মেরু অঞ্চলে বরফ ধীরে গতিতে গলছে। দাবি গবেষকদের। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে গলে যাচ্ছে পৃথিবীর দুই মেরুর সাগরের উপরে বিস্তৃত হিমবাহের চাদর। একই ভাবে মেরু অঞ্চলে এখন হয়তো কম গতিতে বরফ গলছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আবার দ্রুত গতিতে গলতে শুরু করবে। ইংল্যান্ডের আশঙ্কা, ধীর গতিতে বরফ গলার বিষয়টি সাময়িক। এই অধ্যায় শেষ হলে মেরু অঞ্চলের বরফ আগের চেয়ে আরও দ্রুত গতিতে গলতে শুরু করতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতার বৃদ্ধির পাশাপাশি সমুদ্রে জলস্তর বৃদ্ধি পেতে পারে। বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। বরফ গলে যাওয়ার হার যে কমেছে, তা স্থায়ী নয়। কয়েক বছর কম হারে বরফ গলবে। দ্রুত গলে যাবে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ। গবেষণা ব্রিটেনের এক্সিটার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমআর ইংল্যান্ড, জে স্ক্রিন, এসি চ্যান এবং আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএম পোলভানি। জিয়োফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘মিনিম্যাল আর্কটিক সি আইস লস ইন দ্য লাস্ট ২০ ইয়ার্স, কনসিস্ট্যান্ট উইথ ইন্টারনাল ক্লাইমেট ভ্যারিয়েবিলিটি’। ইংল্যান্ড প্রথমেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মেরু সাগরে হিমবাহ তুলনামূলক ভাবে ধীরে গলছে মানে এই নয়, যে উষ্ণায়ন নিয়ে আর সতর্ক হতে হবে না। পরিবেশ নিয়ে মানুষকে আগের মতোই সতর্ক থাকতে হবে। পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ করতে হবে। বিজ্ঞানীরা আগেই জানিয়েছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়ে যাওয়ার কারণে গ্রিন হাউস গ্যাস উৎপন্ন হয়। তার প্রভাবেই পৃথিবী জুড়ে তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুর সাগরের উপরে থাকা বরফের স্তর ধীরে ধীরে গলছে। গবেষণা বলছে, ১৯৮০-র দশক থেকে দুই মেরুর সাগরে প্রায় ১০ হাজার ঘন কিলোমিটার এলাকার বরফ গলে গিয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স’-এ এই পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা উষ্ণায়নের জন্য শুধু জীবাশ্ম জ্বালানিকেই দায়ী করেন না। ‘এল নিনো’-কেও দায়ী করেন। প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধিকে বলে এল নিনো। গবেষক ইংল্যান্ড মনে করেন, প্রকৃতির কারণেই উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুতে সাগরের উপরে থাকা হিমবাহের গলে যাওয়ার মাত্রা কমেছে। তিনি জানিয়েছেন, ‘পেসিফিক ডিকেডাল অসিলেশন’ এর অন্যতম কারণ। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কখনও কমে, কখনও বৃদ্ধি পায়। শীতল থেকে উষ্ণ আবার উষ্ণ থেকে শীতল হয়ে ওঠাকেই বলে ‘পেসিফিক ডিকেডাল অসিলেশন। পেসিফিক ডিকেডাল অসিলেশন’-এর কারণেও মেরুতে হিমবাহ গলে যাওয়ার গতি কমেছে। একই ভাবে ‘আটলান্টিক মাল্টিডিকেডাল ভ্যারিয়েবিলিটি’-ও মেরু অঞ্চলের আবহাওয়ায় প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে মেরু অঞ্চলে ঠান্ডা স্রোত প্রবাহিত হয়। সে কারণে মেরু এলাকায় বরফের গলন ধীরগতিতে হয়। গবেষণা বলছে, গত ২০ বছরে প্রতি দশকে মেরু অঞ্চলে ৩.৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বরফ গলে গিয়েছে। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই হার ছিল অনেক বেশি। ওই সময়ে প্রতি দশকে মেরু অঞ্চলে ১৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বরফ গলে গিয়েছে।
মেরুতে সমুদ্রের উপরে থাকা বরফের স্তর ধীর গতিতে গলছে বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। প্রশ্ন উঠছে, তা হলে জলবায়ুর পরিবর্তন কি ধীর গতিতে হচ্ছে? গবেষকেরা জানিয়েছেন, মেরু অঞ্চলে বরফ ধীর গতিতে গলছে মানে এই নয় যে, উষ্ণায়নও কমেছে বা জলবায়ুর পরিবর্তন ধীরে হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন যে ধীর গতিতে হচ্ছে, তার প্রমাণ বিজ্ঞানীরা পাননি। ইংল্যান্ড এবং তাঁর সহযোগীরা মনে করছেন, মেরু অঞ্চলে বরফ যে ধীর গতিতে এখন গলছে, তা সাময়িক। আগামী পাঁচ বছর হয়তো এ ভাবে ধীরে ধীরে গলবে। সেই সম্ভাবনা রয়েছে ৫০ শতাংশ। ২৫ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে, আগামী ১০ বছর এ ভাবে ধীর গতিতে গলবে মেরু অঞ্চলের বরফ। ইংল্যান্ড এই বিষয়টিকে পাহাড় থেকে বল পড়ার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘‘ ধরুন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা বল গড়িয়ে পড়ছে। যেখানে ঢাল বেশি থাকে, সেখানে বলটি দ্রুত গড়িয়ে নামতে থাকে। পাহাড়ের যে অংশ তুলনামূলক সমতল, সেখানে বলটি ধীর গতিতে নামতে থাকে। কিন্তু সর্বশেষে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে বলটিকে কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে নামতেই হবে।’’




