গৌতম বিশ্বাস
পরিব্রাজক
ভারতে ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ সহ পঞ্চকেদার শিবের কথা পুরাণে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ ছাড়াও ছোট-বড় বহু শিব মন্দির রয়েছে ভারতের কোণে কোণে।সব শিবমন্দিরের অবস্থানের কথা সাধারণের জানা সম্ভবও নয়। অথচ মন্দিরগুলি খুবই জাগ্রত। সেই সব অজানা মন্দিরের মধ্যে অন্যতম হল রাজস্থানের অচলেশ্বর শিবমন্দির। এই জাগ্রত শিব মন্দিরের আশ্চর্যজনক ক্ষমতা থাকায় ভক্তরা খুবই আকৃষ্ট হন। জানা গেল রাজস্থানের এই শিব মন্দিরে রয়েছে শিবের ডান পায়ের বুড়ো আঙুল। শিবের এই বুড়ো আঙুলকেই এখানে ভক্তি ভরে নিত্য পুজো করা হয়। এই মন্দিরটির অবস্থান রাজস্থানের শৈল শহর মাউন্ট আবু থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে, নির্জন অচলগড় পাহাড়ের পাদদেশে।অচলগড় পাহাড়ের একটি পুরনো কেল্লার পাশেই এই অচলেশ্বর মন্দিরের অবস্থান। ভারতের এটিই একমাত্র মন্দির, যেখানে শিবের মূর্তি বা শিবলিঙ্গ নয়, তাঁর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের পুজো করা হয়। এই মন্দিরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়বে পঞ্চধাতুর এক বিশাল নন্দীর মূর্তির উপর। মূর্তিটির ওজন ৪ টন। মন্দিরের গর্ভগৃহে অবস্থিত একটি পাতাল কূপের ভিতর শিবের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের চিহ্ন স্বরুপ একটি প্রস্তরখণ্ড প্রকট রয়েছে। এঁকে স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গ হিসেবে নিত্য পুজো করা হয়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এখানকার এই পর্বতটি মহাদেবের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের কারণেই স্থায়ীত্ব পেয়েছে। শিবের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ না-থাকলে এই সমস্ত মন্দির ধ্বংস হয়ে যেত অনেক আগেই। শুধু তাই নয়, শিবের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ সম্পর্কেও এখানে নানা চমৎকার কাহিনি প্রচলিত আছে। মনে করা হয় এই সামান্য বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠই সম্পূর্ণ মাউন্ট আবুকে ধরে রেখেছে। যেদিন এই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ লুপ্ত হবে সেদিন মাউন্ট আবুও ধ্বংস হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, স্কন্দ পুরাণ মতে বারাণসী যেমন শিবের নগরী, মাউন্ট আবু তেমনই শিবের উপনগরী। আরও জানা যায়, যে পাতাল কূপের মধ্যে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ রয়েছে সেই কূপের মধ্যে। কূপের জল যেমন কখনো শুকিয়ে যায় না। তেমনই শত শত কলসি জল ঢাললেও কূপটি কখনো ভরতি হয় না। এমনকি শিবের অভিষেকর জলও এখানে জমা হয় না। এই জল কোথায় যায়, তা এখনও জানা যায়নি।এই পাতাল কূপটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, একদা অর্বুদ পর্বতে স্থিত নন্দীবর্ধন নড়তে শুরু করে। এর ফলে হিমালয়ে তপস্যায় মগ্ন শিবের তপস্যায় বিঘ্ন ঘটে এবং তাঁর তপস্যা ভঙ্গ হয়। এই পর্বতে তখন শিবের বড় প্রিয় নন্দী মহারাজ ছিলেন। নন্দী মহারাজকে রক্ষা করার জন্য হিমালয় থেকেই শিব নিজের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠকে অর্বুদ পর্বত পর্যন্ত প্রসারিত করেন এবং পর্বতকে স্থির করে দেন। সেই পুরাণ যুগ থেকেই শিবের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এই পর্বতকে ধরে রেখেছে। এই মন্দিরে বহু প্রাচীন একটি বড় চাঁপা গাছ রয়েছে। গাছটি দেখেই মন্দিরের বয়স আন্দাজ করা যায়। মন্দিরের শিল্পকলা যেমনই অদ্ভূত আবার তেমনই বড় সুন্দর।অনেকটা পরিসর নিয়ে অচলেশ্বর শিবমন্দিরের অবস্থান।বর্তমানে যেখানে বিখ্যাত শৈলশহর মাউন্ট আবু অবস্থিত, পৌরাণিক যুগে সেখানেই ছিল বিশাল ব্রহ্ম খাদ। এর তীরেই থাকতেন বশিষ্ঠ মুনি।একদিন ঘটনাচক্রে তাঁর কামধেনু ঘাস খাওয়ার সময় সেই ব্রহ্ম খাদে পড়ে যায়। তাকে রক্ষার জন্য সরস্বতী ও গঙ্গাকে আহ্বান করেন বশিষ্ঠ মুনি। এর পর সেই খাদে জলে ভরে উঠে জমির সমান্তরাল হয়ে যায়। জলের বৃদ্ধিতে কামধেনু ভেসে ওঠে এবং জমির উপরিভাগে উঠতে সক্ষম হয়। আরও একবার এমন ঘটনা ঘটলে স্বয়ং বশিষ্ঠ মুনি হিমালয়ের কাছে অনুরোধ করেন খাদটি জলে ভরে দেওয়ার জন্য। মুনির অনুরোধ স্বীকার করে হিমালয় নিজের প্রিয় পুত্র নন্দী বর্ধনকে সেখানে যাওয়ার আদেশ দেন। অর্বুদ নাগ নন্দী বর্ধনকে উড়িয়ে ব্রহ্ম খাদের পাশে বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে নিয়ে যান। সারা বছর যাতে ব্রহ্ম খাদে জল থাকে তার ব্যবস্থাও করেন।আশ্রমে নন্দী বর্ধন বশিষ্ঠ মুনির কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন যে, তাঁর ওপর সপ্ত ঋষির আশ্রম গড়তে হবে এবং পাহাড় হতে হবে সুন্দর ও বনস্পতিতে পরিপূর্ণ। বশিষ্ঠ মুনি তাঁকে সেই আশীর্বাদই দেন। এর পাশাপাশি অর্বুদ নাগ আরও একটি বর চাইলেন বশিষ্ঠ মুনির কাছে—এই পর্বতের নাম হতে হবে তাঁরই নামে। এর পর থেকে আবু নামে বিখ্যাত হন নন্দী বর্ধন। বরদান লাভ করার পর নন্দী বর্ধন খাদের মধ্যে নামেন এবং নীচে বসে যেতে থাকেন। শুধু তাঁর নাক ও তার উপরের অংশ জমির ওপরে থাকে। এটিই আজ আবু পর্বত নামে পরিচিত। কিন্তু এর পরও নন্দী বর্ধন স্থির থাকতে পারেন না। তখন বশিষ্ঠ মুনির অনুরোধে শিব নিজের ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রসারিত করে এই পর্বতকে স্থির করে দেন। এর পরই এই পাহাড়ের নাম হয় অচলগঢ়। এই ঘটনার পর থেকেই অচলেশ্বর মহাদেব রূপে এখানে শিবের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের পুজো করা শুরু হয়।যা আজও হয়ে চলেছে মহাসমারোহে। কথিত আছে, এই মন্দিরে যে ভক্তরা আসেন এবং শিবলিঙ্গের সামনে প্রণাম করেন, তাদের সমস্ত ইচ্ছা পূরণ হয়। এছাড়াও, যদি কেউ তার পছন্দের পাত্র বা পাত্রীকে বিয়ে করতে চায়, তবে এখানে শিবলিঙ্গের দর্শন করলেই তার ইচ্ছা পূরণ হয়। এছাড়াও এই মন্দিরটি একটি অলৌকিক ঘটনার জন্য বিখ্যাত। রাজস্থানের ধোলপুরের অচলেশ্বর মহাদেব মন্দিরের শিবলিঙ্গ দিনে তিনবার রং বদলায়। সকালে এর রং লাল হয়। বিকেলে শিবলিঙ্গের রং জাফরানের মতো হয়ে যায়। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাল রঙের শিবলিঙ্গই কালো রঙে পরিণত হয়। মাউণ্ট আবু হল রাজস্থানের একটি শৈল শহর। হাওড়া থেকে ট্রেনে করে দিল্লি অথবা আমেদাবাদ এবং সেখান থেকে আবু রোড নামতে হবে। আবু রোড থেকে মাউণ্ড আবু মাত্র ৪৫ মিনিটের গাড়ির রাস্তা। দিনে পৌঁছনো ভালো। থাকার জন্য বহু হোটেল আছে।





