Tuesday, June 30, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

চোর মমতার স্লোগানে এই বাংলাকে ভরিয়ে দেব :‌ শুভেন্দু‌, আরজি কর আন্দোলনেএর পর চাকরি বাতিল, ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে পড়েছে তৃণমূল

ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে পড়েছে তৃণমূল। গোটা বিষয়টি নিয়ে যাতে ক্ষোভের সঞ্চার না হয়, ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জেরে নানা কৌশল নিচ্ছে শাসকদল। ফের রাজনৈতিক দড়িটানাটানি। চাকরিহারা শিক্ষকরা কাদের সঙ্গে থাকবেন? বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নেতাজি ইন্ডোরে যাচ্ছেন। বিরোধীদের কালীঘাট চলোর ডাক। ৭ এপ্রিল সোমবার নেতাজি ইন্ডোরে যোগ্য চাকরিহারাদের সভায় যাবেন মমতা। একইদিনে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক বিজেপির যুব মোর্চারও। কালীঘাট চলো। ডিপ্রাউভড টিচার অ্যাসোসিয়েশন নেতাজি ইন্ডোর বুক করেছেন। ৭ তারিখ ১২টা ১৫ নাগাদ যাবেন বলে নবান্ন জানান মমতা। পাল্টা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী জানান, ৭ তারিখ চোর মমতার স্লোগানে এই বাংলাকে ভরিয়ে দেব। বিজেপির যুব মোর্চার ডাকে সেদিনই কলকাতায় মিছিল। সাধারন মানুষ আবার রাস্তায় নামতে শুরু করেছে। জেলার জেলায় শুরু বিক্ষোভ। চাকরিহারাদের পাশে কে দাঁড়াতে চাইছে। টানাপোড়েন জোর। যোগ্যদের তালিকা বের করে তাদের আইনি লড়াই করে তাদের চাকরি ফেরত দেওয়ার জন্য কাজ করতে মরিয়া কারা?‌ চাকরিহারারা পড়েছেন উভয় সংকটে। অনেকেই সামনেই বলে ফেলছেন রাজ্য সরকার এই সংকটের জন্য দায়ী। নেতাজি ইন্ডোরের সভাতে না গেলে বিপাকে পড়তে হতে পারে। চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন। সেকারণে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। চাকরি গেলে খাব কী, সংসার চলবে কীভাবে? বড় প্রশ্ন।

২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেলে থাকা প্রায় ২৬ হাজার জনের চাকরি বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের ডিভিশন বেঞ্চ। নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক পদে ছিলেন ১২,৯০৫ জন। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক পদে ছিলেন ৫,৭১২ জন। এ ছাড়া, বাকিরা গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি-তে কর্মরত ছিলেন। আরজি কর আন্দোলন বাংলার নাগরিক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘মাইলফলক’, যে আন্দোলন সাধারণ নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল। ১৪ বছরের শাসনকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল দলহীন সেই নাগরিক আন্দোলন। স্লোগান-‌ ‘শোক নয়, দ্রোহ’। আরজি কর আন্দোলনের ‘অন্যতম’ মুখ, জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্টের অন্যতম নেতা দেবাশিস হালদার প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর শাসকদল তৃণমূলকে বিঁধে লিখেছেন, ‘এই কান্না, এই অসহায়তা জাস্ট দেখা যাচ্ছে না। এই চোখের জল আগুন হয়ে এই রক্তচোষাদের পুড়িয়ে ধ্বংস করুক। এ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই।’

সুপ্রিম কোর্ট বলেছে তিন মাসের মধ্যে শুরু করতে, তিন মাসের মধ্যেই করে দেব বলেছেন মমতা। প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী রিমঝিম সিংহের প্রশ্ন, কারা ঘুষ দিল, কারা ঘুষ নিল, সেটা আদালত বার করতে পারল না? এটা কি বড় মাথাদের আড়াল করার বন্দোবস্ত নয়? চাকরি যাঁরা হারিয়েছেন, তাঁরা চাইলে রিমঝিমদের মঞ্চ তাঁদের পাশে থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে বিজেপি-সিপিএম সার্বিক ভাবে অনিয়ম এবং দুর্নীতিকে সামনে রেখে তৃণমূল তথা মমতাকে বিঁধতে চাইছে সাধারন মানুষও। চাকরি বাতিল হওয়া, প্রত্যেকে অথৈ জলে পড়েছেন। কেউ মর্মাহত। কেউ দুঃখিত, কিন্তু অনুতপ্ত নন। কেউ এখনই কিছু ভাবছেন না। আবার কেউ মনে করছেন, প্রতিবাদ করা উচিত ছিল সকলের। একই মুদ্রার এ পিঠ আর ও পিঠ।।

২০১৬ সালে এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘কারচুপি’।২০২১ সালে কলকাতা হাই কোর্টে অভিযোগ জমা পড়েছিল। গ্রুপ ‘সি’ এবং গ্রুপ ‘ডি’ কর্মী, নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগে ‘যথেচ্ছ দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে দায়ের হয়েছিল একগুচ্ছ মামলা। মামলাকারীদের অনেকেই ছিলেন ‘বঞ্চিত’ চাকরিপ্রার্থী। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২৫,৭৫২ চাকরি বাতিল হওয়ার পর অনেকের রোষ গিয়ে পড়েছে মামলাকারীদের উপর। চাকরিহারাদের একটি অংশ মামলা করে ‘আইনি জট’ পাকানো। দুর্নীতির কারণে ‘ন্যায্য’ চাকরি পাননি বলে অভিযোগ। একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক পদপ্রার্থী ববিতা সরকারের মামলার জেরে আগেই চাকরি গিয়েছিল রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর কন্যা অঙ্কিতা অধিকারীর। নিয়োগে কারচুপি হয়েছে বলেই অভিযোগ ছিল কোচবিহারের বাসিন্দা ববিতার। সেই মামলায় হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় পরেশ-কন্যার চাকরি বাতিল করে তা ববিতাকে দেওয়ার নির্দেশ দেন। নিয়োগে পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য অবশ্য আদালতের নির্দেশে পরে ববিতাকেও চাকরি ছাড়তে হয়। ববিতার চাকরি পান নিয়োগের পরীক্ষায় তাঁর চেয়ে ২ নম্বর বেশি পাওয়া অনামিকা রায়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গে ববিতা বলছেন, “বঞ্চিত হয়েছিলাম বলেই মামলা করেছিলাম। মামলা করেছিলাম বলেই জনগণ দেখতে পেয়েছিল, সাদা খাতাতেও চাকরি হয়! এই রায় প্রমাণ করে দিল, অন্যায় যে করে এবং অন্যায় যে সয়, দু’জনেই সমান দোষী। অন্যায় যাঁরা সহ্য করেছেন, তাঁরা যোগ্য প্রার্থী নন। তাঁদেরও প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। তাঁরা বলতে পারতেন, আমরা যোগ্য। যে সব অযোগ্যদের নিয়োগ করা হয়েছে, তাঁদের ঘাড় ধরে বার করে দিন। সবাই মিলে চাপ দিলে আজকের দিনটা দেখতে হত না।”

২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এসএসসি-তে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ। ২৭ নভেম্বর ওএমআর শিটে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ প্রকাশ করা হয় চূড়ান্ত প্যানেল। ২৮ অগস্ট প্রকাশিত হয় প্যানেলভুক্ত প্রার্থীদের মেধাতালিকা। ২০১৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে শিক্ষক হিসাবে চাকরি পান নির্বাচিতেরা। ২০২১ সালে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলায় প্রথম সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ। নিয়োগ দুর্নীতির প্রায় ১০টি মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ। সিবিআই তদন্তের পাশাপাশি ‘বেআইনি নিয়োগ’ বাতিল করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন অভিজিৎ। বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চের কিছু রায়ের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি হরিশ টন্ডনের ডিভিশন বেঞ্চ। পরে আবার সিঙ্গল বেঞ্চের বেশ কিছু রায় বহাল রাখে হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের ডিভিশন বেঞ্চ। সব নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে বিক্ষিপ্ত ভাবে একাধিক মামলা দায়ের হয়। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর শীর্ষ আদালতের বিচারপতি অনিরুদ্ধ বসু এবং বিচারপতি বেলা এম ত্রিবেদীর বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে সেখানেই এসএসসির নিয়োগ দুর্নীতির যাবতীয় মামলার শুনানি হবে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির বিশেষ বেঞ্চে এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলার শুনানি শুরু হয় কলকাতা হাই কোর্টে। ওই বেঞ্চের নির্দেশেই চাকরি যায় ২৫,৭৫৩ জনের। ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল হাই কোর্টের বিশেষ বেঞ্চের রায় ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার। সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি মোট ২০ বার শুনানির জন্য ওঠে। শেষমেশ ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মামলার শুনানি শেষ হয় প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খন্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের ঘোষিত রায়, ‘যোগ্য’ এবং ‘অযোগ্য’ বাছাই করা সম্ভব হয়নি। তাই প্যানেলে থাকা ২৫,৭৫২ জনের চাকরি বাতিল করা হচ্ছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমা ব্লকের অচিন্ত্য নগর গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম শ্রীপতিনগর ডক্টর বিসি রায় মেমোরিয়াল হাইস্কুল। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী মিলিয়ে ছিলেন ৭জন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি গিয়েছে ৬জনের। ৪জন শিক্ষক আর ২জন অশিক্ষক কর্মচারী। চাকরি রয়েছে একমাত্র টিচার ইন চার্জের। হাউহাউ করে কাঁদতে থাকেন শিক্ষকরা। জীবনবিজ্ঞানের এক শিক্ষক পুষ্পেন্দু পাল বলেন, অযোগ্যদের জন্য যোগ্যদের চাকরি চলে গেল। এর দায় কে নেবে। এর দায় ভার কে নেবে। বউ বাবা মা, সন্তান তাদেরকে কীভাবে চালাব। কান্নাকাটি করছি। নিজেকে শক্ত করা ছাড়া উপায় নেই। বাচ্চাদের পরীক্ষা হচ্ছে। সেকারণে ছুটে এলাম। আমার বাড়ি সবং পশ্চিমমেদিনীপুর। তবে পাশেই থাকি। স্কুলের টানে চলে এলাম। আমি পরিবার নিয়ে থাকি এখানে। সরকার দায়ী। রাজনৈতিক দল স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বলির পাঁঠা হতে হল আমাদের। আমরা দিশা ২০১৯ সালের ১ মার্চ আমি এই স্কুলে যোগ দিয়েছিলাম। তারপর থেকে এতদিন স্কুলে রয়েছি। একেবারে পথে বসে গেলাম এবার। এর জন্য একমাত্র সরকার দায়ী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles