হেডিংলেতে কালো ‘আর্মব্যান্ড’ বা বাহুবন্ধনী পরে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামলেন ভারত এবং ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারেরা। বাহুবন্ধনী পরেছেন আম্পায়ারেরাও। ১২ জুন আহমদাবাদে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কালো আর্মব্যান্ড পরেছেন সকলে। খেলা শুরুর আগে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ১২ জুন আহমদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশে উড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার সেই অভিশপ্ত বিমান ‘এআই১৭১’। কিন্তু রানওয়ে ছাড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেঙে পড়ে বিমানটি। বিমানবন্দরের কাছেই বিজে মেডিক্যাল কলেজ এবং সিভিল হাসপাতালের হস্টেল ভবনে ধাক্কা খায় বিমানটি। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময়ে হস্টেলের মেস-এ খাবার খাচ্ছিলেন ডাক্তারি পড়ুয়ারা। তাঁদেরও অনেকের মৃত্যু হয় সেই ঘটনায়।দুর্ঘটনায় মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই কালো বাহুবন্ধনী পরে মাঠে নেমেছেন দু’দলের ক্রিকেটারেরা। টেস্ট বিশ্বকাপ ফাইনালের তৃতীয় দিনও অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটারেরা একই কারণে কালো বাহুবন্ধনী পরে খেলতে নেমেছিলেন। রোহিত-কোহলি নেই। নেতৃত্বের দায়িত্বে অনভিজ্ঞ শুভমান গিল। ইংল্যান্ডের মাটিতে তরুণ ভারতীয় দল অনবদ্য। লিডসে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে শুভমান গিলরা সজাগ। সেঞ্চুরি করে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন গিল। অধিনায়কের সঙ্গে হাফসেঞ্চুরি করে অপরাজিত আছেন সহ-অধিনায়ক ঋষভ পন্থ। সেঞ্চুরি করেন যশস্বী জয়সওয়াল। প্রথম দিনের শেষে ভারতের রান ৩ উইকেট হারিয়ে ৩৫৯। হেডিংলিতে টসে জিতে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেন স্টোকস। পরিকল্পনায় জল ঢালে ভারতের দুই ওপেনার। যশস্বী জয়সওয়াল ও কেএল রাহুলের পার্টনারশিপে ওঠে ৯১ রান। রাহুল আউট হন ৪২ রানে। রান করেননি অভিষেক হওয়া সাই সুদর্শন। যশস্বীকে হাতে চোট নিয়েও সেঞ্চুরি করেন। চা-পানের বিরতির ঠিক পরেই ১৬টা চারে ১০১ রানে আউট হন যশস্বী। ইংল্যান্ডের ক্রিস ওকস ও বেন স্টোকস ছাড়া বোলিং বিভাগও অভিজ্ঞ নয়। ১৪০ বলে করলেন টেস্ট কেরিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি। গিল প্রথম দিনের শেষে অপরাজিত ১২৭ রানে। ঋষভ পন্থ শুয়ে পড়ে এক হাতে চার-ছক্কা হাঁকালেন। অপরাজিত আছেন ৬৫ রানে। ৬টি চারের পাশাপাশি আছে ২টি ছয়। অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের জুটিতে ১৩৮ রান।

ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্টে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যশস্বী জয়সওয়ালের ১৪৪ বলে সেঞ্চুরি। ব্রাইডন কার্সের বল হাতে লাগলেও অকুতোভয়। সেঞ্চুরি করে লাফিয়ে উঠলেন।চোট নিয়েও নব্বইয়ের কোঠায় দাঁড়িয়ে দুটি চার হাঁকালেন। মাঠে ফিজিও ঢুকে শুশ্রূষা করেন। চোট যে যথেষ্ট জোরালো, তা বোঝাই যাচ্ছিল। কিন্তু তারপর দুটি চার হাঁকান। একেবারে ৯৯ রানে। সেখান থেকে একটা শর্ট রান। ইংল্যান্ডের মাঠে প্রথম টেস্টেই সেঞ্চুরি করলেন তিনি। তবে চা-পানের বিরতির পরই আউট হয়ে যান যশস্বী। ১৫৮ বলে করেন ১০১ রান। মারেন ১৬টি চার ও একটি ছক্কা। শুভমান গিল এখনও অপরাজিত আছেন। তিনিও এগিয়ে যাচ্ছেন সেঞ্চুরির দিকে। সঙ্গী ঋষভ পন্থ। ভারতও ক্রমশ বড় রানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বল সুইং করছিল। বেশ কিছু বল ব্যাট ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। কিন্তু হাল ছাড়েননি যশস্বী জয়সওয়াল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে শতরান করেছেন তিনি। দিনের খেলা শেষে যশস্বী জানান, কঠিন পরিস্থিতিতে মনের জোরে ভর করে এই ইনিংস খেলেন। প্রথম দিনের খেলা শেষে যশস্বী বলেন, “খুব ভাল লাগছে। একটা গোটা দিন আমরা দাপট দেখিয়েছি। ইংল্যান্ডের গ্রীষ্ম উপভোগ করেছি। শুরুটা ভাল হওয়া খুব দরকার ছিল। আমাদের প্রস্তুতি খুব ভাল ছিল। নেটে ভাল ভাবে অনুশীলন করেছি। প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছি। তাই চাপ কম ছিল। বল দেখে খেলেছি। অপেক্ষা করেছি। খারাপ বলে মেরেছি। নিজের উপর বিশ্বাস ছিল। ভাল খেলার ইচ্ছা ছিল। বল ১০০ শতাংশ সুইং করেছে। কিন্তু আমি ধৈর্য হারাইনি। সাবধানে খেলছিলাম। মুহূর্তটা উপভোগ করেছি। তাতেই সফল হয়েছি।”

ভারতের ৩১৭তম টেস্ট ক্রিকেটার হিসাবে অভিষেক হয়েছে সাই সুদর্শনের। হেডিংলেতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। অভিষেকের দিন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুল দ্রাবিড় এবং বিরাট কোহলিকে ছুঁয়েছেন সুদর্শন। নজির গড়েন। ২০ জুন ভারতের টেস্ট দলে অভিষেক হয়েছে সুদর্শনের। তাঁর হাতে টেস্ট টুপি তুলে দেন চেতেশ্বর পুজারা। সৌরভ, দ্রাবিড় ও কোহলি। তিন জনেরই টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ২০ জুন। তাঁদের ক্লাবে নাম লেখালেন সুদর্শন। একই দিনে অভিষেক হল তাঁর। সৌরভ, দ্রাবিড় ও কোহলি তিন জনই ভারতের অধিনায়ক হয়েছেন। সুদর্শনের কেরিয়ারে সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিভাবান তিনি। অনেক পরিশ্রম করতে হবে এই বাঁহাতি ব্যাটারকে। প্রথম পরীক্ষা ইংল্যান্ডে। তামিলনাড়ু প্রিমিয়ার লিগ থেকে উঠে ভারতীয় দলে নিজের জায়গা করেছেন সুদর্শন। ২০২১ সালের তামিলনাড়ু প্রিমিয়ার লিগে দ্বিতীয় সর্বাধিক রান করেছিলেন। সেই বছরই তামিলনাড়ুর হয়ে সাদা বলের ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। পরের বছর সুযোগ পেয়েছিলেন রঞ্জি দলে। রাজ্য দলের হয়ে ২৯ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১৯৫৭ রান করেছেন তিনি। ৪০ গড়ে সাতটা শতরানও রয়েছে সুদর্শনের। গত আইপিএলে কেরিয়ারের সেরা ফর্মে খেলেছেন সুদর্শন। গুজরাত টাইটান্সের হয়ে ৭৫৯ রান করেছেন। কমলা টুপি জিতেছেন। ১৫৬.১৭ স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন। আইপিএলে ভাল খেলায় ইংল্যান্ড সিরিজ়ের দলে জায়গা পেয়েছেন সুদর্শন। শুধু তা-ই নয়, অভিষেকও হয়েছে। এর আগে ভারতের হয়ে সাদা বলের ক্রিকেট খেলেছেন সুদর্শন। তিনটে এক দিনের ম্যাচ ও একটা টি-টোয়েন্টি খেলেছেন। এক দিনের কেরিয়ারে ১২৭ রান করেছেন। টি-টোয়েন্টিতে এখনও ব্যাট করার সুযোগ পাননি। জশ টংয়ের বল কভার দিয়ে চার মেরে হেলমেট খুলে দৌড়লেন শুভমন গিল। তার পর হুঙ্কার ছাড়লেন। দূরে দাঁড়িয়ে তার সাক্ষী থাকলেন জো রুট, বেন স্টোকসেরা। যে ইংল্যান্ডের মাটিতে এর আগে চারটে টেস্টে মাত্র ৮৮ রান করেছিলেন তিনি, সেখানে অধিনায়ক হিসাবে প্রথম ইনিংস খেলতে নেমে এল শতরান। দাপট দেখালেন ভারত অধিনায়ক। ১৪০ বলে শতরান করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চান। শুভমন ঢুকে পড়লেন বিজয় হজারে, সুনীল গাওস্কর, বিরাট কোহলির ক্লাবে। এর আগে এই তিন ভারতীয় অধিনায়ক হিসাবে প্রথম টেস্টে শতরান করেছিলেন। ১৯৫১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই অধিনায়ক হিসাবে অপরাজিত ১৬৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন হজারে। ১৯৭৬ সালে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১১৬ রান করেছিলেন গাওস্কর। তার পরে দীর্ঘ অপেক্ষা। ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ়ের মাঝপথে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি টেস্ট থেকে অবসর নিলে অধিনায়ক করা হয় কোহলিকে। প্রথম টেস্টেই ১১৫ রান করেছিলেন। সেই ক্লাবে ঢুকলেন শুভমন।

হেডিংলেতে নামার আগে শুভমন জানিয়েছিলেন, রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি না থাকলেও কোনও চিন্তা নেই। জিতবেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে রেকর্ড যশস্বীর, পছন্দের ইংরেজ বোলারদের পেয়েই আবার শতরান ভারতীয় ব্যাটারের। অর্ধশতরানের পরেও রানের গতি কমাননি শুভমন। তাঁকে আটকানোর জন্য একটা পরিকল্পনা করেছিলেন ইংরেজ বোলারেরা। লেগ সাইডে ছ’জন ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত শরীর লক্ষ্য করে শর্ট বল করেছেন। তাতেও শুভমনকে আটকানো যায়নি। কখনও পুল শটে ফাইন লেগের মাথার উপর দিয়ে ছক্কা মেরেছেন। কখনও মিড অন দিয়ে পুল মেরেছেন। আবার কখনও লেগ সাইডে সরে গিয়ে কভার দিয়ে চার মেরেছেন। তাঁকে কোনও ভাবেই সমস্যায় ফেলতে পারছিলেন না ইংরেজ বোলারেরা। শুভমনের চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বড় রান করে তবেই থামবেন। টংয়ের বলে কভার অঞ্চলে চার মেরে নিজের শতরান পূর্ণ করলেন শুভমন। ১৫টা চার মেরেছেন। তার পরে আবার গার্ড নিলেন ভারত অধিনায়ক। মারলেন ইনিংসের প্রথম ছক্কা। দিনের শেষ পর্যন্ত ১২৭ রানে অপরাজিত। দ্বিতীয় দিন দ্বিশতরানের হাতছানি। শুভমন ঢুকে পড়লেন বিজয় হজারে, সুনীল গাওস্কর, বিরাট কোহলির ক্লাবে। এর আগে এই তিন ভারতীয় অধিনায়ক হিসাবে প্রথম টেস্টে শতরান করেছিলেন। ১৯৫১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই অধিনায়ক হিসাবে অপরাজিত ১৬৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন হজারে। ১৯৭৬ সালে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১১৬ রান করেছিলেন গাওস্কর। তার পরে দীর্ঘ অপেক্ষা। ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ়ের মাঝপথে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি টেস্ট থেকে অবসর নিলে অধিনায়ক করা হয় কোহলিকে। প্রথম টেস্টেই ১১৫ রান করেন। সেই ক্লাবে ঢুকলেন শুভমন।




