ভারত: ৪৭১/১০ ও ৩৬৪/১০ (রাহুল-১৩৭, পন্থ-১১৮, কার্স-৮০/৩, টং-৭২/৩)
ইংল্যান্ড: ৪৬৫/১০ ও ৩৭৩-৫ (ডাকেট ১৪৯, ক্রলি ৬৫, কৃষ্ণ ২-৯২, শার্দূল ২-৫১ )
ইংল্যান্ড ৫ উইকেটে জয়ী।
হার দিয়ে শুরু শুভমন যাত্রা! শুভমন গিলের দল পাঁচটি শতরান করেও হার বাঁচাতে পারেনি। টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৮ বছরের ইতিহাসে এমন লজ্জার নজির নেই। দুই ইনিংস মিলিয়ে একটা দলের ৫টি সেঞ্চুরি হওয়ার পরও সেই দলকে টেস্ট হারতে হয়! শেষ ইনিংসে ৩৭১ রানের টার্গেট পঞ্চম দিনের পিচে অনায়াসে কেউ তুলে ফেলতে পারে! বুমরাহর মতো বোলার ২০ ওভার বল করার পরও উইকেটশূন্য! হেডিংলিতে কার্যত অবিশ্বাস্যভাবে ইংল্যান্ডের কাছে হার ভারতের। শেষদিন জয়ের জন্য সাড়ে তিনশো রান দরকার ছিল ইংল্যান্ডের। পঞ্চম দিনের পিচ। মেঘলা আবহাওয়া, হাতে নতুন বল। নিখুঁত এবং পরিমিত ব্যাটিং করে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা একপ্রকার অসাধ্য সাধন করলেন। ইংল্যান্ডের প্রথম উইকেটই পড়ল ১৮৮ রানে। ক্রলি ৬৫ রানে আউট হলেও ডাকেট ১৪৯ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে গেলেন। দুই ওপেনার আউট হওয়ার পর ওলি পোপ এবং হ্যারি ব্রুকও দ্রুত প্যাভিলিয়নে ফেরেন। শেষদিকে জো রুট অপরাজিত ৪৩, বেন স্টোকস ৩৩ এবং জেমি স্মিথ অপরাজিত ৪৪ করে ম্যাচ শেষ করে দিলেন। পাঁচ উইকেট খুইয়েই নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেল ইংল্যান্ড। জয়ের ফলে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ইংল্যান্ড। এক টেস্টে পাঁচ সেঞ্চুরি ভারত কোনওদিন করেনি।
হেডিংলেতে প্রথম ইনিংসে শতরান করেছেন যশস্বী জয়সওয়াল, শুভমন গিল এবং ঋষভ পন্থ। দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান এসেছে লোকেশ রাহুল এবং পন্থের ব্যাট থেকে। সব মিলিয়ে ভারতীয় ব্যাটারেরা পাঁচটি শতরানের ইনিংস খেলেও দলকে জেতাতে পারেননি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের অলি পোপ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে বেন ডাকেট শতরান করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে হ্যারি ব্রুক করেন ৯৯ রান। এক রানের জন্য শতরান হাতছাড়া হয়। একটি টেস্টে কোনও দলের পাঁচ জন ব্যাটার শতরান করেছেন, এমন ঘটনা এর আগে পাঁচ বার ঘটেছে। প্রতি বারই সেই দল জয় পেয়েছে। ভারতের পাঁচ ব্যাটারের শতরান টেস্টের ইতিহাসে ষষ্ঠ ঘটনা। জিততে পারলেন না শুভমনেরা। দ্বিতীয় সফরকারী দল হিসাবে এই কৃতিত্ব দেখাল ভারত। ১৯৫৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ ব্যাটার শতরান করেছিলেন একটি টেস্টে। সে বার সকলে একই ইনিংসে শতরান করেন। ৮ উইকেটে ৭৫৮ রান তুলে ডিক্লেয়ার করেছিল অস্ট্রেলিয়া। টেস্টের শেষ দিন সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকল ইংল্যান্ড। হেডিংলে টেস্টের পঞ্চম দিন ৩৫০ রান তুলে ম্যাচ জিতেছেন স্টোকসেরা। তালিকায় শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ১৯৪৮ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টের পঞ্চম দিন লিডসেই ৪০৪ রান তুলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১৯৬৯ সালে অকল্যান্ডে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টের শেষ দিন ৩৪৫ রান তুলে জয় পেয়েছিল। রান তাড়া করে টেস্ট জেতার ক্ষেত্রে হেডিংলে টেস্টের জয় ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সেরা। ২০২২ সালে বার্মিংহ্যামে ভারতের বিরুদ্ধেই চতুর্থ ইনিংসে ৩ উইকেটে ৩৭৮ রান তুলে জিতেছিল ইংল্যান্ড। ঘরের মাঠে ভারতের বিরুদ্ধে শেষ দু’টি টেস্টেই রান তাড়া করে নজির গড়ল ইংরেজরা।
শুভমনের মতে, ক্যাচ ফস্কানো ও লোয়ার অর্ডার রান না করার খেসারত দিতে হয়েছে। খেলা শেষে বলেন, “দারুণ একটা টেস্ট হল। আমরা সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু অনেকগুলে ক্যাচ ফস্কেছি। লোয়ার অর্ডার রান পায়নি। তাই হারতে হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে দল যা খেলেছে তাতে গর্বিত। আমরা ভেবেছিলাম দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৩০ রান করে ডিক্লেয়ার করব। কিন্তু শেষ দিকে আমরা রান করতে পারিনি। তাই কাজটা কঠিন হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু হয়েছে যে ফিরতে পারিনি। এই ভুলগুলো শুধরে পরের ম্যাচে নামার চেষ্টা করব। এটা নতুন দল। অনেক কিছু শেখার আছে। ওদের সময় দিতে হবে। এই পিচে উইকেট নেওয়ার জন্য ধৈর্য দরকার। এ দিনও প্রথম সেশনে আমরা ভাল বল করেছি। কিন্তু এক বার বল পুরনো হয়ে যাওয়ার পর রান আটকানো যাচ্ছিল না। কয়েকটা খোঁচা একটু দূরে পড়েছে। পাশাপাশি ইংল্যান্ডও ভাল ব্য়াট করেছে। ওরা যে সুযোগ পেয়েছে তা কাজে লাগিয়েছে।”
দুই ইনিংস মিলিয়ে মোট সাতটা ক্যাচ ছেড়েছেন ভারতের ফিল্ডারেরা। তার মধ্যে যশস্বী জয়সওয়াল একাই চারটে ক্যাচ ছেড়েছেন। ঋষভ পন্থ দুটো ও রবীন্দ্র জাডেজা একটা ছেড়েছেন। পাশাপাশি প্রথম ইনিংসে ভারতের শেষ ৭ উইকেট পড়েছে মাত্র ৪১ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসেও একই হাল। ৩১ রানে পড়েছে শেষ ৬ উইকেট। এই দুই কারণেই ম্যাচ হারতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আরও বড় লক্ষ্য দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু তা হয়নি। ইংল্যান্ড চতুর্থ ইনিংসে যে ভাবে ব্যাট করেছে ও ভারতের বোলিংয়ের যা দশা, তাতে ৪৩০ রান করেও ভারত জিতত কি না সন্দেহ রয়েছে। যে ভুলগুলো এই ম্যাচে তাঁরা করেছেন তা শুধরে পরের ম্যাচে নামতে চান। এই দলে অনেক নতুন ক্রিকেটার। তাঁদের সময় দিতে চাইছেন অধিনায়ক। ভাগ্যও অনেক সময় তাঁদের সঙ্গ দেয়নি। শেষ দিনে জাডেজার বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন শুভমন। বেশ কয়েকটা সুযোগ তৈরি করেছিলেন জাডেজা। কিন্তু পন্থ সেই সুযোগ ছাড়েন। তার জন্য অবশ্য পন্থকে দায়ী করেননি শুভমন। তাঁর মতে, ক্রিকেটে সব কিছু যে ভাল হবে তা নয়। এই ধরনের ভুল হয়েই থাকে। এই সিরিজ়ের আগে জানা গিয়েছিল, জসপ্রীত বুমরাহ পাঁচটা টেস্টে খেলবেন না। তিনটে টেস্ট খেলবেন। তিনি কোন তিনটে টেস্ট খেলবেন তা এখনও ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন ভারত অধিনায়ক। মহম্মদ সিরাজ এবং বুমরাহ ভালো বল করলেও ভাগ্য এবং ফিল্ডাররা তাঁদের সঙ্গ দেননি। গোটা ম্যাচে টিম ইন্ডিয়া অন্তত গোটা আটেক ক্যাচ ছেড়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসেও একাধিক ক্যাচ মিস হয়েছে। শুভমান গিলের অধিনায়কত্বও অতি সাধারণ মনে হয়েছে। ইংরেজ ব্যাটারদের অনুসরণ করছিলেন। যেখানে বল যাচ্ছে সেখানে ফিল্ডার পাঠাচ্ছেন। ম্যাচের পঞ্চম দিন রীতিমতো অসহায় দেখিয়েছে টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ককে।
দুই ইনিংসে শতরান করলেও আইসিসি-র শাস্তি এড়াতে পারলেন না ঋষভ পন্থ। নিজের দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় শুনানির মুখে পড়তে হয়নি। তবে একটি ডিমেরিট পয়েন্ট পেয়েছেন পন্থ। আগামী দিনে আরও ডিমেরিট পয়েন্ট পেলে নির্বাসিতও করা হতে পারে। আইসিসি-র নিয়মের ২.৮ ধারা অনুযায়ী, লেভেল ১ অপরাধ করেছেন পন্থ। মাঠে আম্পায়ারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। তারই শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাঁকে। ২৪ মাসের মধ্যে প্রথম বার এমন করায় নির্বাসিত করা হয়নি। আগামী ২৪ মাসের মধ্যে যদি আবার কোনও নিয়মভঙ্গ করেন পন্থ, তা হলে বড় শাস্তি পেতে হবে। তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানেক পর বল পরিবর্তনের অনুরোধ করেন ভারতের পেসার জসপ্রীত বুমরাহ। তত ক্ষণে ৬১ ওভার খেলা হয়েছিল। আম্পায়ার ক্রিস গাফানি সেই অনুরোধ শোনেননি। তার কিছু ক্ষণ পরেই দেখা যায়, মাঠের অপর আম্পায়ার পল রাইফেলের কাছে গিয়েছেন পন্থ। তাঁর কাছে গিয়েও বল বদলের অনুরোধ করেন পন্থ। বলের আকার নষ্ট হয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্য আম্পায়ারদের কাছে একটা যন্ত্র থাকে। তাতে পরীক্ষা করে রাইফেল জানান, বলের আকার ঠিক আছে। পন্থ এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি। রাগে বল ছুড়ে ফেলেন তিনি। তার পরে ফিরে যান নিজের জায়গায়। আম্পায়ার রাইফেলের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি পন্থের কাজে খুশি হননি। ক্রিকেটে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হলে রিভিউ নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু সেটা আউট হওয়ার ক্ষেত্রে। বল বদলের ক্ষেত্রে মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তার বিরুদ্ধে বিরক্তি প্রকাশ অপরাধের সমান।
টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন বিরাট কোহলি? আরও কয়েক বছর কি লাল বলের ক্রিকেট খেলতে পারতেন তিনি? তেমনটাই মনে করেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। তবে সেই সঙ্গে কোহলির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছেন তিনি। কোহলির টেস্ট অবসর নিয়ে সৌরভ বলেন, “সকলে বলছে কেন এখন কোহলি অবসর নিল। আমি জানি, গত পাঁচ বছর টেস্টে ওর সময় ভাল যায়নি। কিন্তু ওর মতো চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার ফিরে আসে। আমি নিশ্চিত, ইংল্যান্ডে গেলে কোহলি রান করত। কিন্তু ওর মনে হয়েছে এটাই চলে যাওয়ার সময়। আমি বলব, কে কী বলছে তা অপ্রাসঙ্গিক। একজন ক্রিকেটার নিজে জানে সে কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের কোনও প্রভাব বা চাপ তার উপর থাকে না। সে নিজেই সবচেয়ে ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সব কিছুরই একটা শেষ থাকে। আমরা অনেকে কোহলির অবসরে অবাক হয়েছিলাম। ৩৬ বছর বয়স ওর। এখনও যথেষ্ট ফিট। হয়তো এখনও কোহলি আইপিএল ও এক দিনের ক্রিকেট খেলবে, কিন্তু ওর অভাব বোধ হবে। এক দিন তো থামতে হবে। আমার মনে হয়েছিল, সেটাই আমার অবসর নেওয়ার সেরা সময়। তাই অবসর নিয়েছিলাম।”




