Thursday, April 23, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ছবিশিকারি, মন্ত্রীনেতাদের চ্যালাচামুণ্ডারা জেলের বাইরে!‌ একা শতদ্রুই ‘দায়ী’? মেসির গায়ে কার্যত লেপ্টে থাকা রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীও!‌ অথচ শতদ্রু কেন জেলে?‌

বড় প্রশ্ন?‌ একা শতদ্রুই কি ‘দায়ী’? মেসির গায়ে কার্যত লেপ্টে থাকা রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস থেকে শুরু করে ছবিশিকারি, নেতা, মন্ত্রী এবং নেতাদের চ্যালাচামুণ্ডারা জেলের বাইরে!‌ অথচ, আরও এক বার শতদ্রু দত্তকে জেলা হেফাজতে পাঠাল আদালত। লিয়োনেল মেসির সফর ঘিরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত ১৩ ডিসেম্বর মেসির ভারত সফরের আয়োজক শতদ্রুকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তার পরে কেটে গিয়েছে প্রায় এক মাস। ঘটনার তদন্ত করছে রাজ্য সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। সেই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে রাজ্য সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে এটা দেখা গিয়েছে যে, যুবভারতীতে মেসির সফরে আরও অনেক ‘প্রভাবশালী’ ছিলেন। তাঁদের সিট এখনও পর্যন্ত ডেকে পাঠায়নি। সেই সূত্রেই প্রশ্ন উঠছে, ওই ঘটনার জন্য একা শতদ্রুই কি ‘দায়ী’? যুবভারতীতে মেসিকে ঘিরে যে ভিড় তৈরি হয়েছিল, সেখানে ছিলেন মূলত উদ্যোক্তা, ছবিশিকারি, নেতা, মন্ত্রী এবং তাঁদের চ্যালাচামুণ্ডারা। মেসির গায়ে কার্যত লেপ্টে ছিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ওই ঘটনার তদন্ত শুরু হওয়ার পরে প্রবল সমালোচনার মুখে তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ‘অব্যাহতি’ নিয়েছেন। প্রভাবশালীদের ভিড়ে একসময় মাঠে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গিয়েছিল। মেসির সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ়ের পেটে কারও কনুইয়ের গুঁতো লাগে। কারও নখের ঘায়ে ছড়ে যায় রদ্রিগো ডি’পলের হাত। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে মেসির নিরাপত্তারক্ষীরাই তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। তার পরে শুরু হয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তাণ্ডব। ক্রুদ্ধ দর্শকেরা মাঠে ঢুকে পড়েন। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় ওই ঘটনা নিয়ে দু’টি পৃথক মামলা হয়েছিল। প্রথম মামলায় একমাত্র গ্রেফতার শতদ্রু। দ্বিতীয় মামলায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আরও কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আদালতে শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশ জানিয়েছিল, প্রায় ৩৫ হাজার দর্শক মেসিকে দেখবেন বলে টিকিট কেটেছিলেন। ১৯ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল। জামিন পেলে শতদ্রু প্রভাব খাটিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা পুলিশের। শতদ্রুর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) মোট আটটি ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ (এমপিও) আইন এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ (পিডিপিপি) আইনেও মামলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একাধিক বার তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে গিয়েছে। মেসি-কাণ্ডে শতদ্রুর বিরুদ্ধে আনা পুলিশের মূল অভিযোগ এবং তার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিগুলি কী কী?

অভিযোগ ১: অশান্তিতে উস্কানি
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৪৫, ৪৬ এবং ১৯২ নম্বর ধারায় শতদ্রুর বিরুদ্ধে অশান্তিতে উস্কানি, বিশৃঙ্খলায় পরোক্ষে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ এনেছে পুলিশ। বলা হয়েছে, সরাসরি আইন না ভাঙলেও বেআইনি কার্যকলাপে প্ররোচনা দিয়েছেন শতদ্রু। অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন।

প্রশাসনের যুক্তি— প্রত্যক্ষ ভাবে না হলেও পরোক্ষে বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে ছিলেন শতদ্রুই। কারণ, তিনিই মেসির সফরের প্রধান আয়োজক। মেসি যুবভারতীতে প্রবেশ করেন বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ। ছিলেন ১৬ মিনিট। ওই সময়ের মধ্যে মাঠে মেসিকে ঘিরে থাকা শতদ্রু-ঘনিষ্ঠদের বৃত্ত থেকেই অশান্তির সূত্রপাত। প্রায় শ’খানেক মানুষ মেসিদের ঘিরে ফেলেন। তাই গ্যালারিতে বসা দর্শকেরা দেখতে পাননি বিশ্বজয়ী ফুটবলারকে। কারা মাঠে ঢুকবেন, মেসির সামনে কারা থাকবেন, তা আয়োজক সংস্থাই ঠিক করেছিল। টিকিটের পাশাপাশি ভিআইপি পাসও বিলি করেছিলেন শতদ্রুরাই।

শতদ্রুর যুক্তি— আয়োজক হিসাবে যুবভারতীতে মেসির সঙ্গে শতদ্রু থাকলেও তাঁকে কোনও অশান্তি বা বিশৃঙ্খলায় দেখা যায়নি। স্টেডিয়ামে ভাঙচুর-বিশৃঙ্খলার আগেই মেসি-শতদ্রুরা মাঠ ছাড়েন। মেসি মাঠে থাকাকালীনও আয়োজকদের তরফে বার বার শৃঙ্খলা বজায় রাখার আবেদন জানানো হয়েছিল। শতদ্রুর আইনজীবী আদালতে দাবি করেছেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশকে জানিয়ে, তাদের অনুমতি নিয়েই মেসির সফরের আয়োজন করা হয়েছিল।

অভিযোগ ২: সম্পত্তি নষ্ট
শতদ্রুর বিরুদ্ধে সম্পত্তি নষ্ট এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩২৪(৪)(৫), ৩২৬(৫) এবং এমপিও আইনের ৯ নম্বর ধারায় রুজু হয়েছে মামলা। ভাঙচুর তো বটেই, মাঠে অগ্নিসংযোগ এবং বিস্ফোরক পদার্থের মাধ্যমে অনিষ্টের অভিযোগও শতদ্রুর বিরুদ্ধে এনেছে পুলিশ। অভিযোগ, দু’কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে।

প্রশাসনের যুক্তি— ঘটনার সময় মাঠে উপস্থিত না থাকলেও অশান্তির বারুদে আগুন ধরিয়ে গিয়েছিলেন শতদ্রুই। বিশ্বমানের তারকাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার মতো ‘মেগা ইভেন্ট’-এ যে ন্যূনতম পেশাদারিত্বের প্রয়োজন ছিল, তা তিনি দেখাননি। মাঠে কোনও মঞ্চ ছিল না। মেসি কী করবেন, কখন কোথায় যাবেন, দর্শকদের মুখোমুখি কী ভাবে হবেন, তা কেউ জানত না। তার ফলেই ওই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। আদালতে সরকারপক্ষের আইনজীবীর যুক্তি, মেসির সামনে কে যাবেন এবং কে যাবেন না, তা স্থির করার দায়িত্ব ছিল আয়োজকের। তা না-করে নিজের লোকেদের দিয়ে মেসিকে ঘিরে রেখেছিলেন শতদ্রু। সেই কারণেই হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও গ্যালারি থেকে দর্শকেরা মেসিকে দেখতে পাননি। তাই এই ভাঙচুর ও তাণ্ডব। তাই সম্পত্তি নষ্টের দায় শতদ্রু এড়াতে পারেন না।

শতদ্রুর যুক্তি— যুবভারতী থেকে মেসিরা বেরিয়ে যাওয়ার পরে ক্রুদ্ধ জনতা মাঠে তাণ্ডব চালায়। গ্যালারি থেকে চেয়ার ভেঙে ছোড়া হয় মাঠে। পুলিশকে নিশানা করে উড়ে আসে জল ও ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। কয়েক হাজার দর্শক সে দিন মাঠে ঢুকে পড়েন এবং যথেচ্ছ ভাঙচুর চালান। এক পর্যায়ে মাঠে আগুন জ্বালানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই তাণ্ডবে শতদ্রু তো ছিলেন না। তিনি তখন মেসিদের সঙ্গে বিমানবন্দরের পথে। তাঁরা বেরিয়ে যাওয়ার পর মাঠে যা হয়েছে, তার জন্য কেন শতদ্রুকে দায়ী করা হবে? শতদ্রু তো ভাঙচুর করেননি, আগুন লাগানোর চেষ্টাও করেননি!

অভিযোগ ৩: পুলিশের কাজে বাধা
সরকারি কর্মচারিদের কাজে বাধা দেওয়া এবং তাঁদের আঘাত করার অভিযোগে শতদ্রুর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৩২, ১২১(১) এবং ১২১(২) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। যুবভারতীর বিশৃঙ্খলায় উত্তেজিত জনতার নিশানার কেন্দ্রে ছিল পুলিশ। উর্দিধারী দেখলেই তাঁদের আক্রমণ করা হয়েছিল। চেয়ার, বোতল যে যা পেরেছেন ছুড়েছেন পুলিশকে লক্ষ্য করে। মাঠের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একাধিক পুলিশকর্মী আহত হন। তার জন্যেও শতদ্রুকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে।

প্রশাসনের যুক্তি— শতদ্রু নিজে পুলিশের গায়ে হাত না তুললেও যুবভারতীতে পুলিশকে মার খেতে হয়েছে তাঁর কারণেই। আয়োজক হিসাবে তাঁর অপদার্থতাই দর্শকদের খেপিয়ে তুলেছিল। সাধারণত কোনও স্টেডিয়ামে ম্যাচ চললে খাবার বা জলের বোতল নিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। জলের পাউচের ব্যবস্থা থাকে। এ ক্ষেত্রে সেই নিয়মের ধার ধারেননি আয়োজকেরা। মাঠে ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে জল ও ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে আয়োজকদের আলোচনা হয় ১২ ডিসেম্বর, মেসি-সফরের মাত্র এক দিন আগে! অথচ খাবার বা পানীয় বিক্রির জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়ে গিয়েছিল নভেম্বর মাসেই। প্রশাসনকে অন্ধকারে রেখেই সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। ঘটনার দিনও প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করা হয়নি। কারা কখন মাঠে ঢুকবেন, মেসির সামনে কারা থাকবেন, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। তার ফলেই ওই বিশৃঙ্খলা।

শতদ্রুর যুক্তি— শতদ্রু কোনও পুলিশের গায়ে হাত তোলেননি। যুবভারতীতে পুলিশ যখন আক্রান্ত, তখন তিনি মাঠেই ছিলেন না। তা হলে কোন যুক্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে এই ধারা প্রয়োগ করা হল? বরং পুলিশই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কলকাতার পরে মেসি গিয়েছিলেন হায়দরাবাদ, মুম্বই এবং দিল্লিতে। সর্বত্র তাঁর সফর সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শতদ্রুর আইনজীবীর যুক্তি, বাকি শহরগুলিতেও মেসির সফর আয়োজনের ভার ছিল তাঁর মক্কেলের উপর। আয়োজনে গাফিলতি থাকলে অন্যত্র কী ভাবে সফর সুসম্পন্ন হল? এর আগেও একাধিক খ্যাতনামা ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে কলকাতায় এনেছেন শতদ্রু। যুবভারতীর মতো পরিস্থিতি কখনও তৈরি হয়নি। মেসির ক্ষেত্রেও ‘পেশাগত’ ভাবেই তিনি সফরের আয়োজন করেছিলেন। পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে প্রথম থেকে সমন্বয়ও রেখেছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles