বয়স চল্লিশ পেরোতেই বহু মানুষ, বিশেষত মহিলারা, হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত। চিকিৎসকের পরামর্শে বা অনেক সময়ে নিজে থেকেই ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করেন। ধারণাটা অত্যন্ত সরল- হাড়ের মূল উপাদান যেহেতু ক্যালসিয়াম, তাই এর জোগান বাড়ালেই বুঝি হাড় মজবুত থাকবে এবং অস্টিওপোরোসিসের মতো ‘নীরব ঘাতক’ রোগকে দূরে রাখা যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা করাটা শুধু ক্যালসিয়ামের জোগান দেওয়ার মতো একমাত্রিক বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা। অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ যেখানে হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে তা দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এর ফলে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, শুধু ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টের উপর নির্ভর করে এই রোগের মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। ক্যালসিয়াম হাড়ের জন্য অপরিহার্য, ঠিকই। কিন্তু সেই ক্যালসিয়ামকে শরীরে সঠিকভাবে শোষণ করা এবং হাড় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও কয়েকটি অনুঘটক প্রয়োজন। হাড়ের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-কে বলা যেতে পারে ক্যালসিয়ামের সর্বোত্তম বন্ধু। শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে আপনি যতই ক্যালসিয়াম গ্রহণ করুন না কেন, তার সিংহভাগই শোষিত না হয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। ভিটামিন ডি অন্ত্রে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে এবং তাকে হাড়ের কাঠামোতে জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। এর প্রধান উৎস হল সূর্যালোক। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট সকালের নরম রোদ গায়ে লাগানো উচিত। এ ছাড়াও তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। হাড়কে শক্তিশালী রাখতে শরীরচর্চার কোনও বিকল্প নেই। বিশেষত, ভারবহনকারী ব্যায়াম যেমন- দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা জরুরি। এই ধরনের কাজের ফলেই হাড়ের কোষগুলি নতুন করে ঘনত্ব বাড়াতে উদ্দীপিত হয়। এর পাশাপাশি পেশির শক্তি বাড়ানোর জন্য স্ট্রেংথ ট্রেনিংও অত্যন্ত জরুরি, কারণ শক্তিশালী পেশি হাড়কে অবলম্বন দেয় এবং পড়ে গিয়ে আঘাত লাগার ঝুঁকি কমায়। হাড় কেবল ক্যালসিয়াম দিয়ে তৈরি নয়। এর জন্য ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস এবং ভিটামিন কে-এর মতো খনিজও প্রয়োজন। পালং শাক, ব্রকোলি, বাদাম, কুমড়োর বীজ, বিনস ইত্যাদি খাবারে এই উপাদানগুলি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। একইসঙ্গে, হাড়ের কাঠামোর প্রায় ৫০ শতাংশই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। তাই খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন (ডাল, মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, সয়াবিন) রাখাও আবশ্যক। ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই অভ্যাসগুলি শরীর থেকে ক্যালসিয়াম শোষণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হাড়ের ঘনত্ব কমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করতে হলে শুধু ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের উপর ভরসা করে নিশ্চিন্ত হবেন না। বরং সুষম আহার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনশৈলী গড়ে তোলার মাধ্যমেই হাড়ের প্রকৃত যত্ন নেওয়া সম্ভব। প্রয়োজনে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কিন্তু নিজের জীবনযাত্রার দায়িত্ব নিজের হাতেই তুলে নিতে হবে
খিদে কমাতে বলা সেই প্রোটিনের সন্ধান। নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে স্থূলতা। এমসি৪আর মস্তিষ্কের এক সংবেদী স্নায়ু। পেপটাইড হরমোন এমএসএইচ দ্বারা সক্রিয় হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেন, শরীর স্থূল হওয়ার অন্যতম কারণ হল এই এমসি৪আর-এর মিউটেশন। একেই সক্রিয় করে সেই প্রোটিন। সাঁতার, ব্যয়াম করে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসছে না! কারণ, পেটের খিদে। শরীর চর্চা করে যতটা মেদ ঝরাচ্ছেন, ততটাই আবার পেটে পুরছেন। এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের শরীরেই রয়েছে এক প্রোটিন, যা খিদেয় লাগাম পরাতে পারে। এমআরএপি২ নামে এই প্রোটিন খিদের নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মস্তিষ্কে থাকা খিদের রিসেপটর (সংবেদী স্নায়ু) এমসি৪আরকে কোষের পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দেয় এই প্রোটিন। সেখানে গিয়েই এই রিসেপটর বলে, ‘এবার খাওয়া বন্ধ করো’! বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার এবার স্থূলতা (ওবেসিটি) নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। জার্মানির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা একটি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। তার নাম সিআরসি ১৪২৩। সেই কেন্দ্রের গবেষকেরা খিদে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। তাঁরা দেখেন, খিদের নেপথ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট এক প্রক্রিয়া। এমআরএপি২ (মেলানোকর্টিন ২ রিসেপটন অ্যাকসেসরি প্রোটিন ২) মস্তিষ্কের রিসেপটর এমসি৪আর (মেলানোকর্টিন-৪ রিসেপটর)-কে প্রভাবিত করে। এটি খিদে নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তির ভারসাম্য রাখতে উল্লেখ্য ভূমিকা নেয়। এই গবেষণা নেচার কমিউনিকেশনে প্রকাশিত হয়েছে। এমসি৪আর মস্তিষ্কের এক সংবেদী স্নায়ু। পেপটাইড হরমোন এমএসএইচ দ্বারা সক্রিয় হয়। এই এমসি৪আর নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, শরীর স্থূল হওয়ার অন্যতম কারণ হল এই এমসি৪আর-এর মিউটেশন। গবেষক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন প্যাট্রিক স্কিরার। তিনি জানান, রিসেপটর যখন সক্রিয় হয়, তখন তার ৩ডি ছবি তোলা হয়েছে। সাধারণ আয়ন এবং সেটমেলানোটাইড নামে এক ধরনের ওষুধের সংস্পর্শে এলেই এই রিসেপটর সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই অবস্থায় তার কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। খিদে কমানোর জন্য ওষুধ সেটমেলানোটাইড ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওষুধই সক্রিয় করে তোলে রিসেপটরকে। বিজ্ঞানীরা ফ্লুওরোসেন্স মাইক্রোস্কপি প্রক্রিয়াও ব্যবহার করেছে। এতে কোষে বিশেষ উজ্জ্বল রং প্রয়োগ করা হয়। তা করে বিজ্ঞানীরা দেখেন, কোষের মধ্যে এমসি৪আর-এর অবস্থান এবং চরিত্রের বদল ঘটায় এমআরএপি২ প্রোটিনটি। এটিই এমসি৪আর-কে কোষের পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে গিয়ে ওই রিসেপটর বলে, ‘‘এ বার খিদে নিয়ন্ত্রণ করো’’! বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়া তাঁরা বোঝার কারণে, তা স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। তাঁরা মনে করছেন, প্রোটিনের চরিত্র স্থূলতা নিয়ন্ত্রণেও কাজে আসবে। এই গবেষক দলের ব্রিটেনের সেন্ট অ্যান্ড্রিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পাওলো অ্যানিবাল জানান, কোষের মধ্যে অণু কী আচরণ করে, এই গবেষণায় কিছুটা স্পষ্ট।





