পরিচয় গুপ্ত : ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড ও ক্রিকেটার অ্যাসোসিশন অফ বেঙ্গল। দুই সংস্থার অদ্ভূত মিল নয়া পন্থা অবলম্বন করছে জাতীয় স্তরের ক্রিকেট সংস্থা কিংবা রাজ্য স্তরের ক্রিকেট সংস্থা। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে নিয়ে আসছে। প্রাক্তন এক ক্রিকেটারকে সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত করেছে বিসিসিআই। যিনি একটিও আন্তর্জার্তিক ম্যাচ খেলেননি। তিনি কাশ্মীরে জন্মালেও অধিকাংশ সময় ক্রিকেটটা খেলেছেন দিল্লিতে। বীরেন্দ্র সেওয়াগের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মিঠুন মিনহাস। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খুব পরিচিত নাম হলেও, একটি ম্যাচও ভারতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাননি। একইভাবে সিএবি’র প্রশাসনিক গঠনতন্ত্রে এসেছেন তিন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে। এর মধ্যে একজন এর আগেও সংস্থার যুগ্ম সচিব পদের পর সভাপতিও হয়েছিলেন। ভারতীয় দলের অন্যতম সফল বাঁহাতি ব্যাটসম্যান এবং অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সৌরভ যখন অনূর্ধ্ব ১৫,১৭,১৯ পর্যায়ের ক্রিকেট খেলেছেন। বাংলার হয়ে তখন সেই দলে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ক্রিকেটার বন্ধু ডানহাতি ব্যাটার-উইকেটকিপার। দুজনেই এরিয়ান ক্লাবের দুঃখীরাম ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ক্রিকেট শিখতেন। সঞ্জয় দাস। বাংলার হয়ে প্রথম খেলতে নামার সময় সৌরভের সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন এই সঞ্জয়। ১৯৮৭-৮৮ মরসুমে দেশের সেরা জুনিয়র ক্রিকেটারের সম্মান পান বাংলার সঞ্জয়। মুম্বইয়ের কৈলাশ ঘাটানির স্টার ক্লাবের হয়ে একটি দল ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে খুব সম্ভবত ১৫টি ম্যাচ খেলেছিলেন। বেশ কিছু ম্যাচ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সঞ্জয়। নেতার ভূমিকায় আরও অনেকে। শচীন তেন্ডুলকর, অজয় জাদেজা, রঞ্জিব বিসওয়াল, বিনোদ কাম্বলি। সৌরভও একটা ম্যাচে নেতা হয়েছিলেন। সফরে সঞ্জয় দাস সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন। বোর্ডের বার্ষিক পুরস্কার অনুষ্ঠানে সঞ্জয় দেশের সেরা জুনিয়র ক্রিকেটারের প্রাইজ পেয়েছিলেন। এবারের সিএবি সভাপতি তাঁর সেই ছেলেবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েছেন বাংলার ক্রিকেট পরিকাঠামোর উন্নতি এবং মাঠের সাফল্য এনে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে। সঞ্জয় এবার সংস্থার কোষাধ্যক্ষ।

সিএবি’র পদে আরও একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার। বর্ষীয়ান ক্রিকেটার। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদে তিন দশক ধরে কাজ করেছেন। যুগ্ম সচিব মদন ঘোষ। একসময় বাংলার হয়ে খেলার পর, বিভিন্ন বয়স ভিত্তিক স্তরে কোচিং করিয়েছেন। আবার নির্বাচক হয়েছেন। বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন। গঠনতন্ত্র মেনে ক্লাব থেকে প্রতিনিধিত্ব করা শুরু করেছেন। ময়দানে নুতন মুখ নন। রাজ্যের ক্রিকেট সংস্থায় এবার প্রাক্তন ক্রিকেটারদের পাল্লা ভারী। সিএবি সঞ্জয় দাসকে কোষাধক্ষ পদে বসিয়ে, তাঁকেই যে বেশি ব্যবহার করবে তার প্রমাণ এখন থেকেই মিলতে শুরু করেছে। মঙ্গলে অর্থাৎ মহাষ্টমীতে গুয়াহাটিতে মেয়েদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধন। বোর্ডের আমন্ত্রণ অনুযায়ী সব রাজ্যসংস্থার প্রতিনিধিরা যাচ্ছেন। বাংলার রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা থেকে পাঠানো হয়েছে প্রাক্তন ক্রিকেটার এই সঞ্জয় দাসকে। প্রায় কয়েক দশক পর সিএবিতে কোনও একটি বিশেষ ঘরে ফিরে এলেও সচিব বাবলু কোলে কোনও কারণবশত যাননি।জাতীয় স্তরের ক্রিকেটার বোর্ড সভাপতি মিঠুন মিনহাস উপস্থিত থাকছেন।

বাংলার প্রতিনিধি হয়ে একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয়ও উপস্থিত থাকছেন। জাতীয় স্তরে এঁরা দুজনে কেউই হাইপ্রোফাইল ক্রিকেটার নন। কিন্তু দুজনেই সাংগঠনিক-প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ করে তাঁরা দুটি রাজ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন। বোর্ড সভাপতি মিঠুন মিনহাস কিন্তু এই পদে মনোন়য়নপত্র জমা দেওয়ার পর তাঁকে আইনের সহায়তায়( বোর্ডের) ক্লিনচিট নিতে হয়েছে। এই পোস্টের সঙ্গে বোর্ডের ওয়েবসাইটের লিঙ্কে আরও বিস্তারিত।
বঙ্গ ক্রিকেটে সঞ্জয়ের মনোনয়ন পত্র নিয়ে সামান্য প্রতিবাদ হয় নি। এখনকার কমিটির কারোর ক্ষেত্রেই হয়নি, তার ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। বোর্ডের ক্ষেত্রে কিন্তু কোষাধক্ষ পদে আসা প্রাক্তন জাতীয় ক্রিকেটার রঘুরাম ভাটকেও এমন ধাক্কা সামলাতে হল। বাদ যাননি, হরভজন সিংও। যিনি পাঞ্জাব ক্রিকেট সংস্থা থেকে বার্ষিক সভায় গিয়েছেন। অথচ রঘুরামকে নিয়ে একসময়ে সভাপতি বলে গুঞ্জণ চলেছিল। বিসিসিআই চলে রোটেশন পদ্ধতিতে। এর আগের সভাপতি রজার বিন্নি কর্ণাটক রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার প্রতিনিধি ছিলেন। দক্ষিণের ছিলেন। রঘুরাম সেই দক্ষিণের অর্থাৎ কর্ণাটকেরই। দৌড়ে, হরভজনের নাম ছিল। হয়েও যেতেই পারতেন। আরও অনেক পেশাদারী কাজকর্ম টিভি ধারাভাষ্যকার ইত্যাদি তাঁকে পিছিয়ে দিয়েছিল। বোর্ডের শীর্ষে থাকা মস্তকরা অবশ্য এমন কাউকে চাইছিলেন, যিনি রোটেশন মেনে উত্তরের প্রতিনিধি হবেন। হয়তো বা যথার্থ ইয়েসম্যান হবেন। বাইরে থেকে কারোর দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। হরভজন সিং তা হতে পারতেন না, এমন সম্ভবনা প্রবল ছিল বলে এখনকার বোর্ডের মাথারা আঁচ করেছিলেন। আর ভাজ্জি এখন আম আদমি পার্টির সাংসদ।

সৌরভ-সঞ্জয়-মদন বাহিনীকে এসব সমস্যায় পড়তে হয় নি। নুতন ভাবে পথ চলা শুরু হল। এরপর আসতে চলেছে স্পোর্টস বিল অনুযায়ী সংবিধান রদবদল। তা বোর্ডেও হবে। অনুমোদিত সংস্থাগুলোরও হবে। তখন আরও এক খেলা। বাংলায় তখন কিছু অন্য খেলা দেখা যেতে পারে। বিধানসভা নির্বাচন হয়ে যাবে। বাংলা ক্রিকেট মহলে দুই লক্ষ্যে এগোচ্ছেন এক কর্তা। প্রাথমীক ভাবে বিধায়ক টিকিট লাভের আশায় দৌড়চ্ছেন। পাশাপাশি ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি খেয়ে তিনি এক প্রভাবশালী খুঁটি জাপটে বসে। টিকিট যদি না জোটে তাহলে তিনি সিএবির সচিব পদে চলে আসতে পারেন। অন্য খেলায় মেতে উঠেছেন। শুধু স্পোর্টস বিলের অপেক্ষা। কিন্তু আন্তজার্তিক ম্যাচ না খেলা সঞ্জয় আর মিঠুনদের নিয়েই এগিয়ে যাবে সকলে। স্পোর্টস বিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ তিনটি। সভাপতি, সচিব ও কোষাধক্ষ। সভাপতিরা সংবিধান মেনে বার বার ফিরতে পারেন কেবলমাত্র সেই পদেই (সকলে একমত হলে, বা নির্বাচন জিতে এলে)। বাকি কোষাধক্ষ, যুগ্ম সচিব, সচিব, সহ সভাপতিরা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে। এই নিয়মে মিঠুনের যাত্রা বেশিদূর নয়। বাংলায় সঞ্জয় হয়তো পারবেন। অনু দত্ত, মদন ঘোষ, বাবলু কোলেরা হয়তো? বছর ঘুরলে সকলেরই চোখ থাকবে পারফরমেন্সের দিকে। বাংলার ছেলে মেয়েরা কটি টুর্নামেন্টে ভারত সেরা হল? কতজন বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় দলে জায়গা পেল? সিএবির নিজস্ব স্টেডিয়ামের কাজ কতটা অগ্রসরমান। সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য দুই নিয়েই আগামীর পথে বিসিসিআই ও সিএবি!





