Saturday, April 25, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

জতুগৃহ কলকাতায় সুজিতের দেখা নেই?‌ বাড়ছে উৎকন্ঠা! ১০ ঘণ্টা পর অকুস্থলে অরূপ!‌ ৩ দগ্ধ, ১৬ নিখোঁজ? বাড়তে পারে সংখ্যা!

আধুনিক শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক জতুগৃহ যেন! চারদিকে কালো ধোঁয়ার মোটা আস্তরণ, ঝলসানো দেওয়াল আর পোড়া গন্ধে ভারী বাতাস। সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত আনন্দপুরের কারখানায় ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও ধোঁয়াশায় ঢাকা। সরকারি সূত্র বলছে, তিন জনের মৃত্যু, তিন জন নিখোঁজ। কিন্তু ঘটনাস্থলের আতঙ্ক, পোড়া ধ্বংসস্তূপ আর স্থানীয়দের ফিসফাস, সব মিলিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে!

রবিবার রাত দেড়টা। নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম আগুন লাগে পাশের একটি ডেকরেটার্স সংস্থার গুদামে। গুদামের গা ঘেঁষেই ছিল মোমো তৈরির কারখানা। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে সেখানে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে তেল, গ্যাস, দাহ্য সামগ্রী। খবর পেয়ে দ্রুত দমকল পৌঁছয়। শুরু হয় প্রাণপণ লড়াই। কিন্তু সময় যত গড়ায়, আগুন ততই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

সোমবার বেলা ১২টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে চোখে পড়ে বিভীষিকার ছবি। চারদিক ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে। দমকলের একের পর এক ইঞ্জিন, লম্বা পাইপ টেনে জল দেওয়া। তবু আগুন পুরোপুরি বশে আসছে না। টানা ১২ ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা কারখানা দু’টি যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে ভিতরে লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থের। মৃত্যু ৩ জনের, নিখোঁজ অনেক! কেন ১২ ঘণ্টার লড়াইয়েও বশ মানছে না আনন্দপুরের আগুন? এক আগুন নেভেনি, ফের আর এক আতঙ্ক! আনন্দপুরের পর মল্লিকবাজারে চারতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ড। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো অভিযোগ উঠে এসেছে কর্মীদের মুখেই। দুর্ঘটনায় মৃত নিরঞ্জন মণ্ডলের ভাই গোবিন্দর কণ্ঠে ক্ষোভ আর কান্না একসঙ্গে। তাঁর অভিযোগ, “নিয়ম বলে কিছুই ছিল না। অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা তো দূরের কথা। আমার ভাই আর অন্যরা ভিতরে কাজ করছিল। কিন্তু কারখানার গেট ভেতর ও বাইরে দু’দিক থেকেই তালা মারা ছিল। তাই কেউই বেরোতে পারেনি।”

কেন এভাবে কর্মীদের আটকে রেখে তালা মারা হয়েছিল, তার কোনও সদুত্তর মেলেনি কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। কর্মীদের দাবি, এখানেই তৈরি হত মোমো। ফলে মজুত ছিল বিপুল পরিমাণ পাম তেল ও গ্যাস সিলিন্ডার। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলি বারুদের মতো ফেটে পড়ে। আরও অভিযোগ, পাশের ডেকরেটার্স গুদামে দাহ্য সামগ্রী রাখা হত। বারবার সরাতে বলা হলেও শোনেননি মালিক। সেই অবহেলাই মুহূর্তে আগুনকে সর্বগ্রাসী করে তোলে। দমকল সূত্র জানাচ্ছে, সরু গলির মধ্যে গুদাম থাকায় ইঞ্জিন ঢোকানো ছিল দুঃসাধ্য। তেল ও গ্যাসের কারণে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুপুর ২টো নাগাদ গ্যাসকাটার নিয়ে ভিতরে ঢোকেন দমকলকর্মীরা। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ভিতরে আর কেউ আটকে আছেন কি না?

বিধ্বস্ত আনন্দপুর, দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেলেন রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ১০ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আনন্দপুরের ওই কারখানা। অগ্নিকাণ্ডের জেরে মৃত্যু তিন কর্মীর। নিখোঁজ ১৬ জন। এবার সেই আনন্দপুরেই পৌঁছলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা টালিগঞ্জের বিধায়ক অরূপ বিশ্বাস। দুপুর ১টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেলেন রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ১০ ঘণ্টার অধিক সময় ধরে জ্বলছে আনন্দপুরের ওই কারখানা। দেখা গেল না দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুকে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কটাক্ষ,‘সরকার ছুটিতে গিয়েছে’। ঘটনাস্থলে পৌঁছেই ওই জ্বলন্ত কারখানার পরিদর্শন করেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তারপর সেখানে উপস্থিত ‘নিখোঁজ কর্মীদের’ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলতে দেখা যায় তাঁকে। উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদের থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য নিতে দেখা যায় মন্ত্রীকে। এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘ধোঁয়াটা বের করতে হবে। এত তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি, দু’টো গোডাউন। সেখানে এমন ভয়াবহ আগুন। আমি বলতে পারি, অনেকটা তাড়াতাড়ি আগুন নিয়ন্ত্রনে আনা হয়েছে। কিন্তু ধোঁয়াটা বের করা কঠিন।’ কলকাতার বুকে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন ওই কারখানার অগ্নিনির্বাপক ব্য়বস্থা নিয়েও। সংশ্লিষ্ট কারখানা থেকে ড্রাম-ড্রাম পাম তেল উদ্ধার হয়েছে। দমকলবাহিনী মনে করছে, ওই পাম তেলের জেরেই কারখানা জুড়ে দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে লেলিহান শিখা। কিন্তু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্য়বস্থা থাকলে তা কি হত? এই প্রশ্ন করা হয়েছিল বিদ্যুৎ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকেও। কিন্তু তিনি চটে গিয়ে উত্তর দেন, ‘এই প্রশ্ন কীভাবে করছেন? আমি কীভাবে এর উত্তর দেব? পুলিশ-প্রশাসন-দমকল ঢুকবে, তারপর তো উত্তর পাওয়া যাবে। এখনই বলে দিতে হবে কী ছিল, কী ছিল না? তা হলে তো আমাকেই তদন্তে নেমে পড়তে হবে।’রবিবার গভীর রাতে আগুন লাগে আনন্দপুরের এই কারখানায়। সেই থেকে টানা ১০ ঘণ্টার উপর জ্বলছে কারখানাটি। ঘটনাস্থলে কাজ করছে ১২টি দমকলের ইঞ্জিন। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বেশ কয়েকটি জায়গায় বিচ্ছিন্ন ভাবে আগুন রয়েছে। কিন্তু বরাবর এই ধরনের ঘটনায় উদ্য়ত্ত হয়ে অকুস্থলে পৌঁছে যাওয়া দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুকে এবার দেখা যায়নি। দমকলমন্ত্রীর বলেছিলেন, ‘দমকল কাজ করছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।’ বেলা গড়ালেও দেখা যায়নি তাঁকে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘সরকার থাকলে তো আগুন নেভাবে। সরকার নেই, প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটি কাটাচ্ছে। সরকার না থাকলে যা হয়, তাই হচ্ছে।’

প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কারখানায় গতরাতে তিন জন মোমো সংস্থার কর্মী নাইট শিফ্টে ছিলেন। আগুন লাগার ফলে তাঁরা ওই গোডাউনেই আটকে পড়েন। যদিও এক কর্মীর পরিবারের অভিযোগ, ‘শেষবার ফোনে আমার জামাইবাবু (কারখানায় আটক কর্মী) জানান, কারখানার গেট বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ প্রথম দিকে নিখোঁজের সংখ্য়া তিন জন মনে করা হলেও বেলা গড়াতেই জানা যায়, লেলিহান শিখার মতোই নিখোঁজের সংখ্যা ঘিরেও তৈরি হয়েছে ডামাডোল। পরবর্তীতে জানা যায়, শুধুই মোমো নয়, সংশ্লিষ্ট গোডাউনে একটি ডেকরেটর্স সংস্থার কর্মীরাও কাজ করতেন। সেই কারখানাতেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। কার্যত জতুগৃহতে পরিণত শহর কলকাতা। কারখানার সামনের অংশের আগুন কিছুটা নেভানো গেলেও, ভিতরের দিকে তা সম্ভব হয়নি। ১২টি ইঞ্জিন খাড়া করিয়েও উৎসস্থল অবধি পৌঁছতে পারেননি দমকলকর্মীরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গতরাতে মোমো সংস্থার কর্মী হিসাবে কারখানায় নাইট শিফ্টে থাকা কর্মীদের মধ্যে একজন হলে পঙ্কজ হালদার। এদিন পঙ্কজের দাদা সেই জ্বলন্ত কারখানার সামনেই অপেক্ষারত রয়েছেন। চোখে-মুখে ভয়। ভাইকে কোন পরিস্থিতিতে উদ্ধার করবেন, তা ঠাওর করতে পারছেন না তিনি। এদিন তিনি বলেন, ‘ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দমকল বা পুলিশও কিছু জানায়নি।’

আনন্দপুরে শুধু মোমো কারখানা নয়, তার পাশে ডেকরেটর সংস্থার গোডাউনও আগুনে পুড়ে গিয়েছে। সেখানেই কাজ করতেন গুরুপদ সাউ। ডেকরেশনের কাজ করতেন। বিগত আটদিন ধরে কাজ করছিলেন। তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ভাইপো বলেন,”কাকিমার সঙ্গে রাতে কথা হয়েছে। সেই সময় গোডাউনে ছিল বলছে। সকালে ফোন করে পাচ্ছি না। এখন কারখানায় আগুন লেগেছে। ফোন অফ বলছে। ওঁর সঙ্গে আমাদের ওইখানে কেউ ছিল না। তাঁদেরও খোঁজ নেই।” জানা যাচ্ছে, ওই ডেকরের্টসের গুদামে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে যতজন ছিলেন তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা। রাত তিনটেয় শেষ ফোন, বলল, ‘আমি আর বাঁচব না…’, তারপরই ফোন অফ! রুবির আরবানার পিছনে একটি ব্রান্ডেড মোমো ও কেক প্রস্তুতকারক সংস্থার ওয়ারহাউসে আগুন লাগে। বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে খাক কারখানা। দমকলের ১২টি ইঞ্জিন আগুন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। ওই কারখানায় নাইট ডিউটি করছিলেন তিনজন কর্মী। তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে একজন পঙ্কজ হালদার। পরিবারের এক সদস্য জানান, রাত তিনটে নাগাদ ফোন আসে। আগুন লাগার পর স্ত্রীকে ফোন করে বলেন, “আমি বাঁচতে চাই। আগুন লেগেছে, আর হয়তো বাঁচব না”। কিছু সময় পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ আসে। এখন চরম উদ্বেগে কারখানার বাইরে দাড়িয়ে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। পরে জানা যায়, তিনজনের মৃত্যু হয়েছে অগ্নিকাণ্ডে।

ভোর রাত থেকে জ্বলছে আনন্দপুরের মোমো কারখানা। সোমবার বেলা ২ টো পর্যন্তও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দমকল আধিকারিকরাই বলছেন, ভিতরে আরও তিন জায়গায় পকেট ফায়ার দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা। আগুনে ঝলসে ইতিমধ্যেই ৩ জনের মৃ্ত্যুর খবর সামনে এসেছে। নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমেই। এখনও পর্যন্ত ১৬ জন নিখোঁজের নাম নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অন্ততপক্ষে ভিতরে ৩০ জন আটকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কাল ধোঁয়ায় ঢেকেছে এলাকা, নাক ঝাঝিয়ে দেওয়া পোড়া গন্ধ, কঙ্কালসার কারখানার বাইরে স্বজনহারাদের কান্না, এক রাশ উৎকন্ঠা নিয়ে নিখোঁজদের পরিজনদের ভিড়। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আশ্বাস দিয়েছেন যথাযথ তদন্তের। কিন্তু ধোঁয়ার আড়ালে ঘুরপাক খাচ্ছে কয়েকটি প্রশ্ন, বিপদ জেনেও কেন দাহ্য পদার্থের স্তূপ? কেন তালাবদ্ধ গেট? আধুনিক শহরের বুকে এই জতুগৃহের দায় শেষ পর্যন্ত কার? আনন্দপুরে ফিরল বাগরি-নন্দরাম মার্কেটের ছবি!

২০০৮ সালের পর শেষ কয়েক বছরের কলকাতা বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী!

১২ জানুয়ারি, ২০০৮ সাল। বড়বাজারের নন্দরাম মার্কেটে বিধ্বংসী আগুন। ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় বাড়ির সাতটি , পুড়ে ছাই হয়ে যায় হাজারেও বেশি দোকান।
১৬ আগস্ট, ২০০৮, সোদপুর রেডিমেড গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড। প্রায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন শ্রমিক, বেশ কয়েকজন দোকানের ক্রেতাও ছিলেন।
২৩ মার্চ, ২০১০, স্টিফেন কোর্টে ভয়াবহ আগুন লাগে। বেরোতে না পেরে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের।
৯ ডিসেম্বর, ২০১১, দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ায় আমরি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড। ৯০ জনেরও বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, সূর্য সেন স্ট্রিট (নন্দরাম মার্কেট) আগুন। ১৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মার্কেটের গুদামে শর্ট সার্কিটের জেরে আগুন লাগে বলে দমকল জানায়।
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, বাগরি মার্কেটে চার দিন ধরে চলে ভয়াবহ আগুন, প্রায় ১০০০টি দোকান পুড়ে ছাই।
২৯ এপ্রিল, ২০২৫, বড়বাজার (মেছুয়া বাজার)-এ একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুন লেগে কমপক্ষে ১৪ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে শিশুও ছিল। প্রায় ৫০ জন অতিথি ভবনে ছিলেন, বহু লোক ধোঁয়ায় আটকা পড়ে, সেখানে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles