Saturday, April 25, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

‘দাদা সাঁতার জানত, কিন্তু…’ জল-বালিতে ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ! ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে ইউনিটের বয়ানেও অসঙ্গতি?‌ শুটিংয়ে কখনই চিকিৎসক থাকে না কেন

খাদ্যনালী এবং শ্বাসনালীর মধ্যেও বালি-জলের উপস্থিতি মিলেছে বলে খবর। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, অল্প সময়ে জলে ডুবে থাকলে এমন ঘটনা ঘটার নয়। কিন্তু প্রোডাকশন টিমের দাবি, রাহুল ডুবে যাওয়ার চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাকে উদ্ধার করা হয়। সেক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে ইউনিটের এই বয়ানেও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। সমুদ্র সৈকতে শুটিং করতে গিয়ে কীভাবে সমুদ্রে তলিয়ে গেলেন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়? রবিবার সন্ধে থেকেই সন্দিহান টলিউড! আউটডোর লোকেশনে শুটিং করতে একজন অভিনেতার এভাবে বেঘোরে প্রাণ যাওয়ার ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না সহকর্মীরা। গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে থমথমে টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়ার প্রতিটা মানুষ মুখিয়ে ছিলেন প্রয়াত অভিনেতার ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য। কারণ রাহুলের আচমকা মৃত্যু এইমুহূর্তে নানাবিধ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে ইন্ডাস্ট্রির কাজের প্রক্রিয়া নিয়ে। সোমবার দুপুরে তমলুক মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের পর অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের শববাহী গাড়ি নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রয়াত অভিনেতার স্কুলের বন্ধুরা। প্রথমটায় সোমবার সকাল আটটা নাগাদ ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ বাদে সেটা শুরু হয়। প্রাথমিক রিপোর্টে ফুসফুসে প্রচুর পরিমাণ জল এবং বালির উপস্থিতির উল্লেৎ রয়েছে। অর্থাৎ যে সময়ে অভিনেতা ডুবে গিয়েছিলেন, তখন জল এবং বালি তার ফুসফুসে চলে যায়। ফলত ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও খাদ্যনালী এবং শ্বাসনালীর মধ্যেও বালি-জলের উপস্থিতি মিলেছে বলে খবর। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, অল্প সময়ে জলে ডুবে থাকলে এমন ঘটনা ঘটার নয়। কিন্তু প্রোডাকশন টিমের দাবি, রাহুল ডুবে যাওয়ার চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাকে উদ্ধার করা হয়। সেক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে ইউনিটের এই বয়ানেও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, অভিনেতা জলের তলায় পড়ে রইলেন, অথচ তাঁকে উদ্ধার করতে এতটা সময় লেগে গেল? ইউনিটের বাকি লোকজন কী করছিলেন? এ সব নানা প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষায় টলিউডের কলাকুশলীদের একটা বড় অংশ।

তালসারিতে রাহুলের মৃত্যুর ঘটনা যত খতিয়ে দেখা হচ্ছে, ততই যেন স্পষ্টের চেয়ে অস্পষ্ট কিছু ছবি বড় হয়ে ফুটে উঠছে। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি একাধিক গাফিলতি আর অসঙ্গতির জটিল ফল— এই প্রশ্নেই এখন আটকে তদন্ত। ২৯ মার্চ, বিকেল পাঁচটা নাগাদ ওড়িশার তালসারি সমুদ্রতটে শুটিং চলছিল ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের। পুলিশের হাতে এসেছে সেই শুটিংয়ের ভিডিও ফুটেজ। তাতেই প্রথম বড় মোড়। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, রাহুল সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্রের হাত ধরে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছেন। হাঁটু জল থেকে আরও গভীরে। আচমকাই দু’জনেই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শ্বেতাকে উদ্ধার করা হলেও রাহুল চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যান জলের তলায়। কিন্তু এখানেই শুরু ধোঁয়াশা ও প্রশ্নের ভিড়।

প্রথম প্রশ্ন—শুটিংয়ের দৃশ্য আদৌ জলের মধ্যে ছিল কি?

সিরিয়ালের প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, চিত্রনাট্যে গভীর জলে কোনও দৃশ্যই ছিল না। অন্যদিকে পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল জানিয়েছেন, ড্রোন ক্যামেরায় নায়ক-নায়িকার জলে শট নেওয়া হচ্ছিল। যদি সত্যিই জলের দৃশ্য না থাকে, তবে ক্যামেরা কেন সেই মুহূর্ত রেকর্ড করছিল? আর যদি শুটিং হচ্ছিল, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোথায় ছিল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন—অনুমতি ছিল কি?

বালাসোর পুলিশ জানিয়েছে, সমুদ্রের ভিতরে শুটিংয়ের জন্য কোনও সরকারি অনুমতি নেওয়া হয়নি। স্থানীয় ফিশারম্যান কো-অপারেটিভের তরফ থেকেও একই দাবি উঠেছে। অথচ শুটিং ইউনিটের একাংশ বলছে, তাদের অনুমতি ছিল। এই দ্বন্দ্বই তদন্তে নতুন জট তৈরি করছে।

তৃতীয় প্রশ্ন—মৃত্যুর কারণ ঠিক কী?

ওড়িশা পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েছিলেন রাহুল। আবার ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ঢেউয়ের ধাক্কায় পড়ে যাওয়ার পরই তিনি তলিয়ে যান। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, সহ-অভিনেত্রীকে বাঁচাতে গিয়েই বিপদে পড়েন তিনি।
তাহলে, পা পিছলে পড়া, স্রোতের টান, না কি চোরাবালির ফাঁদ? এখনও কোনও একক ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।

চতুর্থ প্রশ্ন—উদ্ধারে দেরি হয়েছিল কি?

প্রোডাকশন টিমের দাবি, চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই উদ্ধার করা হয় অভিনেতাকে। কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্য সম্পূর্ণ উল্টো। তাঁদের দাবি, দীর্ঘক্ষণ খোঁজার পর, এক-দেড় ঘণ্টা পেরোলে রাহুলকে উদ্ধার করা হয়। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা নিখোঁজ ছিলেন তিনি। এই সময়ের ব্যবধানই সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি।

পঞ্চম প্রশ্ন—রাহুলের শারীরিক অবস্থা ও পরিস্থিতি

ওই সিরিয়ালে রাহুলের সহ-অভিনেতা ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাহুল সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন, কোনও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন না। আবার শুটিং স্টাফের একাংশ দাবি করেছেন, তাঁকে জলে নামতে বারণ করা হয়েছিল, কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। তাহলে কেন তিনি এগোলেন? আরও একটি দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। শোনা গেছে, শ্যুটিং প্যাকআপের পর তিনি নিজেই সমুদ্রে নেমেছিলেন। আবার অন্য তথ্য বলছে, শুটিং চলাকালীনই এই দুর্ঘটনা ঘটে। পরিচালকও তেমনই বলেছেন। এই দুই বিপরীত বয়ানই ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলছে। এছাড়াও প্রশ্ন উঠছে চিকিৎসা ও উদ্ধার প্রক্রিয়া নিয়েও। অনেকেই দাবি করেছেন, জল থেকে তোলার সময় রাহুলের জ্ঞান ছিল। তাহলে হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই তাঁর অবস্থা এতটা খারাপ হল কীভাবে? সময়মতো চিকিৎসা পেলে কি পরিস্থিতি বদলাতে পারত?

সব মিলিয়ে এই মৃত্যু এখন আর শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয়, এ যেন অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্নের জট। বারবার ঘনিয়ে উঠছে অনিবার্য আক্ষেপ। শুটিং স্পটে নিরাপত্তা কোথায় ছিল? লাইফগার্ড ছিল কি? কেন ইউনিটের মধ্যে এত বয়ানগত অমিল? পুলিশ ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করেছে। ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, রাহুলের ময়নাতদন্তের রিপোর্টই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে চলেছে। তবে তার আগে পর্যন্ত তালসারির ঢেউয়ে একটাই প্রশ্ন ফিরে আসছে বারবার— ঠিক কীভাবে প্রাণ খোয়ালেন রাহুল! তালসারিতে রাহুলের মৃত্যুর রহস্যও এখনও ধোঁয়াশায়। বহু উত্তর মেলেনি। কেবলই উঠে এসেছে একাধিক বয়ান। জানা গেছে, রাহুল যখন মাঝসমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ইউনিটের সদস্যরা বারবার তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। কেউ কেউ জলে নেমেও পড়েন তাঁর পিছু পিছু। তখনও সহ-অভিনেত্রী শ্বেতার হাত ধরে ছিলেন রাহুল। আশেপাশে নৌকাও ছিল। তবু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আচমকাই ভারসাম্য হারান তিনি। শুরু হয় ডোবা-ওঠার লড়াই। প্রচুর জল ঢুকে যায় শরীরে। তড়িঘড়ি তাঁকে টেনে তোলা হয় তটে। আশ্চর্যজনকভাবে, তখনও জ্ঞান ছিল। গাড়িতে তোলা হয়। সেখানেও সাড়া দিচ্ছিলেন। কিন্তু দিঘা হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সহ-অভিনেত্রীকে সামলাতে গিয়েই হয়তো তিনি জলে গভীরে চলে যান। আবার কেউ বলছেন, আচমকা স্রোতের টানেই বিপত্তি। কেন শটের বাইরে গেলেন রাহুল? নিছক আবেগ, নাকি কোনও মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত? জল থেকে তোলার পরে প্রাণ ছিল দেহে? কেন কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না? তদন্ত চলছে, কিন্তু উত্তর এখনও অধরা। যেন শিউরে ওঠার মতো। শুটিংয়ে ব্যস্ত। জলের মধ্যে। ছিল না পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা নিয়ন্ত্রণ। চলে গেলেন কেরিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায়। হঠাৎ। অসময়ে। আজ টলিপাড়াকে ভাবাচ্ছে। ভাবাচ্ছে হাজারো বাঙালিকে। সেই একই প্রশ্ন ঘনিয়ে উঠছে, শিল্পীরা কি এখনও যথেষ্ট সুরক্ষা পান? নাকি এখনও শিল্পের নামে ঝুঁকি নেওয়ার পুরনো সংস্কৃতি বয়ে চলেছে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি? সবচেয়ে বড় কথা, রাহুল শুধু অভিনেতা নন, ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মেধাবী মানুষ, শিল্পীসত্তার গভীরে থাকা প্রাণ। অথচ শেষ অধ্যায়ের চর্চা যেন ছাপিয়ে গেল তাঁদের গোটা জীবনের সৃষ্টিকে। যে জল জীবন দেয়, সেই জলই প্রাণ কেড়ে নেয়। এর চেয়ে বড় সত্য আর হয় না। সময় যেন শুধু নাম বদলায়, স্থান বদলায়, দৃশ্য বদলায়। কিন্তু ট্র্যাজেডির স্ক্রিপ্ট সেই একই থেকে যায়।

২৯ মার্চ অকালে অস্তাচলে অরুণোদয়। সাগরপাড়ে রাহুলের আকস্মিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত সিনেমহল। গভীরভাবে শোকাহত সহকর্মী, সতীর্থ থেকে প্রিয়জনেরা। ইতিমধ্যেই অভিনেতা অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃতদেহ ময়না তদন্ত শেষ করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে রিপোর্ট মোতাবেক, ফুসফুসে প্রচুর পরিমাণ জল এবং বালির উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ যে সময় তিনি ডুবে গিয়েছিলেন প্রচুর পরিমাণ জল এবং বালি তার ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ার কারণে তা ফুলে দ্বিগুণ হয়ে যায়। খাদ্যনালী এবং শাস নালীর মধ্যেও বালি এবং জলের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। রিপোর্টে আরও জানা যাচ্ছে, অল্প সময় জলে ডুবে থাকলে এমন উপসর্গ থাকে না। কয়েক হাজার মানুষ রাহুলকে শ্রদ্ধা জানাতে তমলুক হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ, বিনা অনুমতিতেই চলছিল ‘ভোলে বাবা পার করে গা’-এর শুটিং। দীঘা সংলগ্ন তালসারির সমুদ্রের চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েই মৃত্যুর সময় সঙ্গে ছিলেন তাঁর গাড়িচালক। মালিকের মৃত্যুতে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। ২৯ জানুয়ারি বিকেলে ঠিক কী ঘটেছিল? কীভাবে শুটিং করতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন? সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল না? সংবাদমাধ্যমের সামনে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন গাড়িচালক। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলেছেন, “সঙ্গে থেকেও তো কিছু করতে পারলাম না। দাদা আসলে জলের গভীরতা বুঝতে পারেনি। তাই নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সেই সময় হঠাৎ জোয়ার এসেছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি জলে নেমেছি। টেকনিশিয়ানরাও দাদাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ছয় থেকে সাতজন নিজের জীবন বাজি রেখে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। দাদার সহ অভিনেত্রী ততক্ষণে পাড়ের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছিল। উনি সুস্থ আছেন। কিন্তু, দাদার ক্ষেত্রে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল।” রাহুল সাঁতার জানতেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, দাদা সাঁতার জানতেন কিন্তু, সেই সময় হয়তো বুঝে উঠতে পারেননি। কারণ জলের গভীরতা অনেকটাই ছিল। আমরাও প্রথমে ভেবেছিলাম খুব বেশি জল নেই। কিন্তু, পরে গভীরতা টের পেয়েছি। জোয়ারের জন্যই দুর্ঘটনাটা ঘটেছে।” যেখানে শুটিং চলছিল তার থেকে কতটা দূরে ঘটনাটি ঘটেছে? অল্প দূরত্বেই ঘটেছে বলে জানান গাড়িচালক।” রাহুলকে উদ্ধারের পর তখনই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? তাঁর কথায়, “ইউনিটের সকলেই হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমিও ওঁদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। কিন্তু, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ই সব শেষ। প্রাথমিকভাবে আমরাও পেট চেপে জল বের করার চেষ্টা করেছিলাম। তখনও নিঃশ্বাস চলছিল কিন্তু শেষ রক্ষা আর হল না।” শুটিংয়ে কোনও চিকিৎসক ছিল? গাড়িচালকের অকপট স্বীকারোক্তি,, “ শুটিংয়ে কখনই চিকিৎসক থাকে না।”

উদ্ধার হল ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ের ক্যামেরা ফুটেজ। সোমবার দুপুরে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিবার যে ক্যামেরায় রাহুলদের ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল, সেটি তদন্তের জন্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাহুলের মৃত্যুর আগের কয়েকটি মুহূর্ত ধরা আছে সেই ক্যামেরাতেই, এমনই ধারণা অনেকের। ওই ধারাবাহিকের শুটিং করতেই দিঘা গিয়েছিলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্য অভিনেতা, কলাকুশলীরা। রবিবার সেখানেই সমুদ্রে তলিয়ে যান রাহুল। পরে মৃত্যু হয় তাঁর। তার পর থেকে ঘটনাটি ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন। রবিবার ঘটনাস্থলে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে নানা সম্ভাবনার কথা উঠে আসছে। শুটিংয়ের ক্যামেরার ফুটেজ ভাল ভাবে খতিয়ে দেখে ঘটনাক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে আশ্বাস তদন্তকারীদের। স্থানীয় সূত্রের আগেই খবর ছিল, জলে নেমে শুটিং চলছিল। যদিও শুটিংয়ে উপস্থিত নানা জনের আলাদা মতামত ছিল। সূত্রের খবর, উদ্ধার হওয়া ক্যামেরার ফুটেজ থেকে জানা গিয়েছে, শুটিং চলাকালীন নায়িকা শ্বেতা মিশ্রের হাত ধরে জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রাহুল। শ্বেতা ও রাহুল হাত ধরে সমুদ্রের দিকে হাঁটবেন, এমনই ছিল দৃশ্যটি। দু’জনকেই নাকি বেশি গভীরে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু হাওয়া বেশি থাকায় তাঁরা পরিচালক ও অন্য কলাকুশলীদের কথা শুনতে পাননি। ভিডিয়ো ফুটেজ উদ্ধারের পরে জানা যাচ্ছে, জলে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পরে প্রথমে পড়ে যান শ্বেতা। তখন তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন রাহুল। বড় ঢেউ আসায় নাকি পড়ে যান অভিনেতা। তখন কলাকুশলীদের একজন শ্বেতাকে ধরতে এগিয়ে যান। শ্বেতাকে তখনই উদ্ধার করতে পারলেও রাহুল তলিয়ে যান। তার পর উদ্ধার করতে জলে নামে স্পিড বোট। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুট চলায় নাকি সেই দৃশ্যও ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, রবিবার হাঁটুর নীচ অবধি জলে রাহুল ও শ্বেতা ছিলেন। শট চলছিল। ড্রোন শটও নেওয়া হচ্ছিল। রাহুল তখন শ্বেতার হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকেন সমুদ্রের দিকে। তাঁরা চিৎকার করে বারণ করেন। কেউ কেউ বলেন, ‘যেয়ো না, যেয়ো না।’ জায়গাটি ঝুঁকিবহুল। তবু তাঁরা এগোতে থাকেন। পরিচালক আরও জানিয়েছেন, ইউনিটে যাঁরা সাঁতার জানেন, তেমন ১০-১২ জনও এগিয়েও যেতে থাকেন রাহুল আর শ্বেতার দিকে। শ্বেতার পরনে ছিল শাড়ি। শাড়ির জন্য অভিনেত্রী টাল সামলাতে পারেননি বলে জানান পরিচালক। পরিচালকের আরও দাবি, তত ক্ষণে ওঁদের কাছে অনেকেই পৌঁছে যান। তবে জল টেনে নেওয়ায় ওঁরাও বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখন লাইফ বোটও এগিয়ে যেতে থাকে। বোটে করে ওঁদের নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটা জল খেয়ে ফেলেছিলেন রাহুল। শ্বেতার হাত ধরেই তিনি পড়ে গিয়েছিলেন। রাহুলকে উদ্ধার করে পাড়ে নিয়ে আসার পরেও জ্ঞান ছিল। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। পরিচালকের দাবি, রাহুলই হাত ধরে নাকি শ্বেতাকে নিয়ে অনেকটা এগিয়ে যান। অত গভীরে যাওয়া নাকি তাঁদের দৃশ্যের মধ্যে ছিল না।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে স্তব্ধ টলিপাড়া। খবর ছড়ানোর পরেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অনেকে। তবে ঘটনার আকস্মিকতা কাটতেই একে একে প্রশ্ন তুলছেন টলিপাড়ার অভিনেতা-পরিচালকেরা। ঠিক কী ঘটেছিল? তা এখনও স্পষ্ট নয়। নানা রকমের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে সংশ্লিষ্ট ধারাবাহিকটির প্রযোজনা সংস্থা ও আর্টিস্ট ফোরাম। রবিবার ঘটনার পরেই প্রথমে শোনা গিয়েছিল, শুটিং প্যাকআপ হওয়ার পরে সমুদ্রে তলিয়ে যান রাহুল। এমন খবরও ছড়ায়, নৌকো থেকে সমুদ্রে পড়ে যান অভিনেতা। তবে স্থানীয় সূত্রে আগেই জানা যাচ্ছিল, শুটিং চলাকালীনই ঘটনাটি ঘটে। জলের মধ্যে রাহুল ও শ্বেতা হাত ধরে এগিয়ে যাবেন, এমনই ছিল দৃশ্যটি। শুটিংয়ে উপস্থিত জনাকয়েক সদস্য জানিয়েছেন, রাহুল ও শ্বেতা নাকি জলে অনেকটা এগিয়ে যান। পায়ে শাড়ি আটকে যাওয়ায় শ্বেতা নাকি পড়ে যান। বড় ঢেউ আসায় রাহুলও পড়ে যান। শ্বেতাকে উদ্ধার করা গেলেও রাহুল তলিয়ে যান। রাহুলকে স্পিড বোট উদ্ধার করার পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এমনই নানা বিবরণ উঠে আসছে। আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন টলিপাড়ারই অনেকে। তাঁরা তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন। অনেকেই আঙুল তুললেন আর্টিস্ট ফোরামের দিকে। পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, “বিভিন্ন সূত্র থেকে বিভিন্ন রকমের খবর পাচ্ছি। এই অসঙ্গতিগুলো দূর হোক এবং নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত হোক। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” অভিনেতা জীতু কমল নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে এনে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। শুটিংয়ে গিয়ে এক বার এমনই নিরাপত্তা গাফিলতিতে তাঁরও মৃত্যু হতে পারত বলে অভিযোগ। সে বার আর্টিস্ট ফোরামের কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সদুত্তর পাননি বলে জানান তিনি। জীতুর কথায়, “একটি প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। আমার যদি সেই সময়ে মৃত্যু হত, তখন আর্টিস্ট ফোরাম বলত, ‘তদন্ত হোক?’ ধুলোবালির মধ্যে আমি কাজ করতে পারছিলাম না। বার বার বলেছিলাম সেটা। আর্টিস্ট ফোরামকে জানানোর পরেও তারা চুপ ছিল। আর্টিস্ট ফোরামের উপর আমার ভরসা কম। তদন্তের দরকার পড়লে নিজেদেরই যা করার করতে হবে। ফোরাম কিছু করবে না।”
অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী সমাজমাধ্যমে স্পষ্ট বিবৃতিতে তদন্তের দাবি করেছেন। আর্টিস্ট ফোরাম এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ করছে, তা-ও জানতে চেয়েছেন তিনি। বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র-সহ টলিপাড়ার আরও কয়েক জন অভিনেতা-অভিনেত্রী। শুটিংয়ের মাঝে, না কি প্যাকআপের পরে এই ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করেছেন শ্রীলেখা। শুটিং চলাকালীন লোকেশনে বহু লোকজন থাকেন। তার মধ্যে কী ভাবে রাহুল জলে তলিয়ে গেলেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে এমনও শোনা গিয়েছে, সমুদ্রে শুটিংয়ের অনুমতি ছিল না। ওড়িশা পুলিশেরও এমন দাবি বলে শোনা যাচ্ছে। অনুমতি ছাড়া কী ভাবে সমুদ্রে শুটিং হল, সেই প্রশ্নও তুলছেন টলিপাড়ার একাধিক অভিনেতা। পরিচালক পারমিতা মুন্সী প্রশ্ন তুলেছেন, এক জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জলে ডুবে মারা যেতে আনুমানিক ৫-৬ মিনিট লাগে। সেই সময় কি ইউনিটের কেউ ছিলেন না ওখানে? সাম্প্রতিক কালে ভারতের আর কোনও চলচ্চিত্রজগতে শুটিং করতে গিয়ে কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। দেবলীনা দত্ত, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, চৈতি ঘোষাল-সহ আরও অনেকেই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছেন।

প্রিয় বাবিনকে দেখতে মানুষের ঢল। গোটা বিজয়গড় শোকস্তব্ধ। চোখের জল বাঁধ ভেঙেছে। এভাবে যে তাঁদের প্রিয় বাবিনকে দেখতে হবে, তা যেন স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি রাহুলের প্রতিবেশীরা। গতরাত থেকেই থমথমে ছিল পাড়া। আজ যেন সেই নিশব্দতা কাটিয়ে কান্নার রোল। হ্য়াঁ, রাহুলের নিথর দেহ ফিরল রাহুলের বাড়িতে। ফুল দিয়ে সাজানো শববাহী যানে করে নিজের পাড়ায় এলেন চিরদিনের নায়ক। সকাল থেকেই রাহুলের বাড়িতে অনুরাগীদের ভিড়। একে একে এসে পৌঁছেছেন রাহুলের বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীরা। এসেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্য়ায় থেকে শুরু করে শাশ্বত চট্টোপাধ্য়ায়, উষসী চক্রবর্তী, রূপাঞ্জনা মৈত্র, চৈতী ঘোষাল, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রুকমা রায়ের মতো টলিউডের সেলিব্রিটিরা। রাহুলকে যে এভাবে শেষ বিদায় জানাতে হবে, তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না, অভিনেতার সহকর্মীরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles