ষষ্ঠীতেই কলকাতায় ঝড়বৃষ্টি! পঞ্চমী থেকেই ভিড় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে। শুরু ঠাকুর দেখার ধুম। লাইন করে প্রতিমাদর্শন। মণ্ডপসজ্জা দেখতে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে যাওয়া। তুলছেন ছবি, নিজস্বী। ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্যোক্তাদের সতর্কও করে দিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা। সতর্কবার্তা, কোথাও কোনও অনিয়ম হলে দায়ী থাকবেন উদ্যোক্তারাই। মনোজের বক্তব্য, পুজোর পাঁচ দিন শহরের বড় পুজোগুলিতে মাত্রাছাড়া ভিড় হয়। কোথাও কোথাও মণ্ডপসজ্জা কিংবা ভিডিয়ো দেখতে দু’তিন মিনিট দাঁড়িয়ে পড়ছেন অনেকেই। মনোজ বলেন, ‘‘এ ভাবে ভিড় দাঁড়িয়ে গেলে বিপদ হতে পারে। ভিড়ের মাঝে অনেকে দাঁড়িয়ে পড়লে তার বিপুল প্রভাব পড়ে। পুলিশের সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্ব আছে। যা করতে হবে নিয়ম মেনে করতে হবে। সুরক্ষার সঙ্গে কোনও রকম আপস করা হবে না। পুজো উদ্যোক্তাদের অনেক বার এ কথা বোঝানো হয়েছে। কোনও পুজো কমিটি নিয়ম না মানলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও রকম অঘটন হলে উদ্যোক্তারাও দায়ী থাকবেন।’’ পুজোয় নিরাপত্তা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক, আইনি সব রকম নির্দেশিকা মেনে চলা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পুজো কমিটির উদ্যোক্তাদের নিয়ে চলতি মাসের শুরুতে আগেভাগেই বৈঠকে বসেছিল কলকাতা পুলিশ। শহরের বাছাই করা পুজোগুলির উদ্যোক্তারা ছাড়াও সেই বৈঠকে ছিলেন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি, দমকল দফতর, রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং পুরসভার আধিকারিকেরা। সেখানেও বার্তা দেওয়া হয়েছিল, সব পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমেই দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। সঙ্গে জানানো হয়েছিল, আদালতের নির্দেশিকা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধ না মানলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।
পঞ্চমী থেকেই প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ভিড়। ট্রেনে-বাসেও। আবহাওয়া দফতর জানাল, নিম্নচাপের প্রভাবে পুজোয় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে কলকাতায়। পাশাপাশি, দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। ফলে ঠাকুর দেখতে বেরোলে সঙ্গে ছাতা কিংবা রেনকোট না থাকলে পড়তে হতে পারে বিপাকে! ওড়িশার উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করেছিল নিম্নচাপ। ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে তা আরও পশ্চিমে সরবে। তাছাড়া, মঙ্গলবার, অর্থাৎ অষ্টমীর দিন উত্তর আন্দামান সাগরে একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নবমীর আগেই তা পরিণত হবে নিম্নচাপ অঞ্চলে। এর জেরে দুর্গাপুজোয় অন্তত দু’দিন ভারী বর্ষণ হতে পারে শহরে। পঞ্চমীতে পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ভারী বৃষ্টি ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার সম্ভাবনা রয়েছে। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টি হতে পারে দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। ষষ্ঠীর দিন কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের আট জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। সঙ্গে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে। সপ্তমী থেকে বৃষ্টি কিছুটা কমবে। ওই দিন দুই ২৪ পরগনা এবং দুই মেদিনীপুরে বিক্ষিপ্ত ভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। অষ্টমীতে ঝড়বৃষ্টি হতে পারে নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূমেও। নবমী থেকে ফের দুর্যোগ বাড়বে। দশমী এবং একাদশীতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। দশমীর দিন ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং নদিয়ায়। বাকি জেলাগুলিতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি চলবে। একাদশীতে এই জেলাগুলির পাশাপাশি বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দুই বর্ধমান, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদেও ভারী বৃষ্টি। পুজোয় ঝড়বৃষ্টি উত্তরবঙ্গেও। পঞ্চমীতে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। এ ছাড়া, দশমী পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই বিক্ষিপ্ত ভাবে ঝড়বৃষ্টি চলবে। দশমী এবং একাদশীতে ভারী বৃষ্টি হতে পারে জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে। রবিবার ষষ্ঠী। কিন্তু পঞ্চমীর সন্ধ্যা থেকেই মানুষের ঢল নেমেছে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যার, সুরুচি সঙ্ঘ, কাশী বোস লেন, দেশপ্রিয় পার্ক, নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘের মতো পুজো চত্বরে। শ্রীভূমি স্পোর্টিং, হিন্দুস্থান পার্ক, বালিগঞ্জ কালচারাল থেকে শুরু করে হাতিবাগান, বাগবাজার, টালা চত্বরের একাধিক পুজোতেও বহু মানুষের ভিড়। তবে দক্ষিণের পুজোগুলিতে ভিড় উত্তরের তুলনায় খানিক কম। তা ছাড়া, কলকাতা জুড়ে ট্র্যাফিকও মোটামুটি সচল। ভিড়ের কারণে কোথাও কোথাও গাড়িঘোড়ার গতি কমলেও সে রকম যানজট আপাতত নেই।
শারদ উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। রবিবার সকালে দেবীর বোধন। তার আগে থেকেই রাজ্য জুড়ে একাধিক পুজো মণ্ডপের উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে। দলে দলে মানুষ সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন প্রতিমা দেখার জন্য। থিম থেকে শুরু করে সাবেকি ভাবনা, নানা চমক নিয়ে বিভিন্ন দুর্গাপুজো কমিটিগুলোর মধ্যে একে অন্যকে টেক্কা দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। ৫৯ তম বর্ষে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর শহরে খাগড়া শ্মশানঘাট দুর্গাপুজো কমিটির প্রতিমা এমন চমক দিয়েছে যা জেলা বা রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবছর এই ক্লাবের দুর্গা প্রতিমা দেখতে এসে সকলের চোখ দুর্গা প্রতিমার পরিবর্তে প্রথমেই গিয়ে পড়ছে দেবীর পায়ের কাছে থাকা দুই অসুরের দিকে। শুনতে অবাক লাগলেও বহরমপুরের এই দুর্গাপুজোর মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অসুর। আর সেই অসুরকে দেখতে পঞ্চমীর সকাল থেকে দলে দলে মানুষ ভিড় করছেন খাগড়া এলাকার এই প্রতিমা দেখার জন্য। মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম বিখ্যাত প্রতিমা শিল্পী অসীম পালের হাতে এই পুজো কমিটির প্রতিমার মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি হয়েছে। বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখার্জির হাত ধরে এই পুজোর উদ্বোধন হওয়ার পর থেকেই খাগড়া শ্মশানঘাট দুর্গাপুজো কমিটির ‘বিশেষ’ অসুরের কথা ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সমাজমাধ্যমে। সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে সেই অসুরকে দেখেই প্রচুর লোক একবার চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করার জন্যই মণ্ডপে আসছেন এই পুজোর অসুরকে চাক্ষুষ করতে। ৫৯ তম বর্ষে খাগড়া শ্মশানঘাট দুর্গাপূজা কমিটি যে প্রতিমা নির্মাণ করেছেন তা সাবেকি ধাঁচের। দেবী উমার সঙ্গে উপরের ধাপে রয়েছেন তাঁর দুই কন্যা, লক্ষী এবং সরস্বতী। নিচের ধাপে রয়েছেন কার্তিক এবং গণেশ। দেবী দুর্গার পায়ের কাছে দু’জন অসুরকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে একজন দেবীর পায়ের কাছে পড়ে রয়েছেন। অন্যজন সিংহের পিঠে চেপে দেব সেনাপতি কার্তিকের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় রয়েছেন। আর এই অসুরের মুখের সঙ্গে অনেকেই মিল খুঁজে পাচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। আর ‘ট্রাম্পরূপী’ এই অসুরকে একবার সচক্ষে দেখার জন্য এবং নিজেদের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করার জন্য ভিড় জমছে এই পুজো প্যান্ডেলে। ভারতীয় পুরাণ মতে অসুরেরা সবসময় দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। মহিষাসুরের আগে দেবী দুর্গার হাতে মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুর বধ হয়েছিলেন। ভগবত পুরাণ অনুসারে বিষ্ণুর দুই কানের ময়লা থেকে এই দুই অসুরের জন্ম। অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও অত্যাচারী মধু ও কৈটভ, ব্রহ্মার থেকে বেদ হরণ করেছিলেন বলে বলা হয়। পুরাণ মতে, এদের সঙ্গে কয়েক হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করেও স্বয়ং বিষ্ণু তাঁদের পরাজিত করতে পারেননি। তখন আদ্যাশক্তি মহামায়া রূপে দুর্গা অবতীর্ণ হন। এখানে দেবী নিজে অস্ত্র ধারণ করে মধু ও কৈটভকে হত্যা করেননি। তিনি দুই অসুরের সামনে মায়াজাল বিস্তার করে তাঁদের হত্যার পথ সহজ করেন। হিন্দু শাস্ত্রের এই ইতিহাসই এবছর খাগড়া শ্মশানঘাট দুর্গাপুজো কমিটির মূল থিম।





