২৩ এবং ২৯ এপ্রিল ভোট পশ্চিমবঙ্গে। তার আগে রাজ্যে এসে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই ভোটের মরসুমে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার পশ্চিমবঙ্গে এলেন মোদী। বৃহস্পতিবার তিনি প্রথম সভা করেন হলদিয়ায়। তার পর আসানসোলে। সব শেষে সিউড়িতে জনসভা করছেন প্রধানমন্ত্রী। হলদিয়ার সভা থেকে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী একসঙ্গে কাজ করলেই বাংলার লাভ, তাই রাজ্যে চাই ডবল ইঞ্জিন সরকার। পিএম শব্দটিকে তো তৃণমূল সহ্য করতেই পারে না। এই পিএম শব্দ মোদীর পরিবারের শব্দ নয়। এই শব্দ ভারতের সংবিধানের দেওয়া। আর দেশের নাগরিকদের আশীর্বাদের ফলে পাওয়া যায়। কৃষক, গরিব, আদিবাসী, শ্রমিকদেরও পছন্দ নয় তৃণমূলের। বিজেপি সরকারের যে সব প্রকল্পে পিএম শব্দ রয়েছে, ওই প্রকল্পের সুবিধাই নিতে দেয় না এই সরকার। তৃণমূল কী ভাবে মনরেগার নামে গরিব, দলিত, আদিবাসী পরিবারকে ঠকিয়েছে আপনারা জানেন। কেন্দ্রীয় সরকার আইন নিয়ে এসেছে। গরিবদের রোজগার দেব। কৃষক, মৎস্যজীবীদের নতুন সুবিধা মিলবে। গ্রামে ১২৫ দিনের রোজগার মিলবে। কাজের পুরো টাকা আপনাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যাবে। কোনও সিন্ডিকেট হাত লাগাতে পারবে না। কোনও কাটমানি নয়, সিন্ডিকেট নয়। এটা মোদীর গ্যারান্টি। তৃণমূল এখানে গলি গলিতে তাজা বোমার কারাখানা তৈরি করছে। এটিকে তৃণমূল সরকার ক্ষুদ্রশিল্পে পরিণত করেছে। রাজ্যে ক্ষুদ্রশিল্প বন্ধ হয়েছে। তাজা বোমার কারখানা তৈরি হচ্ছে। এই সব বন্ধ হয়ে যাবে।তৃণমূল এখানে গলি গলিতে তাজা বোমার কারাখানা তৈরি করছে। এটিকে তৃণমূল সরকার ক্ষুদ্রশিল্পে পরিণত করেছে। রাজ্যে ক্ষুদ্রশিল্প বন্ধ হয়েছে। তাজা বোমার কারখানা তৈরি হচ্ছে। এই সব বন্ধ হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় সরকার রোজগার মেলার আয়োজন করে। যেখানে বিজেপি সরকার, সেখানে এই মেলার আয়োজন করা হয়। গত আড়াই বছরে ৭০ লক্ষের বেশি সরকারি চাকরি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে চাকরি লুটের খেলা চলছে। কথা দিয়ে যাচ্ছি, বাংলাকে ভয়মুক্ত করব। এখানে এক এক করে স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেখানে স্কুল বন্ধ, ভবিষ্যৎ বন্ধ। বাংলা চায় ভয় নয়, ভরসা। তৃণমূলের নির্মম সরকারে বিদায় দেবে বাংলার যুবশক্তি। গত বছরের ঘটনা আপনাদের সকলের মনে আছে। বীরভূমে স্কুলে এক আদিবাসী মেয়ের সঙ্গে যা হয়েছে, তা বিচলিত করার মতো। যাঁরা নিজেদের মেয়েদের হারিয়েছেন, কোনও টাকাপয়সা তা পূরণ করতে পারবে না। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনাও নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি এ রাজ্যে এসেছিলেন। সাঁওতাল সমাজের একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তিনি। যে সরকারই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রপতিকে উচিত সম্মান দেওয়া সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু এই অহংকারী তৃণমূল সরকার দেশের রাষ্ট্রপতিকেও কিছু মনে করেননি। অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো হবে। অনুপ্রবেশকারীদের মাথাদের জেলে ভরা হবে। অনুপ্রবেশকারীরা স্থানয় মানুষের কাছ থেকে কাজ ছিনিয়ে নিচ্ছে। আর স্থানীয়দের বাইরে কাজে যেতে হচ্ছে। আর এই দিন চলবে না। মালদহে কী ঘটেছে গোটা দেশ দেখেছে। বিচারকদের বন্ধক বানানো হয়েছিল। বাংলায় ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই ভয় থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি দেওয়ার প্রয়োজন। আমাদের এই বীরভূম বাউল সঙ্গীতে মাটি। এখন এখানে শোনা যায় একটা শব্দ, গান, আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, পাল্টানো দরকার। তৃণমূলের জঙ্গলরাজের সাক্ষী বীরভূম। বগটুইয়ে যা হয়েছে তা শুধু একটি ঘটনা নয়। সেটি মানবতার কলঙ্ক। এটা জঙ্গলরাজ নয় তো কী? এই মহাজঙ্গলরাজের শেষ হওয়া দরকার। জয় মা তারা, জয় নিতাই বলে ভাষণ শুরু করলেন মোদী। এই মাটি অনেক মণীষীদের। ওই বীরভূমেই পরিবর্তনের ঝড় আসতে চলেছে। এই যে বিশাল সমাগম, এটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, ঝড় আসছে। হেলিকপ্টার থেকে দেখছিলাম, কত উৎসাহ নিয়ে এখানে আপনার এসেছে। আমাকে আশীর্বাদ করবেন।”
মমতা বলেন, ‘‘ ওহে মোটাভাই, সাথে ইডি, সিবিআই। দিল্লিতে থেকে এল গাই, সাথে ইডি, সিবিআই। হুমকি দিচ্ছেন সকলকে। ধমক দিচ্ছেন। ওঁর কাজ ফোন করে ধমকানো। কেউ কেউ কিছু পাওয়ার জন্য মাথা নত করে। আমাকে কব্জা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, পারেনি। পারবেও না। আমাকে ধমকালে আমি চমকাই। আমি মানুষের ভরসা। আমার নিজের বলে কিছু নেই। চাইও না। বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন। মা জিজ্ঞাসা করেছিল বাবাকে, যা রেখেছ, সব বিলিয়ে দিচ্ছ, ছেলেমেয়েদের কী হবে? বাবা বলেন, ওরা মানুষ হবে। বাবার একটা কথা মানতে পারি না, অপ্রিয় সত্য কথা বলবে না! আমি বলে ফেলি। এটা অপরাধ। অপ্রিয় হলেও যেটা সত্য, বলতে কাঁপব কেন।প্রথমেই একটা কথা বলি, কাউন্সিলর, প্রার্থীদের। এখানে নির্মলদা বিধায়ক ছিলেন। তাঁকেই প্রার্থী করতে চেয়েছিলাম। তিনি ঠিক করেছেন, পারছেন না। পুত্রকে দিয়েছেন। তৃণমূল করলে সবুজ ধ্বংস করা যাবে না। কেউ যদি ভাবেন, নবান্নে বসে রয়েছি বলে, পানিহাটি, কামারহাটি, উত্তর দিনাজপুর খোঁজ রাখি না, ভুল করবেন। আমি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে খোঁজ রাখি। যারা লোভ করে তাদের জন্য তৃণমূল নয়। যারা জবরদস্তি করবে, তাদের জন্য তৃণমূল নয়। এটা বিজেপি নয়। আমি মনে করি কর্মীরা আমার সম্পদ। আজও নিজেকে কর্মী বলে পরিচয় দিই। আমার ধর্ম একটাই, মানবিকতা। আমার ধর্ম রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, বাংলার মাটি, বাংলার জল। আমি ভাগাভাগিতে বিশ্বাস করি না। কেউ কেউ বাঙালি-অবাঙালি করার চেষ্টা করছেন। কত লোককে দাঁড় করিয়েছেন কোনও কোনও আসনে। তাঁদের জামানত জব্দ করতে হবে। বাইরে থেকে লোক আসছে। মিছিল করার লোক নেই বিজেপির। এজেন্সিকে দিয়ে হোর্ডিং লাগাচ্ছে। গরিব মানুষকে ৫০০ টাকা পকেটে গুঁজে দিয়ে বলছে, মিছিলে আসবে। গত বার শুনেছি, একজন চুল কাটেন। তাঁর সেলুন বন্ধ। একজন চুল কাটতে গিয়ে শোনেন, তিনি বলেন, রোজ বিজেপির মিছিলে যাই, ৫০০ টাকা পাই। যখন বন্যা হয়, একটা টাকা দেয় না। কেউ মারা যায়, টাকা দেয় না। বাংলায় কথা বললে অত্যাচার করে। বিহারে অত্যাচার হয়। ইউপি, রাজস্থানে হয়। দিল্লির জমিদারেরা জবাব দেবেন? কেন বাংলায় কথা বললে বিদেশি, অনুপ্রবেশকারী বলবেন? সীমান্ত আটকানোর দায়িত্ব কার? আমোদী-প্রমোদীরা বলছেন, এটা না কি অনুপ্রবেশের কারখানা। আমি বলব বহিরাগতদের কারখানা! বহিরাগতদের কোনও ঠাঁই নাই। আমার যখন চার বছর বয়স, আমি মুদির দোকানে গেছি। এক জন বিড়ি ছুড়ে দেয়। একটা ছেলের গেঞ্জি পুড়ে গেছিল। পাড়ায় সভা ডাকা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসা করে, কে করেছে। আমি বলে দিই। বাবা বলেছিল, কেন বললি। আমি বলেছিলাম, সত্যি বলবই। এটা ব্যর্থতা বা সার্থকতা হতে পারে। কমিশনকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাই। ওদের নাম উচ্চারণ করি না। বিজেপির কাছে পৌঁছে দিন সব। দেবদীপ কাজ করত সংবাদমাধ্যমে। ও জানে সব। যত বিজেপি সার্ভে করবে, দেখাতে বাধ্য হয়। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলি, শুভ নববর্ষ। ওরা বলেছিল, তৃণমূলকে আলটিমেটাম। কমিশনের হ্যান্ডল থেকে টুইট করা হয়। অনেক নমস্কার। তার কারণ, তৃণমূল একমাত্র লড়তে পারে বিজেপির বিরুদ্ধে। যে সিপিএম এত অত্যাচার করেছে, একটা সিবিআই, ইডি ওদের বিরুদ্ধে হয়েছে? এসআইআরে যখন তৃণমূল লড়াই করে, তখন তোমাদের দেখা নেই। তখন তৃণমূলের বিএলএ-রা করবে। ঝড়, জল, উৎসবে নেই, চড়াই-উতরাইয়ে নেই। শুধু ভোটের সময়ে রয়েছে। বসন্তের কোকিল! ভোট শেষ ওরাও নিঃশেষ! ১০০ দিনের টাকা বন্ধ। গ্রামীণ আবাসনের টাকা বন্ধ। রাস্তা-সহ সব টাকা বন্ধ। দক্ষিণেশ্বর-নোয়াপাড়া কে করেছিল? স্কাইওয়াক করে করেছিল? আমি করেছিলাম। এই কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে! কলকাতা থেকে তাড়াতাড়ি যাচ্ছেন বড়মার মন্দির থেকে সব জায়গায়। ভোটবাবুরা আসছে। এত নাম কেটে লজ্জা নেই? ৯০ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী? পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ২০২৫ সালে আপনারা বলেছিলেন, সারা দেশে মাত্র ২,০০০ অনুপ্রবেশকারী। আপনারা অনুপ্রবেশকারী? আজ যারা এখানে জন্মাল, তারা অনুপ্রবেশকারী? লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হবে যে নাগরিক! এর পরের পরিকল্পনা হল এনআরসি। অসমে এনআরসি করে ১৯ লক্ষ লোকের নাম বাদ দিয়েছে। ১৩ লক্ষ হিন্দুও ছিল। অনেক মতুয়া, তফসিলি, সংখ্যালঘুর নাম বাদ দিয়েছে। হিন্দুদের নাম কম বাদ দেয়নি। গাইঘাটা, বনগাঁ গিয়ে দেখে আসুন। আজ নাকি আমোদী-প্রমোদী বলেছেন, বাংলায় মাছ উৎপাদন হয় না। বিহারে হয়। তুমি তো বিহারে মাছ খেতেই দাও না। এখানে তো সব খায়। আগে হায়দরাবাদ থেকে মাছ আসত। এখন আর লাগে না। পার্টি কানে কানে যা বলছে, তাই বলছ! উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে মাছ খেতে দাও না। দোকানও বন্ধ। এখানে বলো, বিহারে এত মাছ হয়। তুমি মাংসও পাঠাও বিদেশে। গোমাংস পাঠাও ওমানে। সৌদি আরবের গলায় যখন কোলাকুলি করো, ভাবো, ও হিন্দু না মুসলমান। দেশের বাইরে এক নীতি, ভিতরে এক নীতি! মানুষ কী খাবে, তুমি ঠিক করবে? আমরা দুর্গা, লক্ষ্মী, কালীপুজো করি। আপনাদের চিঁড়ে-দইয়ের মেলা হয়। ছটপুজোয় ঘাট সাজিয়ে দিই। বড়দিনেও সাজাই। বাংলাকে টার্গেট করেছে। যাদের নিয়ে এসেছেন, রোজ চমকাচ্ছে। এত কিসের অহঙ্কার? দুরাচারী, স্বৈরাচারী। এদের কোনও ক্ষমা নেই। যদি রক্ষা করতে হয় বাংলা, আগে অন্য কোনও পার্টিকে ভোট দিয়েও থাকলে এ বার আর দেবেন না। অন্য পার্টি জিতবে না। মাঝখান থেকে বিজেপি যাতে জিতে না যায়, তা-ই করুন। বিজেপি যাতে একটি আসনেও না জেতে, দেখবেন। বাংলার স্বার্থে। আপনার সন্তান, শিক্ষা, ইতিহাস, খাবার, সংস্কৃতি, অধিকার যদি বাঁচাতে হয়, আপনাদের দরকার তৃণমূল সরকার। যে যতই নাটক, ছলনা করুক, একটা কথা বলবেন, ভোটে কেউ প্রার্থী হলে তাঁর নিজের কথা বলার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভোট রাজনীতির অঙ্গ। এক রাজনীতির লোক অন্য রাজনীতিক লোককে বলতেই পারে। কিন্তু আমি কাউকে কটূক্তি করব না। আপনারাও সৌজন্যের সীমারেখা রাখবেন। এখন বিজেপি কুৎসা করছে। পরিকল্পনা করছে। নিজের ভোট নিজে দেবেন। ইভিএম খারাপ হলে তাতে ভোট দেবেন না। অনেক অপেক্ষা করেছেন লাইনে, এক দিন একটু অপেক্ষা করবেন। ভিভিপ্যাট ছাড়া ভোট দেবেন না। নতুন যন্ত্র এলে এজেন্টকে দেখতে হবে, তাঁর ভোট তাঁর দলেই পড়ছে কি না! এঁদের বিশ্বাস করি না। যারা দাঙ্গা করে ক্ষমতায় আসে,তারা সব পারে। কোথাও শুনি, এ সব বাঙালি-অবাঙালি করে। আপনারা যখন বাংলায় থাকেন, খান, রুজি, রোজগার করেন, শান্তিতে থাকুন। আমরা বিজেপি নই। ওরা ওড়িশায় বাঙালিকে অত্যাচার করে। মধ্যপ্রদেশে করে। আমরা কিন্তু (অবাঙালিদের উপর অত্যাচার) করি না । বিজেপির কথা শুনবেন না। এখানে শান্তিতে থাকুন।’’





