Thursday, April 23, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বাংলার বধূ আশা ভোসলে!‌ দ্বিতীয় স্বামী রাহুল দেববর্মণের স্ত্রী!‌ ২০ বছরের বড় প্রেমিককে বাড়ির অমতে বিয়ে,অন্তঃসত্ত্বা আশার আত্মহত্যার চেষ্টা!

RK NEWZ শ্বাসপ্রশ্বাস থেমে গেলে মানুষের মৃত্যু হয়। তাঁর কাছে সঙ্গীতই ছিল শ্বাসগ্রহণ করার সমতুল্য। সঙ্গীতচর্চার মধ্যে নিজের যাপনের সন্ধান পেতেন বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলে। ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে টানা তিন ঘণ্টা পারফর্ম করেছিলেন তিনি। রবিবার সকালে অসুস্থতার কারণে মারা গেলেন আশা। কিন্তু তাঁর ‘শ্বাসপ্রশ্বাস’, তাঁর সঙ্গীত অমর হয়ে রইল। ‌‘মোহ’ শব্দটিকে রক্তমাংসের জমিতে নিয়ে এসেছিলেন আশা ভোসলে। রাহুল দেব বর্মনের সুরে আশার গাওয়া বাংলা গানগুলি ছাড়া আজও পুজো প্যান্ডেল অচল। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘আজ যাই, আসব আরেক দিন’ বা ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ কেন যে এখনও পুরনো হল না, তা সম্ভবত সমাজবিদ্যার গবেষণার বিষয় হতে পারে। ‘আভি না যাও ছোড় কর, দিল আভি ভরা নেহিঁ’ বলে হাজার ডাকলেও কিন্নরকণ্ঠ সাড়া দেয় নি। সমস্ত শক্তি দিয়েও যদি উচ্চারণ করা যায় ‘নেহি নেহি আভি নেহি’, তবে মায়াজগৎ থেকে উত্তর আসে ‘নেহি নেহি কভি নেহি’। এক মহাবৈচিত্রময় সময়কে কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। সেই কণ্ঠ আর উত্তর দেবে না ‘মোহ’ নামের শব্দটির মহিমা কী— এই প্রশ্নের। ৯২ বছর তো প্রায় শতাব্দীর সমান! তবু আশাকণ্ঠ শুনলে মনে মনে অগণিত মানুষ গেয়ে উঠবেন— “ম্যাঁয় থোড়ি দের জী তো লুঁ/ নশেঁকে ঘুঁট পী তো লুঁ’। এ নেশার নামই বোধহয় ‘মোহ’ আর তাকে ধারণ করেছিলেন আশা ভোসলে নামের এক নশ্বর মানবী। যে মোহ আর কোনও কিছু দিয়েই ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাঁর কণ্ঠের সতেজতা এবং সংগীতে তাঁর নিবেদন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। সুরের আকাশে তিনি সেই চিরযৌবনা কণ্ঠস্বর, যা যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবে। ‌আজ আশা নেই, তবে ভালোবাসা আছে…

আশার কেরিয়ারের ঝুলিতে ছিল ১২ হাজারেরও বেশি গান। সঙ্গীতে অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে পেয়েছিলেন পদ্মভূষণ। তা ছাড়া, ১৯৯৭ সালে গ্র্যামির জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। আশার পেশাগত জীবন সাফল্যের আলোয় যতটা রঙিন, ব্যক্তিজীবন ছিল ততোধিক আঁধারময়। আশা তখন মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। তাঁর ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোসলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। দু’জনের বয়সের পার্থক্য ছিল ২০ বছরের। গণপতরাওয়ের সঙ্গে আশার সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি আশার পরিবার। পরিবারের অমতেই গণপতরাওকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আশা। ১৯৪৯ সালে গণপতরাওকে বিয়ে করেছিলেন আশা। কিন্তু বিয়ের পর বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কে চি়ড় ধরতে থাকে সঙ্গীতশিল্পীর। গণপতরাও চাইতেন না যে, আশা তাঁর বাপের বাড়ির কোনও সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। অন্য দিকে, দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গেও তা নিয়ে আশার বিবাদ লেগে থাকত। এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, ‘‘লতাদিদি আমার সঙ্গে বহু দিন কথা বলেননি। প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু সেই বিয়ে সুখের ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়ি খুব রক্ষণশীল ছিল। এক গায়িকা তাঁদের বাড়ির পুত্রবধূ হয়েছে, তা মেনে নিতে পারেননি কেউ।’’ শ্বশুরবাড়িতে অধিকাংশ সময় মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন বলেও জানিয়েছিলেন আশা। গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল, আশার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করতেন গণপতরাও। নিজের সিদ্ধান্ত আশার উপর চাপিয়ে দিতেন। বহু বার হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন আশা। সঙ্গীতশিল্পীর দাবি, দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর পরিস্থিতি কিছু দিনের জন্য স্বাভাবিক হলেও তাঁর জীবন আবার অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিল। আশা তখন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর সঙ্গে কন্যাসন্তান বর্ষা ভোসলে এবং পুত্রসন্তান হেমন্ত ভোসলে। পাশাপাশি কেরিয়ারে চরম ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে আর পেরে উঠছিলেন না আশা। আশার জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজ়িক’ থেকে জানা যায়, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন সঙ্গীতশিল্পী। আশার কথায়, তিনি জীবনে এমন অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন যে, বেঁচে থাকার ইচ্ছাটুকুও হারিয়ে গিয়েছিল। নিজেকে শেষ করতে এক বোতল ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলেন তিনি। পরে হাসপাতালের বিছানায় জ্ঞান ফিরলে আশা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, সন্তানদের জন্য তিনি নতুন জীবন শুরু করবেন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন আশা। এর পর তৃতীয় তথা কনিষ্ঠ পুত্রসন্তান আনন্দ ভোসলের জন্ম দিয়েছিলেন। তিন সন্তান এবং কেরিয়ার নিয়ে জীবন নতুন ভাবে শুরু করেছিলেন। ১৯৬০ সালে গণপতরাওয়ের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। আশার জীবনে একরাশ আলো নিয়ে এসেছিলেন রাহুলদেব বর্মন। ‘পিয়া তু অব তো আ জা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘মেরা কুছ সামান’-এর মতো হিন্দি গানের পাশাপাশি ‘মহুয়ায় জমেছে আজ’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘চোখে নামে বৃষ্টি’র মতো বহু বাংলা গান সঙ্গীতপ্রেমীদের উপহার দিয়েছিলেন রাহুল-আশা জুটি। সঙ্গীতজগতে রাহুল এবং আশার জুটি ছিল বহুলচর্চিত। জনশ্রুতি, পেশাগত কারণে আলাপ হলেও আশার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন রাহুল। বিয়ের জন্য বহু বার আশাকে নাকি সেধেওছিলেন তিনি। অবশেষে, রাহুলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে ১৯৮০ সালে তাঁকে বিয়ে করেছিলেন আশা। গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল, বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে মতাদর্শের পার্থক্য দেখা গিয়েছিল রাহুল এবং আশার। পাশাপাশি, কেরিয়ারের ব্যস্ততার জন্যও দুই সঙ্গীতশিল্পীর সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভালবাসা বজায় রেখেছিলেন দু’জনে। ১৯৯৪ সালে মারা গিয়েছিলেন রাহুল। স্বামীর মৃত্যুর পাশাপাশি দুই সন্তানের মৃত্যুর সাক্ষী থাকতে হয়েছিল আশাকে। কানাঘুষো শোনা যায়, আশার কন্যা বর্ষা মানসিক অবসাদগ্রস্ত ছিলেন। ২০০৮ সালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ২০১২ সালে আবার নিজেকে শেষ করার চেষ্টা করেছিলেন বর্ষা। সে বার আর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরতে পারেননি তিনি। ২০১২ সালে কন্যাসন্তানকে চিরতরের জন্য হারিয়ে ফেলেছিলেন সঙ্গীতশিল্পী। কন্যার মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে আবার সন্তানবিয়োগ হয়েছিল আশার। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হেমন্ত। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। ২০২২ সালে প্রিয় লতাদিদির প্রয়াণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন আশা। ব্যক্তিজীবনে বার বার আঘাত পেলেও সঙ্গীতকে কখনও ফিরিয়ে দেননি আশা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘মানুষ যেমন শ্বাস নিলে বেঁচে থাকে, আমার কাছে সঙ্গীত হল শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার মতো।’’ তাঁর যখন ৯০ বছর বয়স, তখন গানের অনুষ্ঠান করার জন্য গিয়েছিলেন দুবাইয়ে। টানা তিন ঘণ্টা দুবাইয়ের মঞ্চে পারফর্ম করেছিলেন তিনি। রান্না করতে ভীষণ ভালবাসতেন আশা। নিজের শখকে পেশাদার রূপ দিতে ২০০২ সালে প্রথম রেস্তরাঁ খুলেছিলেন তিনি। কম সময়ের মধ্যে সেই রেস্তরাঁ আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতি পাওয়ায় বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় তার শাখা খোলা হয়েছিল। আগামী সেপ্টেম্বরে ৯৩ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল আশার। কিন্তু তার আগেই ঘটল ছন্দপতন। বলিউড সূত্রের খবর, শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ শারীরিক অস্বস্তি শুরু হওয়ায় সে কথা গৃহকর্মীকে জানিয়েছিলেন আশা। সঙ্গে সঙ্গে মুম্বইয়ের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল তাঁকে। শনিবার তাঁর নাতনি জ়নাই ভোসলে সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, “আমার ঠাকুমা আশা ভোসলে ক্লান্তি এবং বুকে সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমরা আপনাদের কাছে আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করার অনুরোধ করছি। চিকিৎসা চলছে এবং আশা করি সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। আগামী দিনে যা-ই হবে, আমরা আপনাদের জানাব।” রবিবার সকালে প্রয়াত হন সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর মৃত্যুশোকে সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে বিষাদের সুরে ভেসে উঠছে ‘অভী না জাও ছোড় কর, কে দিল অভী ভরা নহীঁ’।

জন্মসূত্রে না হলেও, কর্মসূত্রে তো বাঙালি বটেই। বলতেন, মহারাষ্ট্র তাঁর জন্মভূমি আর পশ্চিমবঙ্গ তাঁর কর্মভূমি। ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছিল সঙ্গীতশিল্পীকে। তবে আশা ভোসলে তো শুধু কাজের জন্য বাঙালির আপন নন। তিনি বাঙালি বাড়ির বৌমাও যে ছিলেন! কথায় কথায় বলতেনও, ‘‘কলকাতা আমার শ্বশুরবাড়ি।’’ প্রথম যে বার কলকাতায় এলেন রাহুল দেববর্মণকে বিয়ে করে, সেই গল্প শোনা গেল তাঁর পরিবার থেকে। এসে উঠেছিলেন সোজা রাহুলের দাদু নির্মল দাশগুপ্তের বাড়িতে। নির্মলবাবুকে ‘মণিদাদু’ বলে ডাকতেন রাহুল। আশা-রাহুলের বিয়েতে তেমন অনুষ্ঠান কিছু হয়নি। মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। ফলে বৌমাকে সে ভাবে বরণ করাও হয়ে ওঠেনি শ্বশুরবা়ড়ির সকলের। নতুন বৌমা কলকাতায় আসছেন, খবর পেয়েই নির্মলবাবুর স্ত্রী, রাহুলের ‘মণিদিদা’ দৌড়েছিলেন গড়িয়াহাটে, আশার জন্য রুপোর সিঁদুর কৌটো কিনতে। আশা বাড়িতে আসার পরে সেই কৌটো থেকে সিঁদুর নিয়ে বৌমার সিঁথিতে পরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তখন থেকেই আশার সেই বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া লেগে থাকত। তাঁরাও আশাদের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়েছেন বেশ কয়েক বার, জানান অভিজিৎবাবু। রাহুলের ‘মণিদাদু’কে খুব পছন্দ হয়ে যায় আশার। ফলে কলকাতায় এসে যখন নজরুলীতির প্রথম অ্যালবাম বার করেন আশা, তখন বলেন, মণিদাদুই তা প্রকাশ করবেন। করেওছিলেন তিনি। মধ্য কলকাতার এক হোটেলে নির্মলবাবু হাতেই প্রকাশিত হয়েছিল আশার সেই অ্যালবাম। রাহুলের মৃত্যুর পরেও কলকাতায় এসে ‘মণিদাদু’র বাড়িতে ঘুরে গিয়েছেন আশা। যদিও পরের দিকে বয়সের সঙ্গে কমতে থাকে তাঁর কলকাতায় আসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles