শতদ্রু দত্তকে গত ১৯ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী জামিন দিয়েছে আদালত। সেই জামিন খারিজ করা হোক বলে বারাসত আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ। যুবভারতীকাণ্ডে বারাসত আদালতে শতদ্রু দত্তের জামিন খারিজের আবেদন করেছে পুলিশ। সরকারি আইনজীবীর সওয়াল, ওই ঘটনায় প্রতারিতদের এখনও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাতে পারেন লিয়োনেল মেসির ভারত সফরের আয়োজক শতদ্রু। তাই তাঁর জামিন খারিজের আবেদন করা হয়েছে পুলিশের তরফে। যদিও মঙ্গলবারও প্রতারিতদের টাকা ফেরতের বিষয়ে আদালতে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। শতদ্রুকে ১৯ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী জামিন দিয়েছে আদালত। সেই জামিন খারিজ করা হোক বলে মঙ্গলবার বারাসত আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ। সরকারি আইনজীবীর সওয়াল, মেসির ঘটনায় প্রতারিতেরা এখনও টাকা ফেরত পাননি। শতদ্রু বাইরে থাকলে প্রভাব খাটাতে পারেন। টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া মসৃণ ভাবে করতে শতদ্রুর জামিন খারিজের আবেদন করা হয়েছে বারাসতে আদালতে। সরকারি আইনজীবী সওয়াল করে জানান, মোবাইল এবং সিম ফরেনসিকের জন্য পাঠানো হয়েছে। এখন কিছু ফেরত দেওয়া যাবে না। এখন ফেরত দিলে তদন্ত ব্যাহত হবে। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা আদালতে অ্যাকাউন্টের তথ্য দিয়েছি। ওই অ্যাকাউন্টে প্রসিড অফ ক্রাইম রয়েছে।’’
শতদ্রুর আইনজীবী সৌম্যজিৎ রাহা সওয়াল করে জানান, সিমকার্ড ফেরতের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তাঁর মক্কেলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা বৈধ কি না, তা চূড়ান্ত হোক। তার পরে অ্যাটাচমেন্টের প্রসঙ্গ আসবে। লিয়োনেল মেসির সফর ঘিরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত ১৩ ডিসেম্বর মেসির ভারত সফরের আয়োজক শতদ্রুকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। যুবভারতীর মাঠে মেসিকে দেখতে হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটেছিলেন দর্শকেরা। কিন্তু অনুষ্ঠানের পুরো সময়ে ফুটবল তারকাকে ঘিরে ছিলেন আয়োজক এবং রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীরা। দর্শকাসন থেকে তাঁকে দেখতে পাননি অনুগামীরা। এর পরে মেসি মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলে ক্রোধে ফেটে পড়েন দর্শকেরা। তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। গ্যালারিতে ভাঙচুর করা হয়। ওই দিনই বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় শতদ্রুকে। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় ওই ঘটনা নিয়ে দু’টি পৃথক মামলা হয়েছিল। প্রথম মামলায় একমাত্র গ্রেফতার শতদ্রু। দ্বিতীয় মামলায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আরও কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আদালতে শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করেছিল পুলিশ। ১০ হাজার টাকা বন্ডের বিনিময়ে অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছিলেন। জামিন খারিজের আবেদন করল পুলিশ।
লিয়োনেল মেসির সফরকে ঘিরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা শুধু একটি ক্রীড়া-অনুষ্ঠানের ব্যর্থ ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হিসেবেই নয়, বরং বৃহৎ জনসমাগম, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি হিসেবেও সামনে এসেছে। গত ১৩ ডিসেম্বরের সেই বহুল আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আয়োজক শতদ্রুকে গ্রেফতার করে পুলিশ, এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া, দর্শকদের ক্ষোভ, রাজনৈতিক উপস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যর্থতা। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পুরো ঘটনাপ্রবাহ, তার পটভূমি, আইনি দিক, জনরোষ, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা সব মিলিয়ে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হল।
মেসির সফর ঘিরে প্রত্যাশার চূড়ান্ত শিখর। বিশ্বফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিয়োনেল মেসির নাম ভারত, বিশেষত কলকাতায়, আবেগের সমার্থক। ফুটবলপাগল এই শহরে মেসির আগমন ঘোষণা হতেই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। বহু বছর ধরেই কলকাতায় আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকাদের আগমন ঘটলেও, মেসির সফরকে ঘিরে উত্তেজনার মাত্রা ছিল অন্য স্তরে। অনুষ্ঠান আয়োজক সংস্থা প্রচার করেছিল যে, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ উপস্থিতি, দর্শকদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশন, মঞ্চ অনুষ্ঠান, এবং মাঠে ভক্তদের উদ্দেশে সম্ভাষণ এসবের সুযোগ থাকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হাজার হাজার সমর্থক বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে টিকিট কাটেন।
টিকিট বিক্রি ও আর্থিক বিতর্ক। ঘটনার অন্যতম বিতর্কিত দিক ছিল টিকিটের মূল্য। অভিযোগ ওঠে, বহু টিকিটের দাম হাজার থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ভিআইপি পাস, প্রিমিয়াম গ্যালারি, এক্সক্লুসিভ জোন এই ধরনের ক্যাটাগরি তৈরি করা হয়েছিল। দর্শকদের দাবি প্রতিশ্রুত ভিউ বা অ্যাক্সেস দেওয়া হয়নি। আসন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল ছিল। অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি হয়েছে। অনেকেই আসন পাননি। অনেকে অভিযোগ করেন, টিকিট থাকলেও মাঠে ঢুকতে দেরি হয়েছে বা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
অনুষ্ঠানের দিন কী ঘটেছিল যুবভারতীতে? অনুষ্ঠানের দিন দুপুর থেকেই যুবভারতী চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নিরাপত্তা ঘেরাটোপ থাকলেও জনচাপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে থাকে। মেসি মাঠে প্রবেশ করার পর দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল— তিনি মাঠ প্রদক্ষিণ করবেন। গ্যালারির দিকে হাত নাড়বেন। দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবেন। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেতা-মন্ত্রী ও আয়োজকদের ঘিরে মেসি। অভিযোগ অনুযায়ী, পুরো সময়জুড়ে মেসিকে ঘিরে ছিলেন অনুষ্ঠান আয়োজকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আমন্ত্রিত ভিআইপি অতিথিরা। ফলে গ্যালারিতে বসা সাধারণ দর্শকরা মেসিকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাননি। অনেকেই বলেন, “আমরা শুধু স্ক্রিনে দেখেছি, সামনে পাইনি।”
এই পরিস্থিতি ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। দর্শকদের ক্ষোভ ও বিস্ফোরণ। মেসি মাঠ ছাড়ার পরই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষোভের কারণ। প্রত্যাশা বনাম বাস্তবের ফারাক। উচ্চমূল্যের টিকিট। দৃশ্যমানতার অভাব। ভিআইপি প্রাধান্য। বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। দর্শকদের একাংশ স্লোগান দিতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যালারিতে ভাঙচুর শুরু হয়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আসন ভাঙা হয়। ব্যারিকেড ক্ষতিগ্রস্ত। কিছু জায়গায় আগুন লাগানোর চেষ্টা। নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি
যদিও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাব আলাদা, তবুও ঘটনাটি গুরুতর আইনশৃঙ্খলা সমস্যায় রূপ নেয়। বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার শতদ্রু। ঘটনার দিনই দ্রুত পদক্ষেপ নেয় পুলিশ। অভিযোগ ওঠে যে, আয়োজকদের অব্যবস্থাপনা ও ভুল পরিকল্পনার ফলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়। অনুষ্ঠান আয়োজক শতদ্রুকে বিমানবন্দর থেকে আটক করে পুলিশ। ধারণা করা হয়, তিনি শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দায় কার? আয়োজক না প্রশাসন? এই প্রশ্নে বিতর্ক তীব্র হয়। আয়োজকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ। অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি। ভুল প্রতিশ্রুতি। ভিআইপি ফোকাস। নিরাপত্তা পরিকল্পনার ঘাটতি। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন। জনসমাগম অনুমান কম ধরা হয়েছিল? পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল? এন্ট্রি-এক্সিট ম্যানেজমেন্ট দুর্বল ছিল?
দুই পৃথক মামলা বিধাননগর দক্ষিণ থানায় দুটি আলাদা মামলা দায়ের হয়। প্রথম মামলায় মূল অভিযুক্ত শতদ্রু দত্ত। অভিযোগ, প্রতারণা সদৃশ প্রতিশ্রুতি। অব্যবস্থাপনা। জননিরাপত্তা বিপন্ন করা। দ্বিতীয় মামলায় অভিযুক্ত দর্শকদের একাংশ। অভিযোগ ভাঙচুর। অগ্নিসংযোগ। সরকারি সম্পত্তি নষ্ট। এই মামলায় আরও কয়েকজন গ্রেফতার হন।
জামিন প্রক্রিয়া। আদালতে শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশ। পুলিশের যুক্তি। তদন্তে প্রভাব ফেলতে পারেন। আর্থিক নথি যাচাই বাকি। প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আদালত অন্তর্বর্তী জামিন দেন। শর্ত ছিল। ১০,০০০ টাকার বন্ড। তদন্তে সহযোগিতা। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা (সম্ভাব্য)
জামিন খারিজের আবেদন। পরবর্তীতে পুলিশ আবার আদালতের দ্বারস্থ হয়। পুলিশের দাবি:
তদন্তে নতুন তথ্য। আর্থিক লেনদেন অস্পষ্ট। টিকিট রাজস্বের হিসাব মিলছে না।





