আসব। যুব সম্প্রদায়ের চাকরির রাস্তা খুলবে। টিএমসি সব সময় এসসি সমাজের অপমান করেছে। আর বিজেপি সম্মান করেছে। এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেছে। মতুয়া আর শূদ্র সমাজকে বলে দিয়ে যাচ্ছি, বিজেপির প্রাণ বাংলার মতুয়া সমাজ। বাংলায় কারও চারটে বিয়ে করা উচিত? ৫ তারিখের পর আমরা ইউসিসি (অভিন্ন দেওয়াবিধা বিধি) আনব। কেউ চারটে বিয়ে করতে পারবে না। কেন্দ্রীয় সরকার গরিবদের পাকাবাড়ি, পরিশ্রুত পানীয় জল, শিক্ষার জন্য টাকা পাঠিয়েছে। তা কোথায় গেল? এই সব টাকা টিএমসি-র সিন্ডিকেট আর ভাইপো-ট্যাক্সে চলে গিয়েছে। আর যদি ভাবেন এই টাকা হজম করে নেব, তা হলে সিন্ডিকেটবাজেরা কান খুলে শুনে রাখুন, প্রতি পয়সার হিসাব নেব। আপনারা বলুন তো, জামালপুরে কোনও কাজ হয়েছে? রেল ক্রসিংয়ে একটাও আন্ডারপাস হয়েছে? গুন্ডার টোল ট্যাক্স উসুল করছে। ইট, বালি, সিমেন্টের উপর টোল ট্যাক্স। এগুলো টোল ট্যাক্স নয়, ভাইপো-ট্যাক্স। ৫ তারিখে বিজেপির সরকার বানিয়ে দিন, ৬ তারিখে সব সিন্ডিকেটরাজ বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলব। দিদি মতুয়াদের ভয় দেখাচ্ছেন, যদি বিজেপি আসে তা হলে আপনাদের ভোট চলে যাবে। কিন্তু দিদি, এই মতুয়া সমাজ আমাদের প্রাণ। ওদের কেউ ছুঁতে পারবে না। মতুয়া সমাজ, নমশূদ্র সমাজের ব্যক্তিদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সিএএ করতে দিচ্ছে না দিদি। আপনারা বিজেপির সরকার বানিয়ে দিন, ৫ তারিখের পর মতুয়া সমাজের সব ভাই-বোনকে নাগরিকত্ব দেবে বিজেপি। প্রথম দফায় বিজেপি ১১০ আসন জিতবে, দিদির খেলা শেষ করে দেবে। এখানে পদ্মফুল ফুটবে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ৪ মে বর্ধমানের সীতাভোগ মোদীজিকে খাইয়ে ওঁর মুখমিষ্টি করব। প্রতি বার ভোটের সময় দিদির গুন্ডারা ঝামেলা করে। দিদির গুন্ডাদের তাই বলে যাচ্ছি, ২৯ তারিখে ঘরের বাইরে যেন না দেখতে পাই। যদি বার হয়, তা হলে ৫ তারিখের পর উল্টো করে ঝোলাব। দিদি আমার উপর রেগে যাচ্ছেন। অমিতভাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গুন্ডাদের ধমকাচ্ছেন। আরে দিদি, গুন্ডাদের কি ভালবাসব আমি! গুন্ডাদের ধমকানো উচিত কি না আপনারা বলুন তো? এখন শুধু ধমকাচ্ছি, শুধরে যাও, না হলে তোমাদের জায়গা হবে জেলের ভিতরে।’’





