বুথের বাইরে সংকীর্ণ গলি চিহ্নিত করা হয়েছে উত্তর এবং দক্ষিণ কলকাতায়। সেই সব গলিতে যাতে কোনও হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটে, তার জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে কমিশন। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন। কলকাতাতে ভোট ঘিরে অশান্তি এড়াতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এবার একগুচ্ছ নির্দেশিকা দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রথম দফার তুলনায় আরও বেশি করে সক্রিয় হতে বলা হয়েছে। যে বুথগুলি স্পর্শকাতর, সেই জায়গাগুলির উপর বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিগত নির্বাচনগুলির পরে যেসব এলাকায় হিংসা হয়েছে, সেখানে বাড়তি বাহিনী রাখা হবে। কলকাতার ক্ষেত্রে বস্তিগুলিতে সব থেকে বেশি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভোট দিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী উপদ্রুত অঞ্চলগুলিতে বারবার টহল দেবে। সিসিটিভির মাধ্যমে গোটা এলাকায় নজর রাখবে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণে অসংখ্য অলি-গলি রয়েছে। বুথের বাইরে সংকীর্ণ গলিগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার ক্ষেত্রে ৪৫৮টি গলি চিহ্নিত করে সেখানে নতুন করে সিসিটিভি বসানো হবে। উত্তর কলকাতার ক্ষেত্রে ২৭০টি গলি চিহ্নিত করে নতুন করে সিসিটিভি বসানো হবে। এছাড়াও বেশ কিছু সরু গলি রয়েছে, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে টানা টহলদারি চালানো হবে পুলিশের তরফে।
কলকাতায় যে বহুতলগুলিতে বুথ তৈরি করা হচ্ছে এবার, সেখানে ফ্ল্যাটগুলির বাসিন্দাদের আগে থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ভোটের দিন বা ভোটের আগের দিন যে পরিচারিকা কাজে আসবেন, তাঁদের পরিচয় জানিয়ে রাখতে হবে। তালিকা তৈরি করে দিতে হবে। কমিশন জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাই মূল লক্ষ্য। প্রথম দফায় যে ধরনের ত্রুটি দেখা গিয়েছে, সেগুলি সংশোধন করে দ্বিতীয় দফায় আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ এবং কলকাতা উত্তরের ডিইও স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, ভয়মুক্ত এবং অবাধ নির্বাচন করা মূল লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের। ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। দ্বিতীয় দফায় মোট ২৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করছে নির্বাচন কমিশন। মোট রাজ্য পুলিশ ব্যবহার করা হবে ৩৮ হাজার ২৯৭।
নজর ডায়মন্ড হারবারে। রাজ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের প্রাক্কালে ডায়মন্ড হারবারকে কেন্দ্র করে নতুন রণকৌশল নিল নির্বাচন কমিশন। অতীতে একাধিক অভিযোগ ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সাক্ষী থাকা এই কেন্দ্রটিকে এখন ‘মডেল’ হিসাবে ব্যবহার করে গোটা রাজ্যের অশান্ত এলাকাগুলোতে বার্তা দিতে চাইছে কমিশন। এই নতুন কৌশলের নামই দেওয়া হয়েছে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’। কমিশনের এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য হল, পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখা এবং দুষ্কৃতীদের ভোটদান প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা। কমিশনের বক্তব্য, কোনও পুলিশ আধিকারিক যদি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেন বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সুবিধা করে দেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু সাসপেনশন নয়, নেওয়া হবে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এই হুঁশিয়ারি বার্তা রাজ্যের অন্যান্য জেলার পুলিশ আধিকারিকদের জন্যও বড় ‘টনিক’ হিসাবে কাজ করবে। সম্প্রতি ডায়মন্ড হারবারের পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ৫ জন উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিককে (যাদের মধ্যে অতিরিক্ত সুপার ও এসডিপিও-র মতো পদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন) সাসপেন্ড করে কমিশন ইতিমধ্যেই সেই কড়া অবস্থানের নিদর্শন দিয়েছে। অভিযোগ ছিল, তারা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছিলেন এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের নজরদারির ভিডিও তৈরি করছিলেন। শুধু পুলিশ নয়, কমিশনের পাখির চোখ এখন এলাকার ‘দাবাং’ বা প্রভাবশালীদের ওপর। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের জন্য কমিশন রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রায় ১০০০ জন দুষ্কৃতীর তালিকা প্রস্তুত করেছে। অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা ভোটের দিন সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে বাধা দেয়। কমিশন জানিয়েছে, এবার এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের ভোটের দিন ত্রিসীমানায় দেখা যাবে না। তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশনের এই অভূতপূর্ব পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়েছে। ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে কমিশনের এই ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।





