রাজ্যে আরজি করে ডাক্তারি পড়ুয়াকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল। এদিকে কয়েক মাস আগেই কসবা ল কলেজে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। আর এবার দুর্গাপুরে বেসরাকরি হসপাতালের কাছে ধর্ষণের শিকার ডাক্তারি পড়ুয়া। এদিকে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও দুর্গাপুরের নিউটাউশিপ থানার পুলিশ এখনও কোনও অভিযুক্তকে ধরতে পারেনি। দুষ্কৃতীদের কোনও নামও জানা যায়নি। এদিকে এই ঘটনার পর জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদার বলেন, ‘দোষীদের সঠিকভাবে ধরে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি না দেওয়ার কারণেই এভাবে যৌন নির্যাতনের ঘটনা, ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। আমরা যতই দৌড়াই না কেন, কোনও এক অদৃশ্য হাতের জন্য কোনও দোষীর সেইভাবে শাস্তি হচ্ছে না।’ দুর্গাপুরে মেডিক্যাল কলেজের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠল। নির্যাতিতা তরুণী ভিনরাজ্যের বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে। এদিকে যে মেডিক্যাল কলেজে তিনি পড়তেন, সেটি বেসরকারি বলে জানা গিয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের পিছনের দিকের একটি জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, অভিযুক্তরা কলেজের কেউ নয়, তারা বহিরাগত দুষ্কৃতী। রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্যাতিতা তরুণী ওড়িশার জলেশ্বরের বাসিন্দা। তরুণীর পরিবার জানিয়েছে, শুক্রবার রাত সাড়ে আটটা নাগাদ ওই পড়ুয়া সহপাঠীদের সঙ্গে কলেজের বাইরে বেরিয়েছিলেন ফুচকা খেতে। সেই সময় কয়েকজন যুবক ওই তরুণীর পথ আটকায় এবং জোর করে হাসপাতালের পিছনের দিকে থাকা একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়। এদিকে দুষ্কৃতীদের তাড়া খেয়ে তরুণীর সঙ্গে থাকা বন্ধুটি পালিয়ে যান বলে জানা যায়। এদিকে গণধর্ষণ করার পর ডাক্তারি পড়ুয়ার মোবাইলটি ছিনিয়ে নেয় দুষ্কৃতীরা। ঘটনা প্রসঙ্গে নির্যাতিতার বাবা বলেছেন, আমি এখানে আর ওকে পড়াব না। আমি ওকে বাড়ি নিয়ে চলে যাব।
‘অভিযুক্তকে জমা নিয়েই খরচ করা উচিত।’ একের পর এক ধর্ষণকাণ্ডের রাজ্য সরকারকে বিঁধে উত্তরপ্রদেশ মডেলের পক্ষে সওয়াল করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি চান, পশ্চিমবঙ্গও অনুসরণ করুক উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মডেলের শাস্তিকে।অর্থাৎ, ধর্ষণের মতো অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের পরই ‘এনকাউন্টার’ করার দরকার বলে মনে করেন বিরোধী দলনেতা। দুর্গাপুরে এক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া সন্ধেবেলা ক্যাম্পাসের বাইরে খাবার খেতে বেরিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় এখন তোলপাড় গোটা বাংলা। এদিকে, জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জেও এক ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির বিরুদ্ধে নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। এই সব ঘটনায় অভিযুক্তেরা যাতে পার না পান, তা খেয়াল রাখতে হবে রাজ্য সরকারকে, এমনই বোঝালেন শুভেন্দু অধিকারী। তাই ‘খরচের’ নিদান দিয়েছেন তিনি।শনিবার সাংবাদিক বৈঠকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রাজ্যের একের পর এক ধর্ষণকাণ্ড নিয়ে সরকারকে নিশানা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে রাজ্যে ঘটা এই সব ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবৃতিও দাবি করেছেন। রাজ্যের বিরোধী দলনেতার কথায়, ‘জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের বানিয়াপুর এলাকায় বছর দুই আগে একটি মেয়ের ধর্ষণ হয়। সেই ঘটনায় অভিযুক্তের ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। কিন্তু তা এখনও কার্যকর হয়নি।’ এরপরেই শুভেন্দু ‘যোগী-মডেলে’র প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কিছু হলেই তো পুলিশের তরফে সাংবাদিক বৈঠক করা হয়। কিন্তু এই ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে তাঁদের কোনও ভূমিকা থাকে না। এদের তো জমা করার সঙ্গে সঙ্গে খরচ করে ফেলার কথা।’ শুভেন্দুর সাফ কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী না করা পর্যন্ত এই ঘটনা কমবে না। দুর্গাপুরের ঘটনা প্রসঙ্গে বিরোধী দলনেতা দাবি করেন, ‘এই দুই ঘটনায় ছেড়ে কথা বলব না।’ রাজ্যে ঘটা নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে বিজেপি ‘বৃহত্তর আন্দোলন’-এর পথে হাঁটবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড় সমস্যা নারী নির্যাতন। কসবা ঘটনার পর আমরা রাজ্যে ১৪টি কন্যা সুরক্ষা যাত্রা করেছি।’ এবারও নানা ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচির করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, ‘যোগী, (দেবেন্দ্র) ফডণবীস, হিমন্ত (বিশ্বশর্মা), চন্দ্রবাবুর (নায়ডু) মতো সক্রিয় পদক্ষেপ করতে হবে।’ শুভেন্দুর আরও অভিযোগ, পুলিশের মা-স্ত্রীরাও এই রাজ্যে সুরক্ষিত নন। নাম না করে অনুব্রত মণ্ডলের কু-কথা প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘এখানে পুলিশের মা-স্ত্রীরা সুরক্ষিত নন। বোলপুরের ঘটনা তার প্রমাণ। ওই ঘটনার পর বীরভূম গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর (অনুব্রত) নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়ে এসেছেন চার জন থেকে নিরাপত্তারক্ষী ২২ জন হয়েছে। জেলা আহ্বায়কও করা হয়েছে।’ তবে ‘এনকাউন্টার’ তত্ত্ব এখন শুভেন্দু অধিকারী একা বলছেন এমনটা নয়। এর আগে আর জি করের ঘটনার সময়ও এই দাবি উঠেছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই নিয়ে কথা বলেছিলেন। জয়নগরের ধর্ষণকাণ্ডের পর ঘাটালের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ দেবও একই সুরে সুর চড়িয়েছিলেন।
রাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন নির্যাতিতা ডাক্তারি পড়ুয়া। প্রথমে বেরিয়েছিলেন এক সহপাঠীর সঙ্গে। মাঝে এক বার একা ক্যাম্পাসে ফিরেও এসেছিলেন। কিছু ক্ষণ পর তিনি আবার বেরিয়ে যান। তার মিনিট চল্লিশেক পর আবার সহপাঠীর সঙ্গেই ফিরে আসেন ক্যাম্পাসে। দুর্গাপুরের ধর্ষণকাণ্ডে বিবৃতি দিয়ে এই তথ্য দিল বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। এই তথ্যের সূত্র ধরেই প্রশ্ন উঠছে, দু’দফায় যে দেড় ঘণ্টা সময় ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন তরুণী, তার মধ্যেই কি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে? কলেজ কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ বিষয়ে কিছু জানাননি। নির্যাতিতা পড়ুয়া নিজেই অভিযোগ করেছেন, শুক্রবার রাতে সহপাঠীর সঙ্গে কলেজের বাইরে বেরিয়ে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অভিযোগ, কয়েক জন যুবক ক্যাম্পাসের বাইরে তরুণীকে হেনস্থা করেন প্রথমে। তার পর তাঁকে টেনেহিঁচড়ে পাশের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। ঘটনার তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই তরুণীর সহপাঠীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাঁর বয়ানের সত্যাসত্য যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি, অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের হয়েছে। গোটা ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দিল দুর্গাপুরের শোভাপুর এলাকায় ওই বেসরকারি কলেজ। নির্যাতিতা তরুণী ওড়িশার বাসিন্দা। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, রাত ৭টা ৫৮ মিনিটে সহপাঠীর সঙ্গে ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়েছিলেন তরুণী। এর পর ৮টা ৪২ মিনিটে তিনি ক্যাম্পাসে একা ফিরে আসেন। কলেজের গেটের কাছে ৫-৬ মিনিট ঘোরাঘুরি করে তিনি আবার বাইরে বেরিয়ে যান। তার পর ক্যাম্পাসে সহপাঠীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন রাত ৯টা ২৯ মিনিটে। তার পর ৯টা ৩১ মিনিটে তিনি নিজের হস্টেলের দিকে চলে যান। হাসপাতাল জানিয়েছে, হস্টেলে ফিরে গিয়েই নির্যাতনের কথা সকলকে জানান দ্বিতীয় বর্ষের ডাক্তারি পড়ুয়া। এর পরেই তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তৎক্ষণাৎ খবর দেওয়া হয় স্থানীয় পুলিশকেও। শনিবার হাসপাতালে গিয়ে নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করেছেন জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদার। সূত্রের খবর, নির্যাতিতার সঙ্গে কথাও বলেছেন তিনি। দোষীদের যাতে দ্রুত গ্রেফতার করা হয় এবং তদন্ত যাতে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ভাবে হয়, সেই দাবি জানিয়ে রাজ্য পুলিশের ডিজিকে চিঠি দিয়েছেন জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন বিজয়া রাহাতকর। স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট’, যারা গত বছর আরজি কর আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিল। রাজ্য পুলিশও বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘‘দোষীর ছাড়া পাবে না। নির্যাতিতা বিচার পাবেনই। উনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। ওঁর পরিবারকে সব রকম ভাবে সাহায্য করা হচ্ছে। মহিলাদের উপর অপরাধে আমরা জ়িরো টলারেন্স নীতি মেনেই চলি।’’ গত বছর আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য-রাজনীতি। অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলন দেখেছে রাজ্যবাসী। তার পর চলতি বছর কসবার আইন কলেজের ছাত্রীকে ক্যাম্পাসের ভিতর গণধর্ষণের ঘটনাকে ঘিরেও একই ভাবে চাপানউতর তৈরি হয়েছিল রাজ্যে। পথে নেমেছিলেন বিরোধীরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য প্রশাসন এবং শাসকদলকে বিঁধেছিলেন তাঁরা। আশ্চর্য নয় যে, দুর্গাপুরের ঘটনাতেও একই ভাবে শাসক-বিরোধী তরজা দেখা দেবে। দুর্গাপুরে ধর্ষণের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরেই রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে পথে নেমেছে বিজেপি। দুর্গাপুরের নিউটাউনশিপ থানাও ঘেরাও করেছে তারা। নেতৃত্বে রয়েছেন দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোড়ুই। বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল বলেন, ‘‘আরজি কর হোক বা দুর্গাপুর, ডাক্তারদের ধর্ষণ করা তো প্রবণতায় পরিণত হয়েছে এ রাজ্যে। এখানে যারা ধর্ষণ করে, তারা জানে যে তাদের মাথার উপর তৃণমূল রয়েছে। এ রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই।’’





