চোখ ভাল রাখতে কিছু অভ্যাস জরুরি। ৫০-এর পর থেকে চোখের নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। চোখের কিছু সমস্যা নিঃশব্দেই আঘাত হানে। উপসর্গ বুঝে ওঠার আগেই ক্ষতি হয় যায় অনেকখানি, যা ঠিক করা যায় না। চোখ ভাল রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাপনে কোন বদল জরুরি? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়। কিন্তু দেখার ক্ষমতা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা ভয়াবহ ব্যাপার। বয়স ৫০ ছাড়ালে এমন সমস্যা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শুধু ছানি নয়, চোখের নিঃশব্দ ঘাতক হতে পারে গ্লকোমাও। ৫০-এর পরে দেখা যায় এজ রিলেটেড ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন বা এএমডি। এই অসুখেও দেখতে সমস্যা হয়। সময়ে সতর্ক না হলে গ্লকোমা হানা দিতে পারে তারও আগে। কারণ, এই রোগে ক্ষতি হয় অপটিক নার্ভের। গ্লকোমা এমন একটি অবস্থা, যা চোখের ভিতরে চাপ বা ইন্ট্রাঅক্যুলার প্রেশার জমা হওয়ার কারণে অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি করে। এই স্নায়ুই মস্তিষ্কে ছবি পাঠায়। ফলে এই স্নায়ুর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। সমস্যা হল, গ্লকোমায় হারানো দৃষ্টি চিকিৎসা করেও ফেরানো যায় না। তাই জরুরি দ্রুত রোগ নির্ণয়। দর্শকদের মন জয় করে নেওয়া ‘রোজা’ এখন ৫৭, ফিট থাকতে জীবনে কোন বদল এনেছেন মধু? চক্ষুরোগ চিকিৎসক সুনন্দ হালদার এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, গ্লকোমার মতো অসুখের নেপথ্যে জিনগত কারণ থাকলেও, জীবনযাপনের প্রভাবও পড়ে। কোনও ব্যক্তি কী খাচ্ছেন, কত ক্ষণ ঘুমোচ্ছেন— এমন অনেক সাধারণ বিষয়ই চোখের সঙ্গে সম্পর্কিত।
চোখের পরীক্ষা জরুরি: প্রাথমিক স্তরে গ্লকোমা বা এএমডি হয় উপসর্গহীন। প্রাথমিক ভাবে রোগী কিছুই বুঝতে পারেন না। যখন বোঝেন, দেখতে সমস্যা হচ্ছে, তখন হয়তো অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। করার কিছুই থাকে না। নিয়ম করে চোখ পরীক্ষা করালে এই ঝুঁকি কমতে পারে। যত দ্রুত রোগ নির্ণয় হবে, ততই ক্ষতি আটকানো সহজ হবে।
দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখে এমন খাবার: ভিটামিন এ, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। তালিকায় রাখা দরকার ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে, যা চোখের ক্ষতি রুখতে পারে। তালিকায় রাখা দরকার মাছ, মাংস, ডিম, ফল, টাটকা সব্জি, বাদাম। পাশাপাশি, ধূমপান এএমডির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগনি রশ্মি: সূর্যের অতিবেগনি রশ্মি ম্যাকিউলার ডিজেনারেশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই ইউভি রশ্মি রুখতে ভাল রোদচশমা পরা জরুরি।
শরীরচর্চা: ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ নিঃশব্দে চোখেরও ক্ষতি করে। নিয়ম করে শরীরচর্চা করলে যেমন মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন ভাল হয়, তেমনই চোখের জন্য ক্ষতিকর অসুখগুলি বশে রাখতে সাহায্য করে।
চোখের ব্যায়াম: দিনরাত মোবাইল বা ল্যাপটপের কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা ক্ষতিকর। স্ক্রিন টাইম কমানো দরকার। পাশাপাশি, চোখের জন্যও ব্যায়াম রয়েছে। সাধারণ কিছু ব্যায়াম চোখ ভাল রাখতে সাহায্য রাখে। চোখের ক্লান্তি কমায়।
ঘুম: শরীর ভাল রাখার জন্য তো বটেই, চোখের স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। ঘুমের সময় চোখের বিশ্রাম হয়। ঘুম ঠিক হলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে।
কাজের জন্য একটানা তাকিয়ে থাকতে হয় কম্পিউটার বা ল্যাপটপের দিকে। বাড়িতে ফিরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে উপস্থিতির কারণে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপেই চোখ আটকে। অথবা দীর্ঘ সময় টিভির পর্দায় বুঁদ রয়েছেন কিংবা ভিডিয়ো গেম খেলায় মশগুল? এতেই জল শুকোচ্ছে চোখের। ড্রাই আই বা শুষ্ক চোখের সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। তার উপর রয়েছে ক্যাটারাক্ট বা ছানি পড়ার সমস্যা, চোখের নানাবিধ সংক্রমণ। ড্রাই আই বা শুষ্ক চোখ রেটিনার ক্ষতি করে, এর থেকে আসতে পারে অন্ধত্বও। কেবল চোখের ড্রপ দিয়ে এ সমস্যার পাকাপাকি সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন ওষুধের, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং চোখের খেয়াল রাখবে দীর্ঘ মেয়াদে। তেমনই এক ওষুধ তৈরি করে ফেলেছেন দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এমস)-এর চিকিৎসকেরা। ওষুধটি তৈরি হয়েছে গরুর দুধ থেকে। গরুর দুধে ল্যাক্টোফেরিন নামে এক ধরনের প্রোটিন থাকে, যা আয়রন শোষণ করতে পারে। এই প্রোটিন চোখকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। ল্যাক্টোফেরিন দিয়েই এমন ট্যাবলেট তৈরি করেছেন এমসের চিকিৎসকেরা, যা কেবল শুষ্ক চোখের সমস্যা নয়, রেটিনার যে কোনও রোগের নিরাময় করতে পারবে বলেও দাবি করা হয়েছে। গরুর কলোস্ট্রাম থেকে ল্যাক্টোফেরিন প্রোটিন আলাদা করে তা দিয়ে ট্যাবলেট তৈরি হয়েছে। কলোস্ট্রাম হল ঘন হলুদ দুধ, যা সন্তান প্রসবের পর পরই নিঃসৃত হয়। এই দুধে এক বিশেষ ধরনের অ্যান্টিবডি থাকে, যা মুখগহ্বর, গলা থেকে শুরু করে ফুসফুস ও অন্ত্র প্রতিটি অঙ্গের রক্ষাকারী আবরণ মিউকাস মেমব্রেনকে সুরক্ষিত রাখে। মিউকাস স্তর মজবুত হলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সহজ হয়। কলোস্ট্রাম নানা ধরেন প্রোটিন সমৃদ্ধ হয়, যা শরীরের পুষ্টি জোগাতে পারে। ই-কোলাই, রোটা ভাইরাস, সিগেলার মতো মারাত্মক জীবাণুদের হাত থেকে এটি আজীবন সুরক্ষা দিতে পারে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, কলোস্ট্রামে থাকা অ্যান্টিবডি যে কোনও সংক্রমণজনিত অসুখ থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে। তাই গরুর কলোস্ট্রামকেই ওষুধ তৈরির উপাদান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। চোখের শুষ্কতা দূর করতে ল্যাক্টোফেরিন ট্যাবলেটের থেরাপি শুরু হয়েছে এমসে। প্রায় ২০০ জন রোগীকে ২৫০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট দু’বেলা করে খাইয়ে দেখা গিয়েছে, তাঁদের চোখের যাবতীয় সমস্যার নিরাময় হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কেবল ডিজিটাল আসক্তির জন্যই যে শুষ্ক চোখের সমস্যা হয়, তা নয়। সূর্যের অতিবেগনি রশ্মিও এর জন্য দায়ী। পেশার তাগিদে রোদে অতিরিক্ত সময় থাকার জন্য কর্নিয়ার সমস্যা বাড়ছে। যে কোনও ধরনের কাজে বাইরে ঘোরাঘুরি করার সময়ে সূর্যের অতিবেগনি রশ্মি সরাসরি চোখে লেগে ক্ষতি করছে রেটিনার। শুধু রেটিনা নয়, চোখের কেন্দ্রস্থলের লেন্স ম্যাকুলারও ক্ষতি করে এই রশ্মি। যার ফলে বিশেষ ধরনের ছানি ‘নিউক্লিয়ার ক্যাটারাক্ট’ হয়। কোনও ব্যক্তি যদি বাইরে রোদে ঘোরাঘুরি করার পাশাপাশি নিয়মিত ধূমপান এবং মদ্যপান করে থাকেন, সে ক্ষেত্রে ক্যাটারাক্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সে ক্ষেত্রেও চোখ বাঁচাতে ওই ট্যাবলেটটি কাজে আসতে পারে বলে দাবি।





