১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই। ভয়ংকর স্মৃতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মতলাতেই শহিদ দিবস পালন করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ওরা কাউকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিত না। আমাদের দাবি ছিল, সচিত্র পরিচয়পত্র। সেই সময় আমাদের বিরাট আন্দোলন হয়েছিল। সিপিএমের কোনও ক্ষমতা ছিল না তা থামানোর। তাই গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের জন্য ওরা গুলি চালিয়েছিল। ১৩ জন মারা যান। ১৫০ আহত হন। ৩৩ বছর ধরে এই জায়গায় প্রোগাম করি। কারণ, এখানেই অনেক প্রাণ লুটিয়ে পড়েছিল, রক্তের বন্যা বয়েছিল। আমাদের এই প্রোগাম নিয়ে অনেকের আপত্তি। কিন্তু তারা যখন প্রোগ্রাম করে পুলিশের অনুমতি নেয়? অনুমতি না মিললেও তারা জমায়েত করে। আমরা তোমাদের মতো প্যারালাল প্রোগ্রাম করি?” এক্সহ্যান্ডেলে বীরশহিদদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। রাস্তায় থাকছে সাড়ে চার হাজার পুলিশ। শহরে ত্রিস্তুরীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা। মঞ্চ এবং সংলগ্ন চত্ত্বর জুড়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন। পুলিশ সূত্রে খবর, মূল মঞ্চ ভিভিআইপি জোনের মধ্যে থাকবে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও যুগ্ম পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার আধিকারিকরা থাকবেন। ৩০ জন ডিসি পদমর্যাদার অফিসার, ৭০জন এসি, ১৫০ জন ইন্সপেক্টর থাকছেন ধর্মতলা চত্বর জুড়ে। শিয়ালদহ, হাওড়া, শ্যামবাজার, গিরিশপার্ক, পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট থেকে বেশ কয়েকটি বড় মিছিল ধর্মতলা মঞ্চের দিকে আসবে। মিছিলে যাতে সুষ্ঠভাবে আসতে পারে তার জন্য পুলিশের নজরদারি। সমাবেশে যোগ দিতে আসা সমস্ত মিছিলকে এসকর্ট করবেন একজন করে এসি এবং ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিক। শহরজুড়ে থাকছে ৩২টি হেল্প ডেস্ক। ধর্মতলা চত্বর মুড়ে ফেলা হচ্ছে একাধিক ওয়াচ টাওয়ারে। কুইক রেসপন্স টিম ও পুলিশের সিসিটিভি ক্যামেরা, সভা ঘিরে অতিরিক্ত সিসিটিভির ক্যামেরাও লাগানো হয়েছে। অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম থেকে নজরদারি চালাবে লালবাজার। বিভিন্ন পয়েন্টে থাকবে মেডিক্যাল ক্যাম্প। কলকাতা পুলিশের বেশকিছু অ্যাম্বুলেন্সও থাকছে। শহিদ দিবসের দিন নিত্যযাত্রীদের সহায়তরা জন্য পুলিশের দুটি মোবাইল নম্বর চালু করা হয়েছে। রাস্তায় বেড়িয়ে কোথাও কোনও সমস্যায় পড়লে নিত্যযাত্রীরা ৯৮৩০৮১১১১১/৯৮৩০০১০০০০ এই নম্বরে ফোন করতে পারবেন। টোল ফ্রি নম্বর ১০৭৩। ১২টি রেডিও ফ্লাইং স্কোয়াড ও পর্যাপ্ত সংখ্যাক পিসিআর ভ্যান থাকছে। জলপথেও নজরদারি। কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা টিম ও ডুবুরিরা থাকছে। একুশে জুলাই বৃষ্টির ভ্রুকুটি। বৃষ্টির জল নামাতে প্রস্তুত কলকাতা পুরসভার নিকাশি দপ্তর। সভাস্থল ও তার আশপাশে ১০টি ওয়াটার পকেট চিহ্নিত করা হয়েছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের উপর গিরিশ পার্ক মোড়, মহম্মদ আলি পার্ক, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ও এমজি রোডের সংযোগস্থল, কোলুটোলা মোড়, ইডেন হাসপাতালে থাকছে গালিপিট এমটিয়ার, জেড কাম সাকশান মেশিন। বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট, সিআর এভিনিউয়ে সংযোগস্থলে থাকছে গালিপিট এমটিয়ার মেশিন, ব্লো ভ্যাক মেশিন। যোগাযোগ ভবনের কাছে চাঁদনি মেট্রো স্টেশনের বাইরে, ভিক্টোরিয়া হাউজের কাছে থাকছে গালিপিট এমটিয়ার মেশিন। ভারতীয় জাদুঘর, পিটিএসের কাছেও রাখা হয়েছে জেড কাম সাকশন মেশিন, গালিপিট এমটিয়ার, ব্লো ভ্যাক মেশিন। যাতে বৃষ্টি হলে দ্রুত জল নামানো যায়। সভা শেষ হলে পুরসভার কর্মীরা দ্রুত শহরকে জঞ্জালমুক্ত করে তুলবে।

আদালতে উত্থাপিত হয়েছিল ধর্মতলায় তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের বার্ষিক সভার প্রসঙ্গ। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে দু’বারই আদালত বিজেপি-কে সভা করার অনুমতি দিয়েছিল। প্রথমটি ২০১৬ সালে, দ্বিতীয়টি গত লোকসভা ভোটের আগের বছর ২০২৩ সালে। এই প্রথম রাস্তা আটকে’২১ জুলাইয়ের সভা ঘিরে কড়া পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাই কোর্টের। বামপন্থী আইনজীবী সংগঠনের দায়ের করা মামলায় শাসক তৃণমূলের আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ বলেছেন, ‘‘আগামী বছর থেকে শহিদ মিনার, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড বা অন্য কোথাও সভা করা যায় কি না, সেটা আপনাদের ভাবতে হবে।’’ নির্দেশনামায় কলকাতা পুলিশকে কিছু শর্ত দিয়েছে আদালত। জনতাকে যাতে ভোগান্তির মধ্যে না-পড়তে হয় তার জন্য। ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সভা করেছিলেন ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনের রাস্তায়। সেই সভার অনুমতি পেতে বিজেপি-কে আদালতে আবেদন জানাতে হয়েছিল। সেই মামলাতেও ২১ জুলাইয়ের প্রসঙ্গ উঠেছিল। আদালত বলেছিল, অন্যদের সভায় যানজট তৈরি হলে ২১ জুলাইয়ের সভাও বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হবে। আদালতের ওই পর্যবেক্ষণের পরে কলকাতা পুলিশ বিজেপি-কে সভা করার অনুমতি দিয়েছিল। ২০১৬ সালেও একই উপমা দিয়ে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা করার অনুমতি আদালত থেকে আদায় করেছিল বিজেপি। বামেদের আইনজীবী সংগঠনের দায়ের করা মামলারও মূল বিষয় ছিল, ২১ জুলাই ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে তৃণমূলের সভা হতে পারলে অন্য রাজনৈতিক দলকেও সেখানে অনুমতি দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এই নির্দেশ এবং পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানানো উচিত। কারণ আমরা দেখতে পাই কাজের দিনে এই ধরনের কর্মসূচি হলে সাধারণ মানুষের জীবনে নানা রকম বিপর্যয় ঘটে। তা কাম্য নয়।’’ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘বছরের পর বছর ধরেই এই জিনিস হয়ে আসছে। এখন আদালতের সৌজন্যে যদি ছবিটা পাল্টায় তা হলে তো ভালই হয়।’’ আদালতের পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানাচ্ছে একাধিক নাগরিক সংগঠন। কলকাতা-হাওড়া অফিসযাত্রী সমিতির তরফে বলা হয়, ‘‘রাস্তা আটকে রাজনৈতিক দলগুলির মিছিল-মিটিং বাংলা তথা কলকাতার সংস্কৃতি। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে আসলে দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। সার্বিক ভাবে এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্কৃতির উপরেও। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ থেকে দলগুলির শিক্ষা নেওয়া উচিত।’’




