দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার বেশি সময় পার। লোকসভায় পাশ ওয়াকফ বিল। তখন মধ্যরাত। লোকসভায় ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ডিবেট। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ ৩ এপ্রিল, বৃহস্পতি রাত ২ টো। লোকসভায় পাশ ওয়াকফ সংশোধনী বিল। বিল পাশের আগে লোকসভায় এক তুমুল ডিবেট। লোকসভায় বিল পাশ। রাজ্যসভায় এই বিল নিয়ে আলোচনা আজ। লোকসভায় পাস বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল। ম্যারাথন বিতর্কে মহানাটক। আলোচনা চলাকালীন মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ টেনে বিলের প্রতিলিপি ছিঁড়ে ফেলেন সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। মোট ৫২০ জন সাংসদ অংশ নিয়েছিলেন। বিলের পক্ষে ২৮৮ এবং বিপক্ষে ২৩২ জন সাংসদ ভোট দেন। ব্যবধান ৫৬ ভোটের। লোকসভার মতোই রাজ্যসভাতেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে শাসকজোটের। রাজ্যসভায় এনডিএ-র মোট ১২৫ জন সাংসদ রয়েছেন। ছ’টি আসন শূন্য রয়েছে। ১১৮ জন সাংসদের সমর্থন পেলেই সংসদের উচ্চ কক্ষে বিলটি পাশ শাসক জোটের। ওয়াকফ সংশোধনী বিল এর আগে, লোকসভায় কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ‘ওয়াকফ সংশোধনী বিল, ২০২৫’ বিল পেশ করেন। তৃণমূলের সৌগত রায়ের দাবি, বিরোধী সাংসদদের দেওয়া নোট উপেক্ষিত হয়েছে বিলে। পাল্টা রিজিজুর দাবি, যখন ইতিবাচক সংস্কার আনা হচ্ছে, ‘তখন কেন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে?’ ওয়াকফ বিলের কপি ছিঁড়ে এআইএমআইএম-র সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দাবি, এই বিল অসাংবিধানিক। সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, আমি স্পষ্ট করে দিচ্ছি, মুসলিমদের ধর্মকর্ম, তাদের যে দানের ট্রাস্ট, তাতে সরকার কোনও দখলদারি চায় না। ওয়াকফ আপনাদেরই থাকবে। আমরা দেশের মুসলমান ভাই ও বোনকে এই হাউস থেকে বলছি আপনাদের ওয়াকফে একজনও নন মুসলিম আসবেন না। ওয়াকফ বোর্ড ও ওয়াকফ পরিষদ কী করবে? ওয়াকফ সম্পত্তি যারা বিক্রি করে খাচ্ছে তাদেরকে তাড়ানো হবে। ওয়াকফের টাকা, যা দিয়ে সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন করা দরকার, সেই টাকা যারা চুরি করছে, তাদের ধরার কাজ করবে ওয়াকফ পরিষদ। কল্যাণ দাদাদের টেনশনটা বুঝতে পারছি। বাংলার মুসলিমরাও শুনছে। টেনশন হওয়াই স্বাভাবিক। বিরোধীরা শুধু তোষণের জন্য বিরোধিতা করছেন। কিন্তু তাতে কোনও লাভ নেই। সরকারের যুক্তি, বর্তমানে যে আইন রয়েছে, তাতে ওয়াকফের দখল করা জমি বা সম্পত্তিতে কোনও ভাবেই পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকে না। কারও আপত্তি সত্ত্বেও জমি বা সম্পত্তি দখল করতে পারে ওয়াকফ বোর্ড। বিজেপির দাবি, ওয়াকফ সম্পত্তির সমস্ত সুবিধা ভোগ করছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মুসলিমরা। নতুন আইন কার্যকর হলে সাধারণ মুসলিমরা উপকৃত হবেন। তাছাড়া, সাচার কমিটির রিপোর্টেও বলা হয়েছিল ওয়াকফ নিয়মের সংস্কারের প্রয়োজন।
নতুন বিলে সেই বন্দোবস্তই রয়েছে। মূল আপত্তি এটা নিয়েই। এ ছাড়া রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির নথিভুক্তিকরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব। পাশাপাশি আপত্তি নতুন বিলে ওয়াকফ বোর্ডে দুই অমুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তির বন্দোবস্ত নিয়েও। ১৯৫৪ সালে প্রথম ওয়াকফ আইন পাশ হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ আইনে সংশোধনী এনে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। বিজেপির তরফে বার বার প্রশ্ন তোলা হয়েছে ‘বোর্ডের একচ্ছত্র অধিকার’ নিয়ে। ১৯৫৪ সালে প্রথম ওয়াকফ আইন পাশ হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ আইনে সংশোধনী এনে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। তার পর থেকেই বিজেপির তরফে বার বার প্রশ্ন ‘বোর্ডের একচ্ছত্র অধিকার’ নিয়ে। ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরোধিতা প্রসঙ্গে মুসলিম সংগঠনগুলির যুক্তি ছিল, ওয়াকফ বোর্ডের বিভিন্ন সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যেই ওই বিল আনছে কেন্দ্র। জমিয়তে ইসলামি হিন্দ এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মতো প্রধান মুসলিম সংগঠনগুলির মতে, গেরুয়া শিবির দীর্ঘ সময় ধরেই দিল্লি-সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। সেই কারণেই তড়িঘড়ি পাশ করাতে চাইছে সংশোধনী বিল। কেন্দ্রের যুক্তি, খোদ মুসলিম সমাজের গরিব এবং মহিলারাই ওয়াকফ আইন সংস্কারের দাবি জানাচ্ছিলেন। বিরোধীদের প্রবল আপত্তি ও হট্টগোলের মধ্যে গত ৮ অগস্ট লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করেছিলেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রী রিজিজু। বিলটি ‘অসাংবিধানিক এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী’ বলে অভিযোগ তুলে বিরোধীরা একযোগে তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিরোধীদের প্রবল আপত্তি ও হট্টগোলের মধ্যে ৮ আগস্ট লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করেছিলেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রী রিজিজু। বিলটি ‘অসাংবিধানিক এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী’ বলে অভিযোগ তুলে বিরোধীরা একযোগে তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ বিরোধীদের অভিযোগ, ৪৪টি সংশোধনী এনে ওয়াকফ বোর্ডের উপর সরকারি কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। দীর্ঘ বিতর্কের শেষে ঐকমত্যের লক্ষ্যে বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটির (জেপিসি) কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র। বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পালের নেতৃত্বাধীন ৩১ সদস্যের জেপিসি বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গত ৩০ ডিসেম্বর ১৪টি সংশোধনী-সহ বিলটি সংসদে পেশ করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে। সরকার পক্ষের তরফে ২৩ এবং বিরোধীদের তরফে ৪৪টি সংশোধনী প্রস্তাব কমিটিতে জমা পড়েছিল। সরকার পক্ষের সাংসদদের আনা ১৪টি সংশোধনী গৃহীত হলেও বিরোধীদের সব ক’টি সংশোধনী প্রস্তাবই জেপিসিতে খারিজ হয়ে যায়। এর পর বুধবার ওয়াকফ সংশোধনী বিল নিয়ে উত্তাল হয় লোকসভা। গভীর রাতে লোকসভায় তা পাশও হয়। রাজ্যসভায় এই বিল পেশ আজ বৃহস্পতিবার। সংসদের দুই কক্ষে পাশ হলে আইনটির নতুন নাম হবে ‘ইউনিফায়েড ওয়াকফ ম্যানেজমেন্ট, এমপাওয়ারমেন্ট, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট’।