দেবব্রত বড়াই ও হৃত্বিক মণ্ডল : কলকাতা, ১৯ নভেম্বর: কলকাতার রাস্তায় ফের হতে চলেছে শহরের অন্যতম জনপ্রিয় – কলকাতা পুলিশ সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ (Safe Life Safe Drive) হাফ ম্যারাথন (Kolkata Police Half Marathon)। বুধবার কলকাতা পুলিশ জানিয়ে দিল, আগামী বছরের এই প্রতিযোগিতা শুধু শহরজুড়ে স্বাস্থ্যকর দৌড় সংস্কৃতির উদযাপনই নয়, এবার যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার সুযোগও। কলকাতা পুলিশ ঘোষণা করেছে যে কলকাতা পুলিশ সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ হাফ ম্যারাথনের (KPSDSL) ষষ্ঠ সংস্করণে এবার হাফ ম্যারাথন ও ১০ কিমি উভয় দূরত্বেই থাকবে ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬-এর কোয়ালিফায়ার বিভাগ। এই চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ কোরিয়ার দায়েগুতে, ২২ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত।কলকাতা পুলিশ হাফ ম্যারাথন শুধু স্বাস্থ্যকর দৌড় সংস্কৃতির উৎসবই নয়, বরং ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা অ্যাথলেটদের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছানোর এক প্রিমিয়াম প্রতিযোগিতামূলক সুযোগের পথ। ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের (world masters athletics championships 2026) জন্য কোয়ালিফায়ার হিসেবে স্বীকৃতি পেল ২১ কিলোমিটার হাফ ম্যারাথন এবং ১০ কিলোমিটার দৌড়। দক্ষিণ কোরিয়ার ডেগুতে ২২ অগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ – এই সময় অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই বৃহৎ আসরের যোগ্যতা অর্জনের পথ খুলে দিচ্ছে কলকাতা পুলিশের এই ম্যারাথন। ফলে ৩৫ বছরের বেশি বয়সি অ্যাথলেটদের জন্য এটি হয়ে উঠছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। দেশজুড়ে বিভিন্ন বয়সগোষ্ঠীর দৌড়বিদদের কাছে কলকাতা পুলিশের (Kolkata Police) বার্ষিক এই দৌড় বরাবরই জনপ্রিয়। এ বার আন্তর্জাতিক মঞ্চের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ মেলায় আকর্ষণ আরও কয়েকগুণ বাড়বে বলেই মনে করছেন আয়োজকরা। কলকাতা পুলিশের উদ্যোগে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহন দফতরের সহযোগিতায় আগামী ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ এই দৌড় অনুষ্ঠিত হবে। শহরের দৌড়প্রেমীদের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতা শুধু রাস্তা জুড়ে উৎসবের পরিবেশই তৈরি করে না, ট্রাফিক সচেতনতার বার্তাকেও ছড়িয়ে দেয়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহন দপ্তরের সহায়তায় এবং গেমচেঞ্জার্জ-এর উদ্যোগে কলকাতা পুলিশের এই দৌড় অনুষ্ঠিত হবে ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, কলকাতার দূরপাল্লার দৌড়ের সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দেবে। এই উদ্যোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে কলকাতা পুলিশের কমিশনার শ্রী মনোজ কুমার ভার্মা বলেন, “প্রতিটি ভোর আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি মহানগর দাঁড়িয়ে থাকে দু’টি স্তম্ভের ওপর শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতা। সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ এই দুইয়েরই প্রতিচ্ছবি। এটি শুধু একটি বার্তা থেকে এক নাগরিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, আর এই হাফ ম্যারাথন তার জীবন্ত উদাহরণ। যখন দৌড়বিদরা নিয়ম মেনে চলে, একে অন্যকে সাহায্য করে, তখন তারা পুরো কলকাতাকে দেখায় কীভাবে ভাগ করা দায়িত্ব একটি শহরকে এগিয়ে নিয়ে যায়।”
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পাণ্ডে সন্তোষ, বলেন, “একজন দৌড়বিদ হিসেবে আমার লক্ষ্য সহজ বিশ্বমানের নিখুঁততা, আর তার সঙ্গে কলকাতার হৃদয়। ইউনিফর্ম-পেসার থেকে শুরু করে পরিমাপ–নির্ভুল রুট, মেডিক্যাল প্রস্তুতি সবকিছুই এমনভাবে সাজানো যাতে প্রতিটি অ্যাথলেট নিজেকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও সম্মানিত মনে করেন। MAFI–র স্বীকৃতি এবং ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স কোয়ালিফায়ার স্ট্যাটাস সহ এই ইভেন্ট শুধু একটি দৌড় নয় ভারতীয় দৌড়বিদদের জন্য বিশ্বমঞ্চে ওঠার পথ।”
ট্রাফিক বিভাগের ডেপুটি কমিশনার শ্রী ইয়েলওয়াড শ্রীকান্ত জগন্নাথরাও, আইপিএস, বলেন, “অনেকেই বলেন, ভোর ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত রাস্তাগুলো দৌড়বিদদের। কিন্তু আমাদের কাছে, রাস্তা প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ শহরের প্রাণ। তাই এই মাপের দৌড় কয়েক মাস আগে থেকেই পরিকল্পিত হয় রুট অডিট, অ্যাডাপটিভ ট্রাফিক সিগন্যাল, গার্ড রেল, প্রায়োরিটি ক্রসিং আর হাজারো খুঁটিনাটি যার ফলে অ্যাথলেটরা উড়ে যেতে পারে এবং একই সঙ্গে কলকাতাও মসৃণভাবে চলতে পারে।”
মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (MAFI)-র সেক্রেটারি জেনারেল শ্রী ডি. ডেভিড প্রেমনাথ বলেন “ভারতে এটাই প্রথম MAFI স্বীকৃত ইভেন্ট, যেখানে প্রতিযোগীরা তাদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ১০ কিমি ও ২১ কিমি বিভাগে দায়েগু ২০২৬–এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন, যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে। নির্বাচিত প্রতিটি অ্যাথলেটকে অবশ্যই MAFI–র নির্ধারিত সকল নিয়মকানুন মানতে হবে। MAFI গর্বিত যে কলকাতা পুলিশ সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ হাফ ম্যারাথনকে ভারতের মাস্টার্স অ্যাথলেটদের জন্য ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নশিপের অফিশিয়াল কোয়ালিফায়ার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পেরেছে। কোর্সের নির্ভুলতা, টাইমিংয়ের স্বচ্ছতা, বয়সভিত্তিক পথপ্রদর্শন, এবং ক্লিন স্পোর্ট এই সব মানদণ্ড রক্ষার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে এই অনুমোদন আরও শক্তিশালী করে। সকল আগ্রহী অ্যাথলেটদের উদ্দেশে বলি নিরাপদে ট্রেনিং করুন, পরিচ্ছন্নভাবে প্রতিযোগিতা করুন, আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগান। কলকাতা হোক আপনার মাস্টার্স যাত্রার সূচনা।”
গেমচেঞ্জার্জর ফাউন্ডার ডিরেক্টর দিলীপ জয়ারাম বলেন “কলকাতা পুলিশের নেতৃত্বে সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ হাফ ম্যারাথন হয়ে উঠেছে উদ্দেশ্যের সঙ্গে পারফরম্যান্স, বিশ্বমানের রোড রানিং, মাস্টার্স অ্যাথলেটদের সুযোগ, ইন্ডিয়া কেয়ার্সএর মাধ্যমে কারণভিত্তিক অংশগ্রহণ, এবং শূন্য–বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এক অনন্য নকশা। নিবন্ধন করুন, নিরাপদে প্রশিক্ষণ নিন, আপনার পছন্দের উদ্দেশ্য বেছে নিন, আর চলুন শৃঙ্খলাই হোক সবচেয়ে জোরালো উল্লাস, আর প্রতিটি ফিনিশ আমাদের শহরকে আরও নিরাপদ করে তুলুক।”
ইন্ডিয়াকেয়ার্স্র সিইও মীনা দাভে বলেন “কলকাতা পুলিশ সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ হাফ ম্যারাথন ২০২৬ প্রথমবারের মতো সমাজসেবাকে যুক্ত করছে এবং একই সঙ্গে ইভেন্টটিকে ১০০% বর্জ্য–পরিচালিত রূপ দিচ্ছে। নাগরিক সমাজ সংস্থাগুলোকেও রোড সেফটির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে তাদের নিজস্ব লক্ষ্যকে যুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং একই সঙ্গে স্থায়িত্বের ধারণাকে আরও জোরদার করা হচ্ছে।”
ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স হলো ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সের অ্যাথলেটদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, ৫ বছরের বয়সভিত্তিক গ্রুপে ৩৫–৩৯, ৪০–৪৪, ৪৫–৪৯ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পুরুষ ও মহিলা আলাদা বিভাগে অংশ নেন, তবে একই বয়স শ্রেণিতে। যোগ্যতা পূরণ করলে যে কোনও অ্যাথলেটই অংশ নিতে পারেন, তবে তাকে অবশ্যই মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়াতে নিবন্ধিত বা অনুমোদিত হতে হবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে অ্যাথলেটকে তার দেশের মাস্টার্স সংগঠনে নিবন্ধিত থাকতে হবে এবং তাদের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এন্ট্রি প্রদান করতে হবে। ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স ও এশিয়ান মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্সের অফিসিয়াল সহযোগী সংস্থা, যারা ভারতীয় মাস্টার্স অ্যাথলেটদের নির্বাচন ও এন্ট্রি প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। কলকাতা পুলিশ সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ হাফ ম্যারাথনের অফিসিয়াল টাইমিংএর মাধ্যমেই এই এন্ট্রি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। অ্যাথলেটরা দুটি বিভাগে কোয়ালিফাই করতে পারবেন হাফ ম্যারাথন এবং ১০ কিমি।




