Tuesday, April 28, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

সন্দীপের প্রতিবাদ তো হিমবাহের চূড়া! বিদেশিদের অসভ্যতা বন্ধে দরকার ধাক্কা

কেউ পারে, কেউ পারে না। সন্দীপ নন্দী পেরেছেন। প্রশংসা পাওয়াই প্রাপ্য। আইএসএল শুরু হওয়ার পর থেকেই পেশাদারিত্বের মোড়ক দেখাতে গিয়ে আমাদের কর্পোরেট ফুটবল কর্তারা ভীষণভাবে মাথায় তোলা শুরু করেছেন বিদেশি কোচ আর তাঁর তল্পিবাহক বিদেশি সহযোগীদের। অবশ্যই আমার এই নিশানা সব বিদেশি কোচের জন্য নয়। তবে সিংহভাগের জন্য তো বটেই। খুব সাধারণ মানের বিদেশি কোচেরা ভারতে কোচিং করতে এসে নিজেদের কেউকেটা ভাবতে শুরু করেন। ভারতীয় সহযোগী কোচদের এঁরা ব্যবহার করেন ট্রেনিংয়ে শুধু কোণ আর বাটি সাজানোর জন্য। ট্রেনিংয়ে বাকি কাজটা সারেন তাঁর মদতপুষ্ট বিদেশি ট্রেনার বা ফিজিক্যাল ট্রেনাররাই। যাঁদের যোগ্যতা নিয়ে থাকে প্রচুর প্রশ্ন। অথচ যোগ্য ভারতীয় সহকারী কোচদের মতামতও নেন না বিদেশি চিফ কোচ। দেশের মাঠে এত ব্রাত্য হয়ে থাকাটা ভারত আর বাংলাদেশের কোচদেরই ভাগ্যেই থাকে। শুনেছি, নেপালে এমনকি ভুটানেও সেই দেশের সহকারীর কথা না শুনলে চিফ কোচের চেয়ার নড়ে যায়। বছর পনেরো আগে থেকে ভারতের কোচদের দেশের নামী ক্লাবে কোচিং করা থেকে বাদ পড়া শুরু হয়েছিল লাইসেন্স না থাকায়। ফলে অত্যন্ত সাদামাটা বিদেশি কোচরাও স্রেফ লাইসেন্সের জেরে এ দেশে ফুটবল কোচিংয়ে জাঁকিয়ে বসে। এতে ভারতীয় ফুটবলের উন্নয়ন তো দূর অস্ত, আরও তলানিতে যাওয়া শুরু। পরবর্তীকালে ভারতের কোচেরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে দ্রুত সর্বোচ্চ পর্যায়ের লাইসেন্সিং ডিগ্রি নিয়ে ফেলেন। কিন্তু তাঁদের ক্লাব পর্যায়ে সহকারী হওয়া ছাড়া পথ নেই। কারণ বিদেশিরাই তো জায়গা ভরাট করে ফেলেছেন এজেন্ট আর টিম ম্যানেজমেন্টের কিছু কর্তাকে কাটমানি দিয়ে।
জাতীয় বা ক্লাব পর্যায়ে যখন শুধু আর্থিক সঙ্কট দেখা যায়, তখনই ভারতীয় কোচদের ডাক পড়ে। বর্তমানে এআইএফএফের অর্থ সঙ্কট। তাই সব পর্যায়েই প্রায় স্বদেশি কোচ। কম বাজেটে সঙ্কট মোচনের চেষ্টা। ক্লাবগুলোই তাই। অর্থের রমরমাও বিদেশি কোচ আর অর্থ না থাকলে ভারতীয়। খালিদ জামিল, নৌসাদ মুসা, মেহরাজউদ্দিনদের পরে ক্লিফোর্ড মিরান্ডা এখন আইএসএল টিমের চিফ কোচ। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচে লাইসেন্স করা ভারতীয় কোচেরা রুটি রোজগারের লক্ষ্যেই অপমান সয়েও বিদেশি কোচদের সঙ্গ দেন। জানেন প্রতিবাদ করলেই চাকরি যাবে। চাকরি গেলে সংসার চলবে কী করে? অতএব প্রতিবাদ নেই। সন্দীপ নন্দী দেশের সর্বকালের সেরা গোলকিপারদের তালিকায় অবশ্যই থাকবেন। পরিশ্রমী, নিয়মনিষ্ঠ, সততা সঙ্গে এগোনো সন্দীপ খেলার জীবনে ফুটবলকে ঠকাতে চাননি বলেই চাকরি নেননি। পেশাদার জীবন বেছে নিয়েছিলেন সারাক্ষণ ফুটবল নিয়েই থাকবেন বলে। সোনালি শিবির ক্লাবে ফুটবল জীবন থেকে শুরু জাতীয় যুব টিমের কোচিং—কোনও জায়গাতেই তাঁর যোগ্যতা আর দায়বদ্ধতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাননি। সেই সন্দীপের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শুধু ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজো শুধু তাঁকে অপমান করেননি, অপমান করেছেন প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলারদের। ভারতীয় কোচদের। গোয়া থেকে ফোনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েক জন ফুটবলার বলছিলেন, বিমানবন্দরেই গোলকিপার কোচকে যে ভাষায় প্রকাশ্যে অস্কার ভর্ৎসনা করেছেন, তাতে তাদের গায়ে জ্বালা ধরেছিল। প্রতিবাদ করতে পারেনি, টিম থেকে বাদ পড়ার ভয়ে। কেউ পারে, কেউ পারে না। সন্দীপের রুটি রোজগার কোচিং হলেও অস্কারের অপমানে তিনি টিমহোটেল ছেড়ে চলে আসতে দ্বিধা করেননি। আত্মসম্মান বেচে দিয়ে বেঁচে থাকার পথে হাঁটতে চাননি বর্ধমানের এই ছেলে। এতে তার কোচিং জীবন চরম অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও তিনি পিছিয়ে আসছেন না। বিদেশি কোচদের অসভ্যতার প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠতে চাইছেন। যাঁর সতীর্থ, সিনিয়র, জুনিয়ররা তাঁর পাশে দাঁড়াতেও শুরু করেছে। তাই সন্দীপের দেওয়া ধাক্কাটা হিমবাহের একটা চূড়া মাত্র। আগামী দিনে ভারতীয় সহকারীরা যদি এ ভাবে প্রতিবাদের পথে হাঁটেন, তাহলে তাতে এই দেশের ফুটবলে অসভ্যতা চালিয়েও টাইটানিকের মতো ভেসে থাকা বিদেশি কোচেদের অহঙ্কার ভর্তি জাহাজও ডুববে।

সন্দীপ নন্দীর ইস্যুতে সরগরম কলকাতা ময়দান। IFA শিল্ড ফাইনাল হারের জেরে সন্দীপ নন্দীর সঙ্গে কোচ অস্কার ব্রুজ়োর ঝামেলা। আর তার জেরে ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার কোচের পদ ছাড়েন সন্দীপ। শুধু চাকরি ছাড়া নয়, তিনি একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি জানিয়েছেন, তিনি সুপার কাপের পর অস্কারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেন। এ বার এই ইস্যুতে সন্দীপ নন্দী পাশে পেলেন তাঁর প্রাক্তন সতীর্থ ও ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তনী সৌমিক দে-কে। সৌমিক দে-র নিশানায় ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজ়ো। তিনি বলেন, ‘ইস্টবেঙ্গলের ভালো করতে গেলে অস্কারকে সরাতে হবে। আমি IFA শিল্ড ফাইনাল মাঠে বসে দেখেছি। অস্কারের কোনও স্ট্র্যাটেজি নেই, কোনও ম্যাচ রিড নেই। নয়তো ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হামিদকে তুলে নেয় না কেউ। ফাইনাল আর ডার্বির মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নতুন হিরোশিকে নামানোর কোনও যুক্তি নেই। মিগুয়েলের মতো প্লেয়ারকে শুরু থেকে বসিয়ে রাখা কোনও গেম প্ল্যানের মধ্যে পড়ে না।’ ফাইনালে হারের পর অস্কার ব্রুজ়ো সাংবাদিক বৈঠকে জানান, টাইব্রেকারের আগে গোলকিপার বদলের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তিনি বদল নিয়ে তাঁর সাপোর্ট স্টাফদের দিকে আঙুল তুলেছেন। জানিয়েছেন, সাপোর্ট স্টাফদের পরামর্শেই তিনি গোলকিপার বদল করেন এবং সেই সিদ্ধান্ত ব্যুমেরাং হয়। দেখা গিয়েছিল, টাইব্রেকারের আগে ইস্টবেঙ্গল ডাগআউটের পিছনে সন্দীপ নন্দী দেবজিৎ মজুমদারকে ওয়ার্মআপ করাচ্ছেন। এর পরেই তাঁকে নামানো হয়। টাইব্রেকারে দেবজিৎ একটিও সেভ করতে পারেননি। এটা নিয়ে সৌমিক বলেন, ‘দেবজিতকে নামানো নিয়ে সন্দীপ নন্দীর নিন্দা করা হচ্ছে। দেবজিৎ যদি সেভ করে দিত, তা হলে সন্দীপকে কৃতিত্ব দিতেন তো অস্কার?’ এর পর তিনি আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। বলেন, ‘ম্যাচের পর সন্দীপ নন্দীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমাকে বলেছে, ইস্টবেঙ্গলে টাইব্রেকার অনুশীলন করান না অস্কার। আমি ভেবে অবাক হয়ে গেলাম। নিজের দোষ ঢাকতে অস্কার সন্দীপ নন্দীর সঙ্গে যোট করেছেন, সেটা আমাদের সকলের অপমান। সন্দীপ দেশ ও ক্লাবের হয়ে কী করেছে সেটা অস্কার জানেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, দলের অভ্যন্তরে কী ভুল হয়েছে সেটা কখনও প্রকাশ্যে বলা উচিত না। ট্রেভর জেমস মরগ্যানও আমাদের ভুল ধরতেন, তবে সেগুলো ড্রেসিংরুমে আলোচনা হতো, কখনও মিডিয়ার সামনে বলেননি তিনি।’ সুপার কাপ খেলার জন্য গোয়ায় পৌঁছানোর পরেই অস্কার ব্রুজ়োর সঙ্গে ঝামেলায় জড়ান সন্দীপ। তাঁর অভিযোগ, অস্কার প্লেয়ার ও সাপোর্ট স্টাফদের সামনে অপমান করেন, সন্দীপ নন্দীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপরেই সন্দীপ পদত্যাগ করেন ও কলকাতা ফিরে আসেন। সৌমিক অবশ্য এক্ষেত্রে সন্দীপের পাশে দাঁড়াননি। তিনি বলেন, ‘আমি হলে সরে আসতাম না, পদে থেকে অস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতাম, ওকে জবাব দিতাম। আসলে অস্কার গোলকিপার কোচের পদে নিজের লোক আনতে চাইছেন, তাই এ সব কাজ করছেন।’

সুপার কাপ অভিযান শুরু করছে ২৫ অক্টোবর, ডেম্পোর বিরুদ্ধে। এই গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের আগেই দলের হেডকোচ অস্কার ব্রুজ়োর সঙ্গে সন্দীপ নন্দীর ঝামেলা এখন খবরের শিরোনামে। সন্দীপের অভিযোগ, ব্রুজ়ো তাঁকে সবার সামনে অপমান করেছেন। যে কারণে তিনি সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করে গোয়া থেকে ফিরে আসেন। সন্দীপের সাফ দাবি, ‘সম্মান হারিয়ে কাজ করা যায় না।’ সন্দীপ বলেন, ‘এই অপমান আমাকে করা মানে, আমার দেশের ফুটবলকে অপমান করা। এটা মেনে নেওয়া কঠিন। আমি এই নিয়ে অবশ্যই চিঠি দেব ইস্টবেঙ্গলের ম্যানেজমেন্ট, অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (AIFF), ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (IFA), এবং ফুটবল প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (FPA)। তবে আপাতত চাই, ইস্টবেঙ্গল ভালো খেলে সুপার কাপ জিতুক। তার পর যা করার করব। আমি চাই না, সুপার কাপ থেকে ফোকাস সরে যাক দলের প্লেয়ারদের।’ সুপার কাপ খেলতে গোয়ায় পা রাখতে না রাখতেই ঝামেলায় জড়ান ব্রুজ়ো আর সন্দীপ। সন্দীপের দাবি ছিল, ‘এত খারাপ অভিজ্ঞতা আমার কখনও হয়নি। ২দিন আগের ঘটনা টেনে এনে কী অপমানটাই না করলেন ব্রুজ়ো। গোয়ায় বিমানবন্দরে নামার পরে আমি কোচকে গুড মর্নিং বলেছিলাম, তখন উনি হঠাৎ করে আমাকে যা তা বলতে শুরু করেন। পুরো টিমের সামনে। তখন প্লেয়াররাও সবাই ছিল। শিল্ডের ফাইনালে হারের দায় আমি নিয়েছি। তার জন্য কোচকে সরিও বলেছি। কিন্তু হঠাৎ করে সবার সামনে আমাকে যা তা বলার পর ব্রুজ়ো বলেন, তুমি আর কোনও সিদ্ধান্ত নেবে না। এর পরেই আমি ঠিক করে নিই, আর এখানে নয়। সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিই। আমি হোটেলেও যায়নি, কিছু খাওয়াদাওয়াও করা হয়নি। এ ভাবে সম্মান হারিয়ে থাকা যায় না। কোচ আমাকে সন্দেহ করেন।’ কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সন্দীপের সাফ বক্তব্য, ‘আমি ক্লাবের লোক বলে কোচ মনে করেন। আর মনে মনে ভাবেন বোধহয়, ওঁকে আমি ভুল পথে পরিচালিত করব। এই কারণেই দেবজিতের ইস্যু নিয়ে এতটা চটেছেন তিনি। ভাবছেন, আমি বোধহয় ইচ্ছে করেই এই সব করেছি। এই ভাবে কাজ করা যায় নাকি! ফার্গুসন হলেও, এ রকম অপমানিত হওয়ার পর, আমি তাঁর সঙ্গেও কাজ করতাম না।’ মোদ্দা কথা, সুপার কাপের আগে ইস্টবেঙ্গলে এখন দাউদাউ আগুন জ্বলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles