নিউজিল্যান্ড: ৩০০/৮ (ড্যারিল ৮৪, সিরাজ ৪০/২, হর্ষিত ৬৫/২)
ভারত: ৩০৬/৬ (কোহলি ৯৩, গিল ৫৬, জেমিসন ৪১/৪)
ভারত ৪ উইকেটে জয়ী।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ভারত ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে।
জেমিসনের বলে ব্রেসওয়েলের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট বিরাট কোহলি। বিরাচের রান ৯৩। বরোদায় নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই রেকর্ড বুকে নাম লিখিয়ে ফেললেন বিরাট কোহলি। মাঠে নেমেই ভারতের হয়ে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ওয়ানডে ম্যাচের সংখ্যা ছাপিয়ে গেলেন কোহলি। আর ব্যাট হাতে তিনি ও রোহিত শর্মা ভারতকে জেতাতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার। বরোদায় হর্ষিত রানা, মহম্মদ সিরাজদের জোড়া উইকেট সত্ত্বেও ৩০০ রান তুলল নিউজিল্যান্ড। ৩০৯টি ওয়ানডে খেললেন কোহলি। অন্যদিকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ভারতের হয়ে ৩০৮টি ওয়ানডে খেলেছেন। এশিয়া ১১ ধরে সৌরভ ৩১১টি ম্যাচ খেলেছেন। কোহলির সামনে শচীনের রেকর্ড ভাঙার হাতছানিও রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি রান করার সুযোগ থাকছে ‘কিং’ কোহলির কাছে। সেক্ষেত্রে কাজে লাগবে তাঁর ‘চেজমাস্টার’ পরিচয়। ভারতের টসভাগ্য ভালো না। প্রথম এক দিনের ম্যাচে নিউ জ়িল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ভারত। প্রথমে ব্যাট করে মাইকেল ব্রেসওয়েলেরা করেন ৮ উইকেটে ৩০০। জবাবে বিরাট কোহলির ৯৩ রানের সুবাদে ৪৯ ওভারে ৬ উইকেটে ৩০৬ রান শুভমন গিলদের। তবে যতটা সহজে ভারত জিতবে বলে মনে করা হচ্ছিল, ততটা সহজ হল না জয়। কোহলি আউট হওয়ার পর ভারতের ইনিংসের ছন্দ নষ্ট হয়। নিউ জ়িল্যান্ডের ফিল্ডারেরা একাধিক ক্যাচ ফেলে কিছুটা স্বস্তি দিলেন ভারতীয় শিবিরকে। বরোদায় শুভমান গিলকে সেটা সঙ্গ দিল। পিচে কোনও বিপদ নেই। তবে পরের দিকে শিশিরের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে টসে জিতে বল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে সন্দেহের জায়গা নেই। ভক্তদের শুধু দেখার রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিদের ইনিংসের জন্য বড় রান তুলতে পারে কি না কিউয়িরা? শুরুটা সেরকমই করেছিল নিউজিল্যান্ড। চর্চা শুরু হয়ে যায় অর্শদীপ সিংকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল কি না? ডেভন কনওয়ে, হেনরি নিকোলসের ব্যাটে ২০ ওভারের মধ্যে একশো পার হয়ে যায়। সেখান থেকে প্রথম ধাক্কা দেন হর্ষিত রানা। তাঁকে নিয়ে সমালোচনা কম নয়। গম্ভীরের ‘পছন্দের’ বলে সুযোগ পান, এমন কথাও ওঠে। তবে হর্ষিত কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছেন, কেন তিনি গম্ভীরের ‘প্রিয়পাত্র’? অফ স্টাম্পের বাইরের বলে নিকোলসকে (৬২) ফাঁদে ফেলে আউট করেন হর্ষিত। তার কিছুক্ষণের মধ্যে কনওয়ের (৫৬) উইকেটও ছিটকে যায়। হর্ষিত উইকেট পেলে সিরাজ বাদ যান কেন? প্রথমে উইল ইয়ং ও শেষের দিকে জাকারি ফোকসের উইকেট ঝুলিতে পোরেন। উলটো দিকে উইকেট পড়লেও ড্যারিল মিচেল রানের গতি বজায় রেখেছিলেন। মিচেলের (৮৪) উইকেট নেন প্রসিদ্ধ। তবে তাঁর সমস্যা হচ্ছে, বড্ড বেশি রান দিয়ে ফেলেন। ডেথ ওভারে সেটা না করলে রানটা ৩০০ হত না। বড় রান পেলেন না রোহিত শর্মা। করলেন ২৬ রান। ধীরে শুরু করে ৫৬ রান এল শুভমনের ব্যাট থেকে। অধিনায়ক রান পেলেও ফর্মে ফিরেছেন বলা যাবে না। তাঁর ৭১ বলের ইনিংসে ছিল সতর্কতার ছাপ। তার মধ্যেও পয়েন্টে ক্যাচ তুলে এক বার বেঁচে গিয়েছেন। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে চেষ্টা করেও বল তালুবন্দি করতে পারেননি গ্লেন ফিলিপস। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিল্ডারের ক্যাচ মিস দেখে হেসে ফেলেন শুভমন-রোহিত। ভারতকে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছেদিলেন কোহলি। সহজ-সাবলীল ব্যাটিং করলেন। একাধিক কীর্তিও গড়লেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পূর্ণ করলেন ২৮ হাজার রান। কুমার সাঙ্গাকারার ২৮০১৬ রান টপকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় উঠে এলেন দ্বিতীয় স্থানেও। কোহলির সামনে শুধু সচিন তেন্ডুলকর (৩৪৩৫৭ রান)।
রোহিত যেটুকু সময় ক্রিজ়ে ছিলেন, চেনা মেজাজেই ছিলেন। রোহিতের বেঁধে দেওয়া সুর ধরে রাখলেন কোহলিও। আগ্রাসী মেজাজে ব্যাট করতে শুরু করলেন বডোদরার নতুন স্টেডিয়ামে। তাতেই কমল ওভার প্রতি রান তোলার লক্ষ্য। নিউ জ়িল্যান্ডের দেওয়া ৩০১ রানের লক্ষ্যও বিরাট মনে হল না কোহলির দাপটে। চোট সারিয়ে ফেরা শ্রেয়স আয়ার ফর্মে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিজয় হজারে ট্রফির ম্যাচে। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ব্যাট হাতে দলকে ভরসা দিলেন সহ-অধিনায়ক। কোহলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাট করলেন শ্রেয়স। নিউ জ়িল্যান্ডের কোনও বোলারই তাঁদের সমস্যায় ফেলতে পারেননি। কোহলি ৯১ বলে ৯৩ রানের ইনিংস খেললেন। হাতছাড়া করলেন নিশ্চিত শতরান। ৮টি চার এবং ১টি ছক্কা এল তাঁর ব্যাট থেকে। রবিবারের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর রান হল ২৮০৬৮। কাইল জেমিসনের বলে কোহলি আউট হওয়ার পর ম্যাচ কিছুটা কঠিন করে ফেললেন ভারতীয়েরা। রান পেলেন না রবীন্দ্র জাডেজা (৪)। অর্ধশতরান হাতছাড়া করলেন শ্রেয়সও। ৪টি চার এবং ১টি ছয়ের সাহায্যে ৪৭ বলে ৪৯ রান করলেন তিনি। ২ উইকেটে ২৩৪ থেকে ১২ বলের ব্যবধানে ভারতের রান দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ২৪২। এর পর ভারতের মূল ভরসা ছিলেন লোকেশ রাহুল। চাপের মুখে ব্যাট হাতে লড়াই করলেন হর্ষিত রানাও। রাহুলের সঙ্গে জুটিতে কেকেআরের জোরে বোলারই প্রধান ভূমিকা নিলেন। ড্যারেল মিচেল আগেই হর্ষিতের দেওয়া সহজ ক্যাচ ফেলে না দিলে ম্যাচের ফল অন্য রকম হতেও পারত।সে সময় তাঁর রান ছিল ১২। শেষ পর্যন্ত হর্ষিত ২৩ বলে ২৯ রান করলেন ২টি চার, ১টি ছয়ের সাহায্যে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ব্যাট করতে নামতে হয় বল করার সময় চোট পাওয়া ওয়াশিংটন সুন্দরকে। রাহুলের ব্যাটেই শেষ পর্যন্ত জয় এল। তিনি ২টি চার ১টি ছয়ের সাহায্যে ২১ বলে ২৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললেন। ওয়াশিংটন ৭ বলে ৭ রানের অপরাজিত ইনিংসও পরিস্থিতির নিরিখে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিউ জ়িল্যান্ডের সফলতম বোলার জেমিসন ৪১ রানে ৪ উইকেট নিলেন। ৫৫ রানে ১ উইকেট নিলেন আদিত্য অশোক। ৭৩ রানে ১ উইকেট ক্রিস্টিয়ান ক্লার্কের। কিউয়ি অধিনায়ক সাত জন বোলারকে ব্যবহার করেও দলকে জেতাতে পারলেন না।
টস হারার পর প্রথমে অচেনা পিচে ভাল ব্যাট করেন নিউ জ়িল্যান্ডের ব্যাটারেরাও। কিছুটা ধরে শুরু করেন দুই ওপেনার ডেভন কনওয়ে এবং হেনরি নিকোলস। প্রথম উইকেটের জুটিতে তাঁরা তোলেন ১১৭ রান। নিকোলসকে (৬২) আউট করে তাঁদের জুটি ভাঙেন হর্ষিত। নিকোলসের ৬৯ বলের ইনিংসে ছিল ৮টি চার। কনওয়ে ৬টি চার এবং ১টি ছক্কার সাহায্যে করেন ৬৭ বলে ৫৬। তাঁকেও আউট করেন হর্ষিত। তিন নম্বরে নামা উইল ইয়ং (১২) এবং পাঁচ নম্বরে নামা গ্লেন ফিলিপস (১২) রান না পেলেও কিউয়িদের ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যান চার নম্বরে নামা ড্যারেল মিচেল। তিনি করেন ৭১ বলে ৮৪ রান। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৫টি চার এবং ৩টি ছক্কা। ভারতীয় বোলারদের সামলাতে পারেননি মিচেল হে (১২), ব্রেসওয়েল(১৬), জ়্যাক ফোকসেরাও (১)। তবু নিউ জ়িল্যান্ড ৩০০ পর্যন্ত পৌঁছোল শেষ দিকে ক্লার্কের দাপটে। তিনি ১৭ বলে ২৪ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললেন। ভারতের বোলারদের মধ্যে সফলতম মহম্মদ সিরাজ। ৪০ রানে ২ উইকেট তাঁর। ৬০ রানে ২ উইকেট প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের। ৬৫ রানে ২ উইকেট হর্ষিতের। ৫২ রান দিয়ে ১ উইকেট নিয়েছেন কুলদীপ যাদব। চোট পাওয়ায় ৫ ওভারের বেশি বল করতে পারেননি ওয়াশিংটন।আর কেএল রাহুল যেন প্রতি ম্যাচে ‘ডিপেন্ডবল’ হওয়ার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। যেখানেই নামানো হোক। তিনি নিজের কাজটা করে চলেছেন। চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রেখে ম্যাচটাকে শেষের দিকে নিয়ে গেলেন। আর ৪৯তম ওভারের শেষ তিন বলে ৪,৪,৬-এ ভারতকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন।
ম্যাচের মাঝে রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় বরোদা ক্রিকেট বোর্ড থেকে। বক্সের বাইরে থেকে বেরিয়ে আসেন রো-কো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ও বিসিসিআই সভাপতি মিঠুন মানহাস। বডোদরায় নতুন স্টেডিয়ামে সংর্বধিত হলেন বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মা। ভারত-নিউজিল্যান্ডের প্রথম এক দিনের ম্যাচের মাঝে দুই ক্রিকেটারকে সংবর্ধনা দেয় বডোদরা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন। উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার চেয়ারম্যান জয় শাহ। নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষ হওয়ার পর মাঠের এক ধারে আয়োজন করা হয় ছোট্ট অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত হলেন ভারতীয় দলের দুই প্রাক্তন অধিনায়ক। মঞ্চের উপর ক্রিকেট ব্যাটের মতো দেখতে একটি বিরাট বাক্স রাখা হয়। তাতে ছিল দু’পাল্লার দরজা। বাঁ দিকের পাল্লায় ছিল কোহলির ছবি। ডান দিকের পাল্লায় রোহিতের ছবি। ব্যাটের দরজা খুলতে দেখা যায় দুই ক্রিকেটার দাঁড়িয়ে রয়েছেন তার ভিতরে। বডোদরা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাঁদের বাইরে নিয়ে আসেন। দু’জনের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুষ্পস্তবক। তার পর দু’জনে নিজেদের ছবির পাশে সই করেন। ভারতীয় ক্রিকেটে বিশেষ অবদানের জন্য এ দিন সংবর্ধনা জানানো হয় কোহলি এবং রোহিতকে। বডোদরার নতুন কোটাম্বি স্টেডিয়ামে এই প্রথম পুরুষদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ হল। সেই উপলক্ষ্যেই এ দিন সংবর্ধনা দেওয়া হয় কোহলি এবং রোহিতকে। দু’জনেই টেস্ট এবং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছেন। দেশের হয়ে এখন শুধু এক দিনের ম্যাচ খেলেন।





