ম্যাঞ্চেস্টারে শতরান। ২৩৮ বলে ১০৩ রান। শুধুই উপরওয়ালাকে কৃতজ্ঞতা। ক্রিস ওকসের বল কভারে মেরে দৌড়ানোর সময় এক বার মুষ্টিবদ্ধ হাতে চিৎকার। হেলমেট খুললেন শুভমন গিল। পরিচিত উল্লাস দেখা গেল না। প্রথমে ব্যাট উঁচিয়ে ব্যাটে চুমু খেলেন। শেষে চোখ বন্ধ করে ব্যাট আকাশের দিকে তুলে ধরলেন। মুখে হাসি নেই। শতরানের উল্লাস নেই। চাপের মুখে শতরান। আউট হওয়ার পর মাথা নিচু করে ফিরলেন ভারত অধিনায়ক। দুটো ম্যাচে হার। এই টেস্ট হারলেই সিরিজ হারতে হবে। অধিনায়ক হিসাবে প্রথম টেস্ট সিরিজ। ব্যাটে রান থাকলেও জিততে পারছে না দল। চার টেস্টেই তাঁর অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন। জল্পনা। কোচ গৌতম গম্ভীরের চাপে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না শুভমন। শেষ তিন ইনিংসে রান না থাকায় চাপ শুভমনের উপর। পাহাড়প্রমাণ রানের চাপে যখন ব্যাট করতে নামলেন তখন ভারতের স্কোর শূন্য রানে ২ উইকেট। ৩১১ রান পিছিয়ে। প্রথম ওভারেই ফিরে গিয়েছেন যশস্বী জয়সওয়াল ও সাই সুদর্শন। তাড়াহুড়ো না করে শুভমন জুটি বাঁধলেন লোকেশ রাহুলের সঙ্গে। ধৈর্য ধরে উইকেট কামড়ে পড়ে থেকে শতরানই শতরান জবাব সমালোচকদের। চাপের মুখে রান করতে পারেন না শুভমন। দলের প্রয়োজনে নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক খেলা বদলে ফেলতে পারেন ভারত অধিনায়ক। জফ্রা আর্চারের একটা বাইরের দিকে যাওয়া বলে খোঁচা মারতে গিয়ে আউট হন। অফ স্টাম্পের বাইরের বল মারার লোভ সামলাতে পারেননি। ক্যাচ দু’বার পড়েছে। এক বার লিয়াম ডসন ও এক বার ওলি পোপের হাত থেকে ক্যাচ পড়েছে। তৃতীয় বার আর সুযোগ পাননি শুভমন। আউট হওয়ার পর গোটা ম্যাঞ্চেস্টারের গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছে। শুভমন সে দিকে তাকাননি। মাথা নিচু করে ফিরে গিয়েছেন সাজঘরে। ইংরেজ পেসারদের বেশ কিছু বল শুভমনের ব্যাট ঘেঁষে বেরিয়েছে। অফ স্টাম্পের বাইরে জোরালো শট খেলতে গিয়ে কয়েক বার হাওয়ায় খেলেছেন। ভারত অধিনায়ককে সবচেয়ে সমস্যায় ফেলেছেন ইংরেজ অধিনায়ক। স্টোকসের একটা বল লাফিয়ে তাঁর ডান হাতের আঙুলে লেগেছে। সেই বল গিয়ে লেগেছে হেলমেটে। যন্ত্রণায় কাতরেছেন। সামনের পায়ে ডিফেন্স করেছেন। ভয় পাননি। টেস্ট বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে লড়েছেন ভারত অধিনায়ক। ২৩৮ বলে ১০৩ রান করেও শুভমনের চোখে-মুখে হতাশা। কারণ, তিনি জানেন, লড়াই শেষ করতে পারেননি। উচ্ছ্বাসহীন মুখ।
রোহিত শর্মা সরে যাওয়ার পর, ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় টেস্ট দলের নতুন অধিনায়ক শুভমন গিল। ব্যাটার শুভমন ইংল্যান্ডের মাটিতে সফল। এশিয়ার প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ়ে ৬৫০-এর বেশি রান করার নজির গড়েছেন। প্রশ্ন উঠছে তাঁর অধিনায়কত্ব নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, অধিনায়ক শুভমন স্বাধীন ভাবে দল পরিচালনার সুযোগ না। কোচ গৌতম গম্ভীর তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করছেন? ভারতীয় দলের কোচ-অধিনায়ক সম্পর্ক প্রাক্তন ক্রিকেটারের আলোচনাতে। ইংল্যান্ডের দুই প্রাক্তন অধিনায়ক নাসের হুসেন এবং মাইকেল ভন। ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সুনীল গাভাসকার। গাভাসকার বলেন, ‘‘কোচ দলকে টেস্ট ম্যাচের জন্য তৈরি করে দেবেন। দল খেলতে নামলে দায়িত্ব অধিনায়কের। মাঠে অধিনায়ককেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় পরিস্থিতি বুঝে। সেখানে কোচের ভূমিকা থাকে না। কোন ১১ জন খেলবে, ব্যাটিং অর্ডার কেমন হবে— এ সব নিয়ে কোচ এবং অধিনায়কের মধ্যে আলোচনা হবে নিশ্চয়ই। দিনের খেলা শুরুর আগে, বিরতিতে বা খেলা শেষের পর কোচ পরামর্শ দিতে পারেন। শুভমন হয়তো আরও আট-দশ বছর খেলবে। এখন ওর বয়স ২৪ বা ২৫। ওকে নিজের দল তৈরি করে নিতে হবে। এখন বয়স কম। হয়তো তাই আত্মবিশ্বাসের একটু অভাব রয়েছে। কোচ গম্ভীর বেশ কঠিন চরিত্রের। অধিনায়কত্বের শুরুতে শুভমনের কাছে এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দিনের শেষে দলটা অধিনায়কের। ও যদি শার্দূল ঠাকুর বা কুলদীপ যাদবকে প্রথম একাদশে চায়, তা হলে তাদেরই খেলানো উচিত। কারণ ও অধিনায়ক। সকলেই শুভমন এবং ওর নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলবে। দলের ভিতরের সব কিছু বাইরে আসে না। জানাও সম্ভব নয়। তবে দায় অধিনায়কেরই। কারণ, মাঠের লড়াইয়ে সেই দলকে নেতৃত্ব দেয়। আমাদের সময় কোচ থাকত না। প্রাক্তন ক্রিকেটারেরা ম্যানেজার বা সহকারী ম্যানেজার হতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলা অনেক সহজ ছিল। বিরতিতে বা খেলার আগে-পরে পরামর্শ নেওয়া যেত। তাই কোচ-অধিনায়কের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, এটা আমার পক্ষে বলা একটু কঠিন। আমি অধিনায়ক থাকার সময় তেমন কোনও প্রাক্তন ক্রিকেটারকে দলের সঙ্গে পাইনি। উইং কমান্ডার দুরানি বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর ছিলেন। এক বার এরাপল্লি প্রসন্নকে পেয়েছিলাম। তিনি দারুণ সাহায্য করেছিলেন।’’ ভন বলেন, ‘‘টেস্ট ক্রিকেটে কোচিংয়ের সঙ্গে সাদা বলের ক্রিকেটের কোচিংকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। যেমন ব্রেন্ডন ম্যাকালাম অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার মানুষ। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে চলে। টেস্ট ক্রিকেট দীর্ঘ সময়ের খেলা। শক্ত খেলা। প্রতি দিন ক্রিকেটারদের দিকে আলাদা আলাদা ভাবে নজর দিতে হয়। টেস্টে ম্যান ম্যানেজমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। কার কী ভূমিকা হবে, সেটা ঠিকমতো বুঝিয়ে দিতে হয়। ক্রিকেটারদের মানসিকতা ঠিক রাখতে হয়। মাঠে নেমে তারা যাতে খেলাটা উপভোগ করতে পারে, সেটা দেখতে হয়। টি-টোয়েন্টি বা এক দিনের ক্রিকেটের মতো ভাবলে হবে না। গম্ভীর সাদা বলের ক্রিকেটের কোচ হিসাবে বেশ ভাল। কিন্তু টেস্টের ক্ষেত্রে আরও উন্নতি দরকার। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের উদাহরণ দিতে পারি। দিন ধরে ধরে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে। কোচ হিসাবে ফ্লাওয়ার কেমন, সেটা সকলে দেখেছেন। গত ২০ বছরে ফ্লাওয়ারই সম্ভবত সেরা কোচ।’’ ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক হুসেনের কথায়, ‘‘রিকি পন্টিং, ব্রায়ান লারা, গ্রেম স্মিথের কথা বলতে পারি। এখনকার অধিনায়কদের মধ্যে বেন স্টোকস, প্যাট কামিন্সের কথা বলব। অধিনায়ক হিসাবে এরা সাজঘরেও যথেষ্ট সাহসী। অধিনায়ককে বোঝাতে হয়, দলটা তার। শুভমন এই সিরিজ় থেকে অনেক কিছু শিখবে। অধিনায়কত্বও শিখতে হয়। অধিনায়ককে নিজের উপস্থিতি বোঝাতে হয়। কেমন দল নিয়ে খেলতে চাইছে, সেটা পরিষ্কার করে বলতে হয়। না হলে শক্তিশালী অধিনায়ক হওয়া কঠিন। শুভমন এখনও সেই পর্যায় পৌঁছোতে পারেনি।’’ ম্যাঞ্চেস্টার টেস্টের আগে আকাশদীপ চোট পাওয়ায় দলে নেওয়া হয়েছে অংশুল কম্বোজকে। গম্ভীরের ইচ্ছাতেই কম্বোজ টেস্ট দলে এসেছেন। ম্যাঞ্চেস্টারে হার বাঁচানোর লড়াই শুভমনদের, শেষ দিন আবহাওয়া সঙ্গ দেবে ভারতকে? গম্ভীর কোচ হওয়ার পর ভারতীয় দল এই নিয়ে চতুর্থ টেস্ট সিরিজ খেলছে। পারফরম্যান্স বেশ খারাপ। প্রথম সিরিজ়ে দেশের মাটিতে বাংলাদেশকে ২-০ হারিয়েছিল ভারত। ভারতে এসে ভারতকে ৩-০ ম্যাচে হারিয়ে সিরিজ জিতে নিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড।অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ১-৩ হার। চলতি সিরিজে ১-২ ম্যাচে পিছিয়ে। ওল্ড ট্রাফোর্ডে চতুর্থ টেস্টে জয়ের কোনও সম্ভাবনা নেই। হার বাঁচানোই খুব কঠিন। এই সিরিজের ফল কোচ গম্ভীরের ভবিষ্যৎ আবার ঘুরিয়ে দিতেই পারে। অধিনায়কদের উপর দাদাগিরির অভিযোগ।

ইংল্যান্ডের মাটিতে নজির শুভমন গিলের। ভারতের তৃতীয় ব্যাটার হিসাবে এক টেস্ট সিরিজ়ে ৭০০র বেশি রান করলেন শুভমন। সুনীল গাভাসকার এবং যশস্বী জয়সওয়ালের কৃতিত্ব স্পর্শ করলেন ভারতীয় দলের অধিনায়ক। ম্যাঞ্চেস্টারে চলতি সিরিজ়ের চতুর্থ শতরান করেছেন শুভমন। একটি টেস্ট সিরিজ়ে ৭০০ রান করার মাইলফলক স্পর্শ। ভারতের তৃতীয় ব্যাটার হিসাবে এই নজির। ১৯৭১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের মাটিতে টেস্ট সিরিজ়ে ৭৭৪ রান করেছিলেন গাভাসকার। ১৯৭৮-৭৯ মরসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধেই টেস্ট সিরিজ়ে ৭৩২ রান করেন। ২০২৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজ়ে ৭১২ রান করেন যশস্বী। শুভমনও টপকে গেলেন ২০১৪ সালে এক টেস্ট সিরিজ়ে বিরাট কোহলির ৬৯২ রানের নজির।
ভারতের প্রথম অধিনায়ক হিসাবে বিদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজে ৭০০-র বেশি রান করার নজির গড়লেন শুভমন। সব মিলিয়ে তিনি ভারতের দ্বিতীয় টেস্ট অধিনায়ক। গাভাসকার অধিনায়ক হিসাবে ঘরের মাঠে ১৯৭৮-৭৯ মরসুমে এক সিরিজ়ে ৭০০-র বেশি রান করেন। বিশ্বের অষ্টম টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে এক টেস্ট সিরিজে ৭০০-র বেশি রান করলেন শুভমন। এই কৃতিত্ব রয়েছে ডন ব্র্যাডম্যান (দু’বার), গারফিল্ড সোবার্স, গ্রেগ চ্যাপেল, গাওস্কর, ডেভিড গাওয়ার, গ্রাহাম গুচ এবং গ্রেম স্মিথের। বিশ্বের তৃতীয় টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে এক টেস্ট সিরিজ়ে চারটি শতরান। ব্র্যাডম্যান ১৯৪৭-৪৮ মরসুমে ভারতের বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টের সিরিজে চারটি শতরান করেছিলেন। গাভাসকার ১৯৭৮-৭৯ মরসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ছয় টেস্টের সিরিজ়ে চারটি শতরান করেছিলেন। ৩৫ বছর পর ম্যাঞ্চেস্টারে ভারতীয় হিসাবে টেস্টে শতরান করলেন শুভমন। ১৯৯০ সালে এই মাঠে শেষ ভারতীয় ব্যাটার হিসাবে শতরান করেন শচীন তেন্ডুলকর।
‘সেনা’ দেশের (দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়াকে এক সঙ্গে ‘সেনা’ বলা হয়) মাটিতে এক টেস্ট সিরিজ়ে সবচেয়ে বেশি রান ছিল সোবার্সের। তিনি করেছিলেন ৭২২ রান। নজির স্পর্শ করলেন শুভমন। ম্যাঞ্চেস্টারে ১০৩ রানে ইনিংসের পর শুভমনেরও চলতি সিরিজ়ে ৭২২ রান হল। পরের টেস্টে আর ১ রান করলেই তিনি টপকে যাবেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন অলরাউন্ডারকে।
শতরানে জাদেজা-ওয়াশিংটনের অদম্য লড়াই, স্টোকসের প্রস্তাবে ম্যাঞ্চেস্টারে ম্যাচ ড্র। সসম্মানে ম্যাচ বাঁচাল ভারত, ১৪৩ ওভার ব্যাট করে ইংল্যান্ডের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিয়ে সিরিজে টিকে রইলেন শুভমনেরা। ছক্কা মেরে শতরান করলেন জাদেজা। জীবনের প্রথম সেঞ্চুরি করলেন ওয়াশিংটন সুন্দর।




