১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই। তখনও জন্ম হয়নি তৃণমূলের। যুব কংগ্রেসের ডাকে মহাকরণ অভিযানের নেতৃত্ব ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের ক্ষমতায় বাম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। সিপিএমের বিরুদ্ধে ভোটে রিগিংয়ের অভিযোগ তুলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে মহাকরণ অভিযান করে যুব কংগ্রেস। রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক সচিবালয়ের উদ্দেশে ওই অভিযান রুখতে তৎপর কলকাতা পুলিশ। বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ব্যারিকেড। পুলিশি বাধা ঠেকাতে শুরু হয় ইট-পাথরবৃষ্টি। বিক্ষোভকারীদের হঠাতে পাল্টা কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয় মেয়ো রোড-রেড রোডের মোড়ে। বোমাও পড়ে। সারা কলকাতা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। পুলিশের ভ্যানে অগ্নি সংযোগের মতো ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ। বিক্ষোভকারীরা এগোতে থাকে, পিছু হঠতে শুরু করে পুলিশ। এরপর আচমকা গুলি চালাতে শুরু করে মরিয়া পুলিশবাহিনী। আর তাতেই প্রাণ যায় ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর। মৃত্যু হয়, বন্দনা দাস, মুরারী চক্রবর্তী, রতন মণ্ডল, কল্যান ব্যানার্জি, বিশ্বনাথ রায়, অসীম দাস, কেশব বৈরাগী, শ্রীকান্ত শর্মা, দিলীপ দাস, রঞ্জিত দাস, প্রদীপ দাস, মহম্মদ খালেক, ইনু-র। পরবর্তীকালে কংগ্রেসিরা এই ১৩ জনকে ‘শহিদ’ নামে ডাকতে শুরু করেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে চলে গুলি। নিহত ১৩ জন যুব কংগ্রেসের নেতা-কর্মী। উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। কার নির্দেশে পুলিশ গুলি চালাল, সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পরবর্তীকালে এই মামলায় বুদ্ধদেবকে ক্নিনচিট দেয় সিবিআই। দু’দশক ধরে ২১ জুলাই তারিখটি তৃণমূলের কাছে অঘোষিত বার্ষিক রাজনৈতিক সমাবেশ। ২০১১ সালের ১৩ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরিয়েছিল। ৩৪ বছরের বাম শাসনের পালাবদল ঘটিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল। তবে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তাঁরা আলাদা করে ‘বিজয় উৎসব’ পালন করবেন না। জয়ের উদ্যাপন হবে ২১ জুলাই ‘শহিদ তর্পণের’ দিন। আবার গত লোকসভা ভোটে বাংলায় ২৯টি আসন জেতার পর মমতা জানান, উদ্যাপন করা হবে ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে। নাটকীয় ঘটনা?

২০২৬ এর ভোটের আগে শেষ ২১ শে জুলাই। মঞ্চে বক্তা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মমতা বলেন, ‘‘আমি সম্মান জানাই সমস্ত শহিদের পরিবারকে। ঝন্টু আলি শেখের বাবা সবুজ আলি শেখ এসেছেন। বিতান অধিকারীর বাবা বীরেশ্বর অধিকারী ও মা মায়া অধিকারী এসেছেন। তাঁদের সম্মান জানাই। এই সংগ্রাম চলবে, সেদিন শেষ হবে যেদিন দিল্লিতে পরিবর্তন হবে। আর বামেদের কথা ছেড়ে দিন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে টাকা খেয়ে বসে আছে।আমরা এখানে ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমিয়েছে। এটা বাংলার মানুষের গর্ব। আপনারা ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়ে কী ভেবেছিলেন? বাংলা করতে পারে না? আমরা পেরেছি। কেন্দ্রের বঞ্চনার সত্ত্বেও তাঁর সরকার বাংলার মানুষের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক জনহিতকর প্রকল্প রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আবাস প্রকল্পে গরিবদের বাড়ি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মস্থানের উন্নতিকল্পে কাজ করেছে তৃণমূল সরকার। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিজেপির চক্রান্ত তো চলছে। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। মানুষের কথা বলে না তারা। নির্বাচনের আগে প্রথম সার্কুলার ভারত সরকার পাঠিয়েছে। এক হাজারের উপর লোককে কাউকে মধ্যপ্রদেশ, কাউকে ওড়িশা তো কাউকে রাজস্থানের জেলে ভরা হয়েছে। বাংলা ভাষায় নাকি কথা বলা যাবে না! কে মাছ খাবে, কে মাংস খাবে, কে ডিম খাবে ওরা ঠিক করে দেবে! বিজেপির এক জন নেতা বলছেন এখানে নাকি ১৭ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে। মোট কত রোহিঙ্গা? আপনি এত জনকে বাংলাতেই বা পেলেন কোথায়? মতুয়া ভাইদের উপর অত্যাচার হচ্ছে। কী জবাব দেবে তার বিজেপি? যখন ওড়িশায় ছাত্রীর সম্মাননষ্ট হল, যখন ওড়িশার রাস্তায় ছাত্রীর গায়ে আগুন ধরানো হয়, তার উত্তর কে দেবে? উত্তর দিতে হবে। বাংলায় কথা বলতে ভয় পান আপনারা। বাংলা রবন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, নজরুলের জন্ম দিয়েছে। বাংলা থেকেই লেখা হয়েছে,জাতীয় সঙ্গীত। বাংলা ভাষার উপর সন্ত্রাস চলছে কেন? বাংলা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। নবজাগরণ হয়েছে বাংলা থেকেই। বাংলার মাটি দুর্বৃত্তদের হবে না। বাংলার মানুষকে যদি বাংলা বলার জন্য বাইরে গ্রেফতার করা হয় এই লড়াই কিন্তু দিল্লিতে হবে। আমি কিন্তু ছাড়ার লোক নেই। মনে আছে, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কথা? দরকারে আবার ভাষা আন্দোলন শুরু হবে।’’

‘‘সর্বনাশা আইন বাতিল করব। বাংলায় হাত দিলে কমিশন ঘেরাও করব আমরা। কিছুতেই বাংলা, বাঙালির উপর অত্যাচার মানব না। প্রয়োজনে ফের ভাষা আন্দোলন হবে।আমার রাজ্যে থাকবে আর পোস্টার ছিঁড়বে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী আপনি অসম সামলাতে পারছেন না। আর বাংলায় নাক গলাচ্ছেন। সুস্মিতা দেবকে বলব দরকার হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। দরকার হলে আমরা সবাই যাব। দেখব কতজনকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখেন। বাংলাভাষীদের উপর অত্য়াচার হলে ছেড়ে দেব না। আমি ধরলে ছাড়ি না। আমাদের আটকে রাখা যায় না। রোখা যায় না। আগে কলকাতা কী ছিল, আজকে কী হয়েছে। আগে বাংলা কী ছিল, আজকে কী ছিল। তুমি জ্বলে যাও আর লুচির মতো ফুলে যাও। আমি লড়াই থেকে বিচ্যুত হব না। আগামী ২৬ জুলাই তৈরি হোন। আগামী ২৭ জুলাই নানুর দিবস থেকে রাজ্য জুড়ে সব ভাষাভাষীদের নিয়ে প্রতি শনি ও রবিবার মিছিল, মিটিং করুন। কাজ করবে রাজ্য। আর ফিতে কাটবেন আপনি। দু’টি ফ্লাইওভার উদ্বোধন করলেন, বললেন না রাজ্য টাকা দিচ্ছে। মনে নেই হাজরা মোড়ে সেদিন আমায় মারতে মারতে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন। মাথা ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। শুধু এক্সারসাইজ করি বলে আর হাঁটি বলে এখনও চলছি। আপনাদের ১০ জনকে আমি একাই লড়ে নিতে পারি। এবারে খেলায় বোল্ড আউট করতে হবে। একেবারে ছক্কা মারতে হবে। এবার কেন বৃষ্টি হয়নি বলুন তো? এবার নতুন খেলা শুরু হয়েছে। চোখ দিয়ে জল নয়, এবার আগুন বেরবে। ওদের না আছে জ্ঞান, না আছে গম্যি। সোশাল মিডিয়ায় যা দেয় তা দেখে বিশ্বাস করবেন না। আজ থেকে শুরু হল আন্দোলন। চলবে আগামী নির্বাচনের ফলপ্রকাশ পর্যন্ত।”

বিজেপিকে আক্রমণ করে অভিষেক বলেন, ‘‘বিজেপিকে প্রথম বাংলাবিরোধী আমরা বলেছি। আমরা জনতার গর্জনের ডাক দিয়েছিলাম। শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়। সেটাই বিজেপির আসল চরিত্র। বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি নিয়ে তাচ্ছিল্য করে, ময়দানে জিততে না পেরে নির্লজ্জের মতো গরিব মানুষকে মারার পরিকল্পনা করে। টাকা আটকে রাখে। ওদের একটাই পরিচয়, বাংলাবিরোধী। আমরা বাংলায় কথা বলি। ১০০ বার বলব। গর্ব করে বলব। ২০২৬ সালের পর বিজেপিকে দিয়েও ‘জয় বাংলা’ বলাব। লিখে রাখুন। আমরা মেরুদণ্ড বিক্রি করব না। গলা কেটে দিলেও ‘জয় বাংলা’ বেরোবে। এক দিকে ইডিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এক দিকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দিচ্ছে। দু’টি ই-কে কাজে লাগাচ্ছে। কেউ ভয় পাবেন না। বাংলার মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চায়। বিজেপিকে আমরা ছাব্বিশের পর ওই ক্যাম্পে নিয়ে যাব। বিজেপিকে কোনও জায়গা ছাড়া চলবে না।’’

তৃণমূল সংসদ তথা টলিপাড়ার প্রথম সারির নায়ক-প্রযোজক দেব। স্কটল্যান্ড থেকে সরাসরি কলকাতায় পা রেখেই ২১ জুলাইয়ের সমাবেশে হাজির দেব। অভিনেতাকে দেখা গেল কুল অ্যান্ড ক্যাজুয়াল লুকেই। কালো শার্ট, ব্লু ডেনিম এবং পায়ে সাদা স্নিকার্সে। সঙ্গে চোখে গাঢ় রঙের রোদচশমা। খানিক অগোছালো চুল ঠিক করতে করতেই সমাবেশে জড়ো হওয়া দলীয় কর্মীদের দিকে হাত নেড়ে দ্রুত মঞ্চের দিকে হেঁটে গেলেন দেব। লন্ডনে প্রায় দু’সপ্তাহের মতো প্রজাপতি ২ এর শুটিং সেরে মা,বাবা বোনের সঙ্গে স্কটল্যান্ডে ছুটি কাটাতে হাজির হয়েছিলেন দেব। স্কটল্যান্ডের নানান জায়গায় নিজের পরিবারের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন ধূমকেতু র নায়ক। স্কটল্যান্ডে দেবের সঙ্গে ছিলেন তাঁর গোটা পরিবার। একুশে জুলাইরাজনীতিবিদ ও বিনোদন তারকাদের সমাবেশ৷ মুখ্যমন্ত্রীর ডাকে সেলেবদের ‘ফুল অ্যাটেন্ডেস’। প্রতিবারই টলিপাড়ার এক ঝাঁক তারকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সকালে টলিপাড়ার অভিনেতা-অভিনেত্রীরা হাজির হন নন্দনে। সেখান থেকে একসঙ্গে সমাবেশে পৌঁছনোর প্রস্তুতি। অভিনেত্রী তথা শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সুভদ্রা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি তো বটেই, থাকছেন আরও অনেক তারকা।

মঞ্চে অভিনেত্রী তথা সাংসদ জুন মালিয়া, সাংসদ সায়নী, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধায়ক তথা অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিনেতা গৌরব চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রী দেবলীনা কুমারের দেখা মিলবে। ছোটপড়ার অভিনেত্রী তৃণা সাহা, সোমা চক্রবর্তী, তিয়াশা লেপচা, সোহেল দত্ত, শ্রীতমা ভট্টাচার্য, সোনামণি সাহা, ভরতকল, তরিতা, রিমঝিমও মিত্র, অরিন্দম শীল।




