Saturday, July 4, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

খেলা হবে!‌ মেসির ‘দখল’ কে নেবেন, সুজিত না অরূপ? তারকাদের গায়ে সেঁটে থাকার অভ্যাসই কাল হল ক্রীড়ামন্ত্রীর! অতি অর্থলোভে বলির পাঁঠা শতদ্রু?‌

কলকাতা বিমানবন্দরে পা রাখার পরেই মেসিকে নিজের ‘দখলে’ নিয়ে ফেলেছিলেন সুজিত। হায়াতে পৌঁছোনো থেকে শনিবার সকাল ১১টা ২৫ পর্যন্ত মেসি কার্যত ছিলেন সুজিতের ‘হেফাজতে’।হোটেল তোমার তো মাঠ আমার। হায়াত রিজেন্সি তোমার তো যুবভারতী আমার। দুই মন্ত্রী সুজিত বসু এবং অরূপ বিশ্বাসের ‘মেসি দখলের’ লড়াইয়েই শনিবারের যুবভারতী বিপর্যয় ঘটেছে। যে বিপর্যয় বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে সরকার, পুলিশ-প্রশাসন এবং সামগ্রিক ভাবে শাসক তৃণমূলের সংগঠনকেও। বিপর্যয়ের মাত্রা এমনই যে, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়েছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সুজিত ‘ক্রীড়ামনস্ক’। অরূপ ‘ক্রীড়ামন্ত্রী’। কলকাতায় কোনও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রীড়াবিদ আসবেন আর সুজিত তাঁকে কড়া ‘ম্যানমার্কিং’ করবেন না, তা হয় না। অধুনা দমকলমন্ত্রী সুজিত একদা ছিলেন সুভাষ চক্রবর্তীর ক্রীড়াশিষ্য। সুভাষ ক্রীড়ামন্ত্রী থাকাকালীনই ক্রীড়ার বিষয়ে সুজিতের বুৎপত্তি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। অরূপও কম যান কিসে! তিনি রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী। খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে মেদ ঝরানোয় মন দিয়েছেন। যাতে দৌড়ঝাঁপের সময় হাঁপ না ধরে। ডুরান্ড কাপ শুরু করিয়েছেন কলকাতায়। তাঁর আমলেই অনূর্ধ্ব ১৭ পুরুষ বিশ্বকাপের আয়োজন হয়েছিল যুবভারতীতে। তা প্রশংসিতও হয়েছিল। ফলে কলকাতায় আগত যে কোনও ক্রীড়াব্যক্তিত্বের উপর তাঁর তো একটা ‘প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার’ থাকবেই। খেলার পাশাপাশিই আরও একটি বিষয়ে সুজিত-অরূপ লড়াই আছে— পুজো। সুজিতের শ্রীভূমি বনাম অরূপের সুরুচি। কার পুজো কত লোক টানল, কার পুজোর কোন তারকা গেলেন, তা নিয়ে একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা দু’জনের মধ্যে আছে। সে যতই দু’জনের পুজো শহরের মানচিত্রের দুই প্রান্তে হোক না কেন। হোটেল হায়াত রিজেন্সিতে পৌঁছোনো থেকে শনিবার সকাল ১১টা ২৫ পর্যন্ত মেসি ছিলেন সুজিতের ‘হেফাজতে’। যেখানে ঘেঁষতে পারেননি (মতান্তরে, ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি) অরূপ। হায়াতে সুজিত সপরিবারে ছিলেন। তাঁর পরিবার ছিল। ছিলেন তাঁর পছন্দের বাছাই লোকজনও। নিজের ক্লাব শ্রীভূমির সামনে মেসির ৭০ ফুটের মূর্তি উন্মোচন করানো থেকে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্তিনীয় তারকার সঙ্গে আলাপচারিতা— সবেতেই সুজিত সামনে। সক্রিয়। রসিকতা করে অনেকে বলছেন, সুজিত নাকি মোবাইলে স্প্যানিশ ভাষা অনুবাদ করে মেসির একটা ছোট সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন! প্রথম ল্যাপে অতএব, দৌড়ে খানিকটা পিছিয়ে ছিলেন অরূপ। কিন্তু তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। হোটেলে জায়গা না পেলে কী আছে? মাঠ তো আছে! গ্যালারিতে হাজার হাজার দর্শক আছে। জনতার সামনে মেসির দখল নিতে পারলে হোটেলের নিভৃতিতে সুজিত কী করলেন, তা নিয়ে আর কে মাথা ঘামাবে! সুতরাং মেসি মাঠে ঢুকতেই অরূপ দলবল-সহ ঘিরে ফেলেন তাঁকে। যে বলয়ে ছিলেন উদ্যোক্তাদের অনেকে এবং কলকাতা ময়দানের সঙ্গে যুক্ত কর্তা, ফুটবলার, প্রাক্তন ফুটবলার এবং টলিউডের পরিচিত মুখেরা। যাঁদের উপর অরূপের ‘নিয়ন্ত্রণ’ সর্বজনবিদিত। হোটেলে সুজিতের ময়দানে কোনও গণজমায়েত ছিল না। সেখানে ছিলেন বাছাই ফলে মেসিকে নিয়ে আকুলতাও প্রকাশ্যে আসেনি। বিপর্যয়ও ঘটেনি। যা ঘটেছে খোলা মাঠে। গ্যালারির চোখের সামনে। ফলে সুজিতের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে অরূপকে নিয়ে। অরূপের সঙ্গেই মাঠে ঢুকেছিলেন তৃণমূলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িতেরাও। যাঁরা দল এবং প্রশাসনের অন্দরে বিভিন্ন কারণে ‘বিশেষ গুরুত্ব’ পেয়ে থাকেন।

ফুটবলে ৪৫ মিনিট করে দু’টি অর্ধে খেলা হয়। মেসিকে ঘিরে যুবভারতীতেও শনিবার দু’টি অর্ধ হল। তবে প্রথমটি ২২ মিনিটের, পরেরটি ৬৩ মিনিটের। ২২ মিনিট জুড়ে ছিল ‘উৎসব’। আর ৬৩ মিনিটের পুরোটাই ‘তাণ্ডব’। মেসি মাঠে ঢোকেন সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ। তাঁর ‘মহানিষ্ক্রমণ’ ১১টা ৫০ নাগাদ। যে ২০ মিনিট তাঁকে ঘিরে ছিলেন অরূপের মতো শ’খানেক লোক। যাঁকে দেখতে জনতা হাজার হাজার টাকা খরচ করে মাঠে এল, তিনিই ঢাকা পড়ে গেলেন! মেসির গাড়ি মাঠ ছেড়ে বাইপাস ছোঁয়ার আগেই শুরু তাণ্ডব। ক্রোধের আস্ফালন। বেলা ১টা নাগাদ সেই তাণ্ডব খানিক স্তিমিত হয়। গোটা যুবভারতী সাক্ষী যে, প্রথম ২২ মিনিট মেসিকে নিয়ে পাড়ার স্তরের অব্যবস্থা যদি না হত, পরের ৬৩ মিনিট ঘটতই না। সাধারণত ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে গন্ডগোল শুরু হলেই পুলিশ এবং র‌্যাফ গ্যালারিতে উঠে লাঠিচার্জ শুরু করে। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর যুবভারতীতে বিরাট গন্ডগোল সে ভাবেই ঠেকিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু শনিবার ফেন্সিং ভেঙে চার দিক থেকে ক্রুদ্ধ জনতা ঢুকে পড়তে থাকে মাঠে। পুলিশ প্রথমে আটকানোর চেষ্টা করলেও পারেনি। লাঠি নিয়ে তেড়ে গেলেও পিছু হটতে হয় বাহিনীকে। একাধিক বার পুলিশকে ঘিরে ফেলে জনতা। মারধরও দেয়। পিছু হটতে হয়েছে পুলিশের বড়কর্তাদেরও। দীর্ঘদিন পরে হাতে লাঠি তুলতে হল আইজি (আইন-শৃঙ্খলা) জাভেদ শামিমকে। গোটা মাঠ জুড়ে যখন জনতা নানা ভাবে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তখন আবার এক দল পুলিশ শীতের মিঠে রোদ পিঠে মেখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। তবে সাংবাদিকদের একটি উপকার পুলিশকর্মীরা করেছেন। প্রেস বক্সে এসে তাঁরা সাবধান করে দিয়ে গিয়েছেন, ‘‘গলায় ঝোলানো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটা খুলে পকেটে নিয়ে মাঠ থেকে বেরোন। ওটা দেখলেই লোকে শতদ্রু দত্তের লোক বলে পেটাবে!’’যুবভারতীতে এখন কোনও ধরনের ব্যাগ বা জলের বোতল নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ। জলের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকে ওয়াটার পাউচে। যে পরিমাণ বোতল মাঠে উড়ে এসে পড়ল, তা কোথা থেকে এল? উত্তর, গ্যালারির ভিতর থেকে। গ্যালারিতে জলের বোতল বিক্রি করা হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক চড়া দামে। ভিতরে বোতল বিক্রির অনুমতি কেন দেওয়া হল? কেনই বা তা চড়া দামে বিক্রি করা হল? এই ধরনের বড় ‘ইভেন্ট’ যে সংস্থাই করুক, তারা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রাখে। শনিবারের যুবভারতী কেলেঙ্কারি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, আদৌ সরকারের সঙ্গে শতদ্রু দত্তদের কোনও সমন্বয় ছিল কি? বিশেষত, যে মঞ্চে রাজ‍্যের মুখ্যমন্ত্রীর থাকার কথা? থাকলে কী করে এই বিপর্যয় ঘটল? না থাকলে প্রশাসন যুবভারতীতে এই সফর করার অনুমতি দিল কেন? যুবভারতীর ফেন্সিং টপকানো নিয়মিত মাঠে যাওয়া সমর্থকদের কাছে কষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু সেই ঝুঁকি না নিয়ে ফেন্সিংয়ের লোহার ছিটকিনি ভাঙা হয়েছে আধলা ইট দিয়ে। প্রথমে দু’নম্বর গ্যালারিতে। তার পর ক্রমে ভিআইপি, চার নম্বর এবং পাঁচ নম্বর গ্যালারিরও গেটের ছিটকিনি ভাঙা হয়েছে। চতুর্দিক দিয়ে মানুষের স্রোত ঢুকে পড়েছে মাঠে। তার পরে গোটা মাঠ তাদেরই দখলে চলে গিয়েছিল। তার যথেচ্ছ ভাঙচুর করেছে। উপড়ে নিয়েছে মাঠের ঘাস, গ্যালারির চেয়ার। তুলে নিয়েছে ফুলগাছ-সহ টবও। যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠানের অন্যতম অংশ ছিল মোহনবাগনের তারকা একাদশ বনাম ডায়মন্ড হারবার একাদশের প্রদর্শনী ম্যাচ। সেই ম্যাচে দু’দলে খেলেছেন ১৪ জন করে। মাঠে রেফারি-সহ ছিলেন ২৯ জন! রেফারি-সহ প্রত্যেকের জার্সির পিছনে লেখা ‘মেসি’। ফুটবলারদের জার্সির সামনেও মেসির মুখের ছবি। যা অনাবিল হাস্যরস যুগিয়েছে। সেই ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার দু’মিনিটের মধ্যেই অবশ্য মাঠে ঢুকে পড়ে মেসির গাড়ি। লম্বা বাঁশি বাজিয়ে রেফারি জানিয়ে দেন, খেলা শেষ। আসলে তখন ‘খেলা’ শেষ নয়, তখন যুবভারতীতে খেলা শুরু!

নীল-সাদা জার্সিধারী মেসিভক্তদের চার্জশিটে যদি প্রথম অপরাধী হন প্রধান উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত, তা হলে দ্বিতীয় নামটি অবশ্যই রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। যিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আস্থাভাজন’ হিসাবেই পরিচিত। যুবভারতীতে মেসি ছিলেন মেরেকেটে ১৬ থেকে ১৮ মিনিট। সেই সময়ের মধ্যেই অরূপ জনতার কাঠগড়ায়। দিন যত গড়িয়েছে, ততই মোবাইলে মোবাইলে ঘুরতে শুরু করেছে মেসির গায়ে লেপ্টে-থাকা অরূপের ছবি। যুবভারতীয় গ্যালারি ছাড়িয়ে দলের অন্দরেও সমালোচিত হতে শুরু করেছেন ক্রীড়ামন্ত্রী। বেলা যত গড়াতে থাকে, ততই যুবভারতী কেলেঙ্কারির ভয়াবহতা আরও প্রকাশ্যে আসতে থাকে। দেশজ তো বটেই, বিদেশি সংবাদমাধ্যমও কলকাতা শহরকে কাঠগড়ায় তুলে তুলোধনা করতে শুরু করে। তখন থেকেই প্রশাসনের অন্দরে জল্পনা তৈরি হয়, অরূপকে কি তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে? অনেকে বলেন, অরূপ কি পদত্যাগ করবেন? রাজ্যের ক্রীড়া এবং টলিউডের বিনোদন জগৎ ‘নিয়ন্ত্রণ’ করেন অরূপ। তারকাদের সঙ্গে তাঁর ছবি রাজ্যের মানুষের কাছে জলভাত। আগে মুখ ‘দেখাতে’ হত। এখন প্রতাপশালী মন্ত্রী হওয়ায় সেটিও করতে হয় না। তবে অরূপ ‘ছবিবিলাসী’ তো বটেই। এবং তা এখন নয়। বহুকাল ধরেই। কংগ্রেসি সংস্কৃতিতে ছবিতে মুখ দেখানোর একটা নিয়মিত অভ্যাস ছিল। তৃণমূলেও যে নেই, তা নয়। কিন্তু অরূপ সে বিষয়ে ‘চ্যাম্পিয়ন’। কলকাতা শহরে কোনও জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরের ক্রীড়াবিদ আসবেন আর অরূপকে তাঁর গায়ে সেঁটে থাকতে দেখা যাবে না, এমন ঘটনা বিরলের মধ্যে বিরলতম। অনেকে বলছেন, সেই অভ্যাসই কাল হল শনিবার। সকাল সওয়া ১০টা নাগাদ অরূপকে যখন প্রথমবার মাঠে দেখা গেল, তখন তিনি গ্যালারির আশপাশ, মেসির মাঠে প্রবেশের পথ ইত্যাদি জরিপ করছিলেন। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, তার সঙ্গে হাতকাটা কালো জ্যাকেট। তাঁকে ঘিরে পুলিশ এবং উদ্যোক্তাদের মেজো-সেজো কর্তরা। আঙুলের ইশারায় তাঁদের নানাবিধ বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী। মেসি আসছেন। সকাল থেকেই যুবভারতীর গ্যালারিতে ভিড়। একই মঞ্চে থাকবেন মেসি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা, শাহরুখ খান এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। যাকে বলে ‘মেগা ইভেন্ট’। আশ্চর্য নয় যে, ক্রীড়ামন্ত্রী নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট আগে মাঠে নেমে জমি জরিপ করবেন। কিন্তু তার এক ঘণ্টার মধ্যে যে যুবভারতী লন্ডভন্ড হয়ে যাবে, মমতা মাঝপথ থেকে কালীঘাট ফিরে যাবেন, সৌরভ নির্দিষ্ট সময়ে ঢুকতে পারবেন না এবং শাহরুখ স্টেডিয়ামে না গিয়ে সপুত্র হোটেল থেকেই ফিরে যাবেন কে জানত! সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ যুবভারতীর চার এবং পাঁচ নম্বর গ্যালারির মাঝের পথ দিয়ে মেসির গাড়ি এসে থামে অ্যাথলেটিক ট্র্যাকের সামনে। গাড়ির বনেট দেখা যেতেই জনগর্জনে ফেটে পড়ে গ্যালারি। মেসি নামতেই মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে ফেলেন শ’খানেক লোক। সেই জটলায় অরূপ যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন উদ্যোক্তাদের মধ্যে কোট-টাই পরা কিছু অপেশাদার এবং কিছু তরুণী। মেসি এগোচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে এগোচ্ছে একদল মানুষ। যা প্রায় ঢেকেই দিয়েছে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির বিশ্বকাপজয়ী তারকাকে। সময় এগোচ্ছে, মেসি এগোচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে মানুষের দঙ্গলও এগোচ্ছে। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে যাঁরা মেসিকে দেখতে এসেছেন, তাঁরাই মেসিকে দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু সেই চলমান জটলার মধ্যে নিজস্বী তোলা দিব্যি চালু আছে। ধৈর্য্যচ্যুতির শুরু তখনই। বেলা ১১ট ৩৯ মিনিটে হঠাৎ গ্যালারি কাঁপিয়ে স্লোগান উঠতে শুরু করে, ‘উই ওয়ান্ট মেসি’। সেই স্লোগানের লয় খানিকটা মিলে যাচ্ছিল আরজি কর পর্বের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’-এর সঙ্গে। সেটা শুনেই পোড়খাওয়া রাজনীতিক অরূপ সম্ভবত বুঝে গিয়েছিলেন, পরিস্থিতি বেগতিক। প্রথম তিনিই হাতে কর্ডলেস মাইক্রোফোন নিয়ে মেসিকে ঘিরে থাকা ভিড় সরাতে উদ্যোগী হন। কিন্তু ততক্ষণে বোতল থেকে দৈত্য বেরিয়ে পড়েছে। তার পরে শতদ্রু। তিনিও ব্যর্থ। বেলা ১১টা ৫০ নাগাদ জনপ্লাবনে মিলিয়ে গেলেন মেসি। ততক্ষণে গ্যালারিতে ক্রোধের বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গিয়েছে। জনতার হাতে ধরা ফোনে ফোনে ঘুরতে শুরু করল সেই ছবি, যেখানে মেসির বগলের নীচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছেন দন্তবিকশিত অরূপ। ততক্ষণে গ্যালারিতে হোর্ডিং ছেঁড়া শুরু হয়ে গিয়েছে। তার পর শুরু বোতলবৃষ্টি। তার পরে চেয়ার ভেঙে তাণ্ডব। তারও পরে ফেন্সিং ভেঙে গলগল করে মানবস্রোত ঢুকে পড়ল মাঠে। চতুর্দিক থেকে। যাতে কার্যত ভেসে গেলেন অরূপও। তিনি যখন যুবভারতী ছেড়ে বেরোচ্ছেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান উঠতে শুরু করেছে। ততক্ষণে অরূপের ‘সৌজন্যে’ বিরোধীরা ‘বিষয়’ পেয়ে গিয়েছে। তারা যখন কোমর বাঁধছে, তখনই কালক্ষেপ না করে টুইট করে মেসি এবং দর্শকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা। দোষ দেন যুবভারতীর অব্যবস্থাকে। ঘোষণা করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করারও। যুবভারতীতে যখন মাঠজুড়ে তাণ্ডব শুরু হয়েছে, তখন অরূপকে ঘিরে আন্দোলিত হতে শুরু করে তৃণমূলের অন্দরমহল। এক প্রথম সারির মুখপাত্র ঘনিষ্ঠদের ফোন করে বলতে শুরু করেন, ‘‘অরূপ ইস্তফা দিচ্ছে কিনা খেয়াল রাখিস! দিদি কিন্তু বলে দিতে পারেন।’’ যদিও শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে, এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তবে অরূপের সূত্রেই নতুন করে তৃণমূলের অন্দরের আলোচনায় ‘প্রাসঙ্গিক’ হয়ে উঠেছেন মদন মিত্র। যিনি মমতার প্রথম সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন। ১৪ বছর আগে মদনের ক্রীড়ামন্ত্রিত্বের সময়েই প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনা ফুটবল দল প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছিল ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে। সে দিনও যুবভারতী ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু কোনও অব্যবস্থা ছিল না। সেই সূত্রেই শাসকদলের অনেকে বলছেন, মদন ‘যোগ্যতর’ ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন। তবে এ-ও ঠিক যে, মেসি সে বার খেলতে এসেছিলেন। তিনি কোনও ‘স্পোর্টস প্রমোটার’-এর ব্যবসায়িক উদ্যোগের অংশ হয়ে আসেননি। তখন মেসিকে দেখতে বা তাঁর খেলা দেখতে হাজার হাজার টাকার টিকিট কাটতে হয়নি। দ্বিতীয়ত, ১৪ বছর পরে এই মেসির আকর্ষণ গগনচুম্বী। তাঁর নেতৃত্বেই শেষ বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্তিনা। এই মেসি স্বপ্নপূরণের ঈশ্বর। ফলে তাঁকে একটিবার চোখের দেখা দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও নজিরবিহীন। মদন-ভক্তেরা অবশ্য বলছেন, এই মেসির জন্যই বরং আরও বেশি ‘সতর্ক এবং সজাগ’ থাকা উচিত ছিল ক্রীড়ামন্ত্রীর। তাঁদের ‘দাদা’ থাকলে এই জায়গাটায় কোনও আপস করতেন না। মদন নিজে স্বভাবতই অবশ্য অরূপের সঙ্গে তাঁর তুলনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠেরা বলছেন, ‘ওহ লাভলি!’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles