নিউজিল্যান্ড বোলারদের নাভিশ্বাস তুলে চেষ্টা করলেন বিরাট কোহলি এবং হর্ষিত রানা। ইনদওরে তৃতীয় ম্যাচেও নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে হেরে গেল ভারত। এক দিনের সিরিজ় হাতছাড়া হল শুভমন গিলের দলের। আগে ব্যাট করে নিউ জ়িল্যান্ডের তোলা ৩৩৭/৮ রানের জবাবে ভারত ২৯৬ রানেই অলআউট হয়ে গেল। হারল ১-২ ব্যবধানে। ২০২৪-এ টেস্ট সিরিজ়ে চুনকাম হওয়ার পর এ বার এক দিনের সিরিজ়েও ভারতের মাটিতে তাদের হারিয়ে দিল নিউ জ়িল্যান্ড। ভারতে এটি তাদের প্রথম এক দিনের সিরিজ জয়। ১৯৮৭-তে পাকিস্তান এসে ভারতকে পর পর টেস্ট এবং এক দিনের সিরিজ়ে হারিয়েছিল। নিউ জ়িল্যান্ডও সেই কাজ করে দেখাল। পর পর দু’টি সিরিজ় হয়নি ঠিকই। কিন্তু আনকোরা এই কিউয়ি দলের কাছে ভারতের হার বড় প্রশ্ন তুলে দিল কোচ গৌতম গম্ভীর এবং শুভমন গিলের জুটি নিয়ে। সামনেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তাই এই সিরিজ়ের গুরুত্ব তেমন ভাবে থাকা উচিত নয়। কিন্তু কোচ গম্ভীরের অধীনে কোনও সিরিজ়ই আতশকাচের বাইরে থাকে না। বিরাট কোহলি যথারীতি এই সিরিজ়েও বুঝিয়ে দিলেন, তাঁকে কোনও ভাবেই ২০২৭ বিশ্বকাপে হিসাবের বাইরে রাখা যাবে না। তবে কিছু ক্রিকেটারকে নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে। এক দিনের বিশ্বকাপের আগে সেই ভুলত্রুটি শুধরাতে হবে ভারতকে। ১০টি চার এবং ৩টি ছয়ের সাহায্যে ১০৮ বলে কোহলি ১২৪ রানের ইনিংস খেলেছেন। দলকে জেতাতে চেষ্টার কসুর করেননি। মিডল অর্ডারে শ্রেয়স আয়ার, কেএল রাহুল, রবীন্দ্র জাডেজার মতো ক্রিকেটার রয়েছেন, তাদের জিততে হর্ষিত রানার উপর ভরসা করতে হবে কেন? কোহলি দিনের পর দিন একার কাঁধে দলের দায়িত্ব সামলালেও, শ্রেয়সেরা যদি একটু সেই বোঝা হালকা করে নিতেন, তা হলে সুবিধা হত ভারতেরই। যে তিন জনের কথা বলা হল তাঁদের মধ্যে সাদৃশ্য একটাই, প্রত্যেকেই আউট হয়েছেন খারাপ শট খেলে। যে পরিস্থিতিতে তাঁরা শটগুলি খেলেছেন, তখন একটু ধরে খেলে ক্রিজ়ে থিতু হয়ে নেওয়াই যেত। রাহুল তবু গত ম্যাচে শতরান করেছেন। এ দিন তিনি ভাবেননি বল ও ভাবে লাফিয়ে আসবে। কিন্তু শ্রেয়স, জাডেজার দায়িত্বজ্ঞানহীন শট ক্ষমার অযোগ্য। টেস্টে ঘূর্ণি উইকেট বানিয়ে নিজেরাই বিপদে পড়ছে ভারতীয় দল। এক দিনের ক্রিকেটেও কি ধীরে ধীরে স্পিনারদের দাপট কমছে? চলতি সিরিজ়ের প্রথম দু’টি ম্যাচে ভারতের স্পিনারেরা ছাপ ফেলতে পারেননি। তৃতীয় ম্যাচেও ব্যতিক্রম হল না। কুলদীপ যাদব এবং জাডেজা, দুই স্পিনার মিলে ১২ ওভারে দিলেন ৮৯ রান। মাত্র একটি উইকেট। সে জায়গায় নিউ জ়িল্যান্ডের স্পিনারেরা ১৯ ওভার বল করে ১০৪ রান দিয়েছেন। জেডন লেনক্স ওভারপ্রতি পাঁচের কম রান দিয়েছেন। কুলদীপ ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসাবে খ্যাত। তাঁর বল এতটাই অনায়াসে খেললেন কিউয়ি ব্যাটারেরা যে, মনেই হল না আদৌ কোনও বৈচিত্র আছে বলে। টেনে টেনে ছয় মেরেছেন মিচেল, ফিলিপসেরা। ন্যূনতম প্রভাব ফেলতে পারেননি কুলদীপ। চলতি সিরিজ়ে ১৮২ রান দিয়ে মাত্র তিনটি উইকেট পেয়েছেন। কুলদীপের মতো স্পিনারের থেকে যা প্রত্যাশিত নয়। প্রশ্ন উঠেছে, অক্ষর পটেলকে কেন দলে নেওয়া হল না? ২০২৩ বিশ্বকাপ, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনি ওপেন করতে নেমে আগ্রাসী খেলা শুরু করেছিলেন। তাতে সাফল্য হয়তো সব ম্যাচে আসছিল না। তবে শুরুতে একটা ভিত তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। শুভমন গিলের কাছে অধিনায়কত্ব হারানোর পর রোহিতের খেলায় বদল এসেছে। তিনি আগের মতো তাড়াহুড়ো না করে একটু ধীরে খেলার চেষ্টা করছেন। শেষ ছ’টি ম্যাচের মধ্যে দু’টি ম্যাচে অর্ধশতরান করেছেন ঠিকই। কিন্তু সব ম্যাচেই রোহিতের স্ট্রাইক রেট একশোর আশেপাশে।টি-টোয়েন্টি থেকে আগেই অবসর নিয়েছেন। এ বার কি এক দিনের ক্রিকেটেও তাঁর বিদায় আসন্ন? রবিবারের ম্যাচের পর তাঁর ৫০ ওভারের কেরিয়ার নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে না বল, না ব্যাট, কিছুই করতে পারেননি তিনি। তার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ়েও বল হাতে নিষ্প্রভ ছিলেন। শেষ ছয় ম্যাচে শুধুমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তৃতীয় খেলায় একটি উইকেট নিয়েছিলেন। এক দিনের ক্রিকেটে মাঝের দিকের ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের জন্য সুখ্যাতি ছিল জাডেজার। এই দু’টি সিরিজ় দেখিয়ে দিল, তাঁকে খেলার রহস্য ভেদ করে ফেলেছেন বিপক্ষ ব্যাটারেরা। হর্ষিতকে দেখে বাকিদের শেখা উচিত। বল হাতে তিন উইকেট নিলেও হর্ষিত প্রচুর রান দিয়েছেন। তার শোধ তুললেন ব্যাট হাতে। যদিও দলের জেতা হল না। ড্যারিল মিচেলের কাছে। সিরিজ়ে তিনটি ম্যাচ তিনি খেলেছেন। প্রথম ম্যাচে অল্পের জন্য শতরান হাতছাড়া করলেও দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ম্যাচে সেই ভুল করেননি। মিচেল ক্রিজ়ে নামলে এক বারের জন্যও তাঁকে দেখে মনে হয় না আউট হবেন। ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে দু’টি ম্যাচের দু’টিতেই শতরান করেছিলেন তিনি। তখনই বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নিজের ক্ষমতা। যত দিন গিয়েছে, তত নিউ জ়িল্যান্ড ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন তিনি। দলে তিনি ‘ক্রাইসিস ম্যান’।





