‘‘মেসিকে তো দেখতে পেলামই না, বদলে কয়েক জন ক্রিমিনালকে দেখতে হল!’’ জনতার বক্তব্য। লিওনেল মেসির সফর বিশ্ব দরবারে মাথা হেঁট করে দিল কলকাতার। লন্ডভন্ড হল শহরের বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়াম যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। হাজার হাজার দর্শকদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ল সল্টলেক স্টেডিয়াম এবং লাগোয়া এলাকায়। তুমুল বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে মাঝপথ থেকে ফিরে যেত হল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে। মেসির সঙ্গে যাঁর মাঠে আসার কথা ছিল, সেই শাহরুখ খান হোটেল থেকেই ফিরে গেলেন। ঘটনা যেদিকে যাচ্ছিল, তাতে অনেকের বেঙ্গালুরুর কথা মনে পড়েছে। প্রথম বার আইপিএল জেতার পর বিরাট কোহলিদের সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল সেখানে। যুবভারতীতে অবশ্য পরিস্থিতি তত খারাপ হয়নি। কিন্তু ঘটনার পর লুটপাট হয়েছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর যেমন তাঁর বাসস্থান ‘গণভবন’ থেকে জিনিসপত্র লুট হয়েছিল, সে ভাবেই বিধ্বস্ত যুবভারতী থেকে কেউ তুলে নিয়ে গিয়েছেন ফুলের টব। কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছেন মাঠের ঘাস।

এমন কলঙ্কিত দিন সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতার ইতিহাসে আসেনি। হাজার হাজার টাকা দিয়ে মেসিকে দেখার জন্য টিকিট কেটেছিলেন দর্শকেরা। কেউ দিয়েছিলেন ১২ হাজার টাকা। কেউ ১৬ হাজার। কিন্তু তাঁরা এক ঝলকেও দেখতে পাননি বিশ্বজয়ী ফুটবলারকে। ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ জনতার কেউ বলেছেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে একটা বড় দুর্নীতি হল। টাকা ফেরত চাই।’’ পরিস্থিতি এমনই অগ্নিগর্ভ ছিল যে, অনেক দর্শক সারদা কেলেঙ্কারির কথা টেনে এনে মেসির সফরের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তের তুলনা করতে শুরু করেন সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে। কেউ বলেন, ‘‘মেসিকে তো দেখতে পেলামই না, বদলে কয়েক জন ক্রিমিনালকে দেখতে হল!’’ এই ক্ষোভের আগুন শুধু যুবভারতীকে লন্ডভন্ড করেই থামেনি। গোটা বিশ্বের কাছে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে কলকাতাকে। কারণ, মেসি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াব্যক্তিত্ব। তাঁকে ঘিরে শনিবার ‘যুবভারতী কেলেঙ্কারি’ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এ শহর এমন ‘ইভেন্ট’ আয়োজনের আদৌ উপযুক্ত নয়। শুক্রবার রাতেই কলকাতায় চলে এসেছিলেন মেসি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু তথা বিশ্ব ফুটবলের আরও দুই তারকা লুইস সুয়ারেজ় এবং রদ্রিগো ডি’পল। রাত আড়াইটে নাগাদ মেসির বিমান নামার পর কলকাতা বিমানবন্দরে ভক্তদের ভিড় এবং উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই উন্মাদনা যে এমন ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটনাবে, তা তখন আন্দাজ করা যায়নি। মেসিকে দেখতে না পেয়ে রাগে স্টেডিয়ামের চেয়ার ভেঙেছেন দর্শকেরা। ভাঙা চেয়ার, বোতল ছুড়েছেন মাঠে। পুলিশের ব্যারিকেড, ফেন্সিং ভেঙে হাজারে হাজারে দর্শক ঢুকে পড়েন মাঠে। মাঠে আগুন লাগিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছে! ফুটবলের রাজপুত্রকে শহর ছাড়তে হয়েছে বিক্ষোভের অস্বস্তি নিয়েই।

দর্শকদের ক্রোধ ‘অনৈতিক’ নয়। যুবভারতীতে মেসির সফর ঘিরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে সবচেয়ে সস্তার টিকিটের দামই ছিল চার হাজার টাকার উপর। বিশ্বজয়ী ফুটবলারকে সামনে থেকে এক বার চোখের দেখা দেখবেন বলে ভক্তেরা টিকিটের দামে বাছবিচার করেননি। কেউ ১০ হাজার, কেউ ১৫ হাজার, কেউ ৩০ হাজার টাকা দিয়েও টিকিট কেটেছেন। ভেঙে ফেলেছেন কয়েক বছরের সঞ্চয়! কিন্তু মেসির এক ঝলকও দেখতে পেলেন না গ্যালারি থেকে। মাঠে যতটুকু সময় মেসি ছিলেন, তাঁকে ঘিরে রাখা হয়েছিল। মেসি এমনিতেই ছোটখাট চেহারার। তার উপর তাঁকে ঘিরে রেখেছিলেন কিছু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সাংবাদিক এবং নিরাপত্তারক্ষী। ছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মোহনবাগান কর্তা সৃঞ্জয় বসুরা। তাঁরা মেসিকে দেখেছেন। তাঁর সই নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে নিজস্বীও তুলেছেন। দর্শকেরা কোথায়! ‘টলিউডের প্রতিনিধি’ হিসাবে মেসির সঙ্গে দেখা করারা সুযওগ পেয়েছিলেন শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়। মেসি, ডি’পলদের সঙ্গে ছবি তিনি নিজের সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। নীচে ভেসে এসেছে কটাক্ষ, ‘ভালই তো দর্শকদের টাকায় নিজেরা ফুটেজ নিয়ে এলে।’ যুবভারতীর বাইরে দর্শকেরা আওয়াজ তোলেন, ‘‘যারা ফুটবলের ‘ফ’ বোঝে না, তারা মেসির কাছে থাকল। আমরা পয়সা দিয়েও কিছু পেলাম না।’’ যুবভারতীতে মেসি থাকতে পেরেছেন সাকুল্যে ১৬ থেকে ১৮ মিনিট। কিছু ক্ষণ মাঠে ঘোরাফেরা করার পরেই তাঁকে বেরিয়ে যেতে হয়। অনেকের দাবি, দর্শকদের ক্ষোভ এবং ক্রোধের আঁচ পেয়েই তড়িঘড়়ি মাঠ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল মেসিকে। নির্ধারিত সময়সূচি বলেছিল, মেসি আরও বেশ কিছু ক্ষণ যুবভারতীতে থাকবেন। তাঁর সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার কথা ছিল মমতা, শাহরুখ খান এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। বেলা ১২টা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী মমতার পৌঁছোনোর কথা ছিল যুবভারতীতে। পরিস্থিতি দেখে মমতা আর মাঠের দিকে এগোননি। মাঝপথ থেকে তিনি ফিরে যান।



