অরুণ মানে সূর্য, বিশেষ করে ভোরের রক্তিম সূর্য এবং উদয় মানে ওঠা। অরুণোদয় অর্থাৎ সূর্যোদয় বা ভোরের সূর্যের প্রথম প্রকাশ। অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে আলোর আগমন। নতুন কোনও শুরুর প্রতীক, যা আশা ও সম্ভাবনার বার্তা বয়ে আনে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও তো এক রক্তিম ভোরের সূচনা, যেখানে অভিনয়ের গ্ল্যামার আর কলমের ধার মিলেমিশে এক নতুন শৈল্পিক সকাল তৈরি করে। নাহ্, সেই সকালে অমানিশার অন্ধকার, ভোর হওয়ার আগেই নেমে আসে রাতের আঁধার। অরুণোদয় মানে তো কেবল সূর্যের জেগে ওঠা নয়, সে তো এক বুক অন্ধকার চিরে আলোর আর্তনাদ; রাহুলের কলমে সেই আলো কোনওদিন রুপোলি পর্দার ঝলকানি, আবার কোনওদিন একলা ঘরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর অবসাদ। তিনি যখন লেখেন, শব্দেরা তখন ভোরের কুয়াশা মেখে জাগে, যেন এক অদ্ভুত আঁধার শেষে হঠাৎ ফুটে ওঠা রক্তজবা, তাঁর গদ্যে মিশে থাকে সেই অরুণ-এর লাবণ্য আর দহন, যা ছাই সরিয়ে খুঁজে আনে পলিমাখা হৃদয়ের কণ্ঠস্বর। অরুণোদয় মানে তো ফিরে আসার গান, চিতার আগুনের মতো পবিত্র বোধ, যেখানে অভিনেতা হারিয়ে যায়, জেগে ওঠে এক শব্দ-কারিগর, তাঁর অক্ষরেরা যেন সেই দিগন্তরেখা, যেখানে আকাশ আর মাটি মিশে যায়, এক বিষণ্ণ ভোরের আলোয় ভিজে যায় পাঠকের জীর্ণ ঘর। আজ রাহুলের সঙ্গে এক অদ্ভুত সখ্য পেরিয়ে নির্লিপ্ত ও প্রগাঢ় শব্দ-কারিগরের মুখটা ভেসে উঠছে। কলম হয়ে উঠত এক আশ্চর্য তলোয়ার বা কখনও নিভৃত বাঁশি। তাঁর লেখা মানেই এক আশ্চর্য অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো। তিনি যখন লেখেন, তখন শব্দরা যেন একেকটি ঝরা বকুল হয়ে তাঁর খাতার পাতায় এসে ভিড় জমায়। রাহুলের গদ্যের ঘরানা ঠিক সাধারণ নয়। যেন এক বিজন ব্যথার নদী, যা শান্ত হয়ে বয়ে যায় অথচ পাড় ভাঙার অসীম ক্ষমতা রাখে। তাঁর কলমে জীবন ধরা দেয় রূঢ় অথচ মায়াবী বাস্তবতায়। তিনি যখন তাঁর শৈশব, তাঁর ফেলে আসা গলি বা কোনও প্রিয় মানুষের কথা লেখেন, তখন পাঠক মাত্রই অনুভব করেন তীব্র হৃদয়-খোঁড়া বেদনা। রাহুলের বাক্যবিন্যাসে অদ্ভুত কুহক থাকে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী…
কিন্তু রাহুলের শব্দরা যেন ঘরছাড়া যাযাবরের মতো ঠিকানাহীন আবেগের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় গুণ তার নির্মেদ অথচ কাব্যিক ভঙ্গি। তিনি কোনও শব্দকে অকারণে অলঙ্কৃত করেন না, শব্দের অন্তর্নিহিত হাহাকারকে উস্কে দেন। তাঁর গদ্যে কখনও মিশে থাকে জীবনানন্দের সেই ধূসর পাণ্ডুলিপির বিষাদ, আবার কখনও শঙ্খ ঘোষের মতো সংহত প্রতিবাদের সুর। তিনি যখন লেখেন, তখন মনে হয় যেন মাটির কাছাকাছি এক মানুষ তাঁর অন্তরের সমস্ত রক্তক্ষরণকে কালিতে রূপান্তরিত করছেন। তাঁর লেখায় এক প্রকারের নষ্টনীড় খুঁজে পাওয়ার আকুতি থাকে, যা পাঠককে এক নিমেষে একাকী করে দেয়, আবার সেই একাকীত্বের মধ্যেই খুঁজে দেয় পরম শান্তি। রাহুলের লেখায় বারবার দেখেছি অদ্ভুত আঁধার, যেখানে তিনি নিজের ব্যর্থতা, প্রেম এবং সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করেন অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে। তাঁর গদ্য যেন উদাসীন বাতাসের মতো পাঠকের মনের জানলা অবারিত করে দেয়। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে তিনি যেভাবে মহাকাব্যিক রূপ দেন, তা ভাবায় বৈকি। তাঁর প্রতিটি শব্দে মিশে থাকে এক আশ্চর্য বনলতা সেন-সুলভ প্রশান্তি, যা ক্লান্ত বিকেলের শেষ রোদ্দুরের মতো আমাকে ছুঁয়ে যায়। তাঁর লেখা পড়তে বসলে মনে হয়, এই তো সেই হৃদয় জাগানিয়া সুর, যা আমরা বহুদিন ধরে খুঁজছিলাম। তিনি কেবল অভিনেতা নন, তিনি এক নিঃসঙ্গ পথিক, যিনি শব্দের খেয়ায় চড়ে পার হতে চান মরণ-পাথার। তাঁর গদ্যে মেকি আভিজাত্য নেই, আছে এক বুক-ভরা আর্তি আর ছেঁড়া পাল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য জেদ। রাহুলের কলম আসলে আগুনপাখি। যা পুড়ে ছাই হয়েও বারবার জন্ম নেয় নতুন কোনও অনুভবের গর্ভে। তাঁর লেখা আমাদের শেখায়, ক্ষত ছাড়া সৃষ্টি হয় না। তাঁর লেখনী দিয়ে আমাদের হৃদয়ে যে কম্পন সৃষ্টি করেন, তা কোনওদিন থামার নয়। তিনি সেই বিরল সাহিত্যিক-অভিনেতা, যাঁর কাছে শব্দরা ঋণী, যাঁর কাছে আবেগ চিরকাল তার নিজস্ব নির্জনতা খুঁজে পায়। তাঁর লেখা যেন এক চিরন্তন শীতের বিষণ্ণতা, যা শেষ হয়েও রেশ রেখে যায় চিরকাল। রাহুলের কলম যখন সচল হয়, তখন প্রেম সেখানে কেবল শরীরী উপস্থিতিতে আটকে থাকে না। তা হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক আর্তি। তাঁর লেখায় প্রেম যেন সেই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার গান। তিনি যখন তাঁর কলামে বা সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে প্রেমের ব্যবচ্ছেদ করেন, তখন সেখানে মিশে থাকে ঋত্বিক ঘটকের সেই নীলকণ্ঠ বিষাদ। তাঁর গদ্যে প্রেম হয়ে ওঠে জীবনানন্দের ঘাস, যা মাড়িয়ে যেতে গেলে পায়ের তলায় এক মায়াবী কুহক তৈরি হয়। রাহুল তাঁর লেখায় প্রায়শই নিজের জীবনের ভাঙাগড়া, বিচ্ছেদ এবং পুনর্মিলনকে যেভাবে তুলে ধরেন, তাতে মনে হয় তিনি যেন এক নিঃসঙ্গ নক্ষত্র। তিনি লিখেছেন, ‘সবাই তো থেকে যায় না, কেউ কেউ স্মৃতির ধুলো হয়ে চোখের কোনায় জমে থাকে’। এই যে সাবলীল অথচ গভীর জীবনদর্শন, তা পাঠককে অদ্ভুত আঁধার থেকে টেনে বের করে প্রশান্তির দিগন্তে নিয়ে যায়। তাঁর লেখায় প্রেমের রেফারেন্সগুলো কেমন যেন অথৈ, ছলছল জলের মতো। তিনি যখন লিখছেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি যেন এক ছেঁড়া পাল তোলা নৌকা, যার কোনও ঘাট নেই’, তখন সেই গদ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে হাহাকার, একবুক কষ্ট। তাঁর প্রতিটি শব্দে মিশে থাকে অব্যক্ত যন্ত্রণা আর অপার করুণা, যা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে একটু স্নিগ্ধ জলছবির মতো ধরা দেয়।
তোমার মনে কোন অব্যক্ত যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখেছিলে রাহুল, যে এভাবে কাঁদিয়ে চলে গেলে, দিকশূন্যপুর থেকে কি ফিরে আসা যায় না, জীবনের সেকেন্ড ইনিংসে কি চুটিয়ে ব্যাট করা যায় না, একটা সেঞ্চুরি চাই রাহুল…
পঞ্চভূতে বিলীন রাহুলের নশ্বর দেহ, স্বামীর শেষকৃত্য সেরে সাদা পোশাকে প্রিয়াঙ্কা। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে শেষ বিদায় জানিয়ে প্রিয়াঙ্কা যখন শ্মশান থেকে বেরোচ্ছেন, তখন যেন তিনি বড্ড অসহায়। তবে ১২ বছরের ছেলে, নিজের মা-বাবা, বয়স্ক শাশুড়ির কথা মাথায় রেখে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।‘চিরদিনই’ একসঙ্গে পথ চলবেন বলে কথা দিয়েছিলেন তাঁরা একে-অপরকে। ক্লাস টুয়েলভে পড়া একটা মেয়ে, ভালোবেসে ছিল বয়সে বছর চারেকের বড়, নিজের সিনেমারই হিরোকে। একসঙ্গে সংসার পাতা, সন্তানের মা-বাবা হওয়া, সম্পর্কে দূরত্ব আসা, ডিভোর্স মামলা তুলে দিয়ে আবার একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি— এই লম্বা সময়ে অনেককিছুই হয়েছে তাঁদের সঙ্গে। তবে একটাবারও প্রকাশ্যে কখনো একে-অপরকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেননি। তবে একসঙ্গে পথ চলা হয়তো এটুকুই ছিল। সোমবার রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে শেষ বিদায় জানিয়ে প্রিয়াঙ্কা যখন শ্মশান থেকে বেরোচ্ছেন, তখন যেন তিনি বড্ড অসহায়। তবে ১২ বছরের ছেলে, নিজের মা-বাবা, বয়স্ক শাশুড়ির কথা মাথায় রেখে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।২০১০ সালের নভেম্বর মাসে বিয়ে করেন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। তার মাত্র দু বছরের মধ্যেই জন্ম তাঁদের ছেলে সহজের। সন্তানের জন্মের বছর খানেকের মধ্যেই রাহুল-প্রিয়াঙ্কার মনোমালিন্য বিরাট আকার ধারণ করে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবে আলাদা হয় পথ। দীর্ঘদিন সিঙ্গল মাদার হিসাবে একাই সহজকে বড় করেছেন প্রিয়াঙ্কা। আদালতে বিচ্ছেদ মামলাও দায়ের হয় ২০১৮ সালে। তবে সহজই তাঁদের সম্পর্ককে সহজ করে তুলেছিল বলা চলে! সন্তানের জন্য ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। ২০২২ সাল থেকে একটু একটু করে ফের কাছাকাছি আসা। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে হল রাহুলের শেষকৃত্য। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে টলিউডের বহু তারকারা এদিন এসেছিলেন প্রিয় মানুষটাকে শেষ বিদায় জানাতে। লাল পতাকায় মুড়ে, লাল সেলাম কমরেড ধ্বনিতে শেষযাত্রা। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকাও সঙ্গী ছিল রাহুলের। শনিবার থেকেই রাহুলের বিজয়গড়ের বাড়িতে ভিড়। রাতে খবর আসার পর কেউই আর স্থির থাকতে পারেননি। ‘মাটির মানুষ’, ‘স্পষ্টবক্তা’ হিসেবে পরিচিত রাহুল যদিও তখন অনেক দূরে, দীঘার এক হাসপাতালে। তাঁর মরদেহ ঠান্ডা ঘরে অপেক্ষা করছে ময়নাতদন্তের। প্রাণবায়ু বেরিয়েছে সেই বিকেলেই। যে অভিনয়কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন, সেই অভিনয় করতে করতেই এসেছে মৃত্যু।দীর্ঘ বিরতির পর ফেব্রুয়ারি মাসে ছোট পর্দায় ফেরেন রাহুল। ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকে তিনি নায়ক হয়ে আসেন। কদিনের মধ্যেই তাঁর অভিনয়, ধারাবাহিকের গল্প প্রশংসা পেতে থাকে। সেই সিরিয়ালের আউডটোর শ্যুটেই তালসারি যাওয়া। আর শ্যুটের ফাঁকেই সমুদ্রের জলে ডুবে মৃত্যু। তবে রাহুল কিন্তু কোনোদিনই শুধু অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাননি, সুবক্তা-সুলেখক। একদম শূন্য থেকে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে উঠে এসে সিনেমা-সিরিজ-সিরিয়াল, বিচরণ করেছে স্বমহিমায়। পরিচিতি ছিলেন স্পষ্ট বক্তা হিসেবে। বাংলার মানুষ চোখের জল বিদায় জানাল তাঁদের রাহুলকে।





