বোম হবে? আস্তে বলো! পাশের গলিতে গিয়ে দাঁড়াও, নিয়ে আসছি। দোকান লাগোয়া বাড়ির সিঁড়ির তলায় মুদিখানার দ্রব্যের বস্তা স্তুপ থেকে লুকানো শব্দবাজি নিয়ে খদ্দের সামলাচ্ছে দুই ভাই। এমনিতেই এই মুদিখানা দোকানে বিভিন্ন অবৈধ দ্রব্যের কেনাবেচা চলে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। প্রশাসনের চোখে ফাঁকি দিয়ে লাখ লাখ টাকার শব্দবাজি বিক্রি হল দুই ভাইয়ের মুদিখানা দোকান থেকেই। হাওড়ার দাসনগর থানার ভি রোডে অবস্থিত কোনাকুনি অবস্থিত এক মুদিখানা দোকানের চোরাগোপ্তা শব্দবাজি বিক্রি চলছে। বছর খানেক আগেও এক অসহায় মানুষকে মারধোর অসামাজিকভাবে ভয় প্রদর্শণের অভিযোগ ছিল স্থানীয় থানায়। এভাবেই শহর ও শহরতলির সর্বত্র রমরমিয়ে চলেছে শব্দবাজির ব্যবসা। সোমবার কলকাতার আকাশ ঢেকে ছিল ধোঁয়ায়। কালীপুজোর প্রথম দিনে বেআইনি শব্দবাজি নিয়ে কার্যত তাণ্ডব চালানো হয়েছে। যার ফলে ছাপিয়ে গিয়েছিল বায়ু ও শব্দ দূষণের নির্ধারিত ‘ষুষ্ঠু’ মাত্রা। দ্বিতীয় দিনেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হল না। আর এতেই প্রশ্ন উঠছে উৎসব মানে কি শুধুই অনিয়ন্ত্রিত উল্লাস? যা উদ্যাপন করতে গেলে অন্যের ক্ষতির পরোয়া থাকে না। সকলকে আতঙ্কে রেখে ‘তাণ্ডবকারী’রা করছেন উৎসব উদ্যাপান। আর এতেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে পুলিশের ‘উপযুক্ত’ পদক্ষেপ’ নিয়ে
শুধু মেট্রোই নয়, শব্দবাজির ‘দাপট’ দেখা এবং শোনা গিয়েছে লোকাল ট্রেনেও। যেমন বনগাঁ লাইনে ট্রেনের কামরা লক্ষ্য করে বেশ কয়েক জন চকোলেট বোমা ছুড়ে মারেন। স্বাভাবিক ভাবে আতঙ্ক ছড়ায় যাত্রীদের মধ্যে। কিন্তু চলমান যানে তাঁরা অসহায়। বিরক্ত হলেও করণীয় কিছুই নেই। একই পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায়। চলমান গাড়ি লক্ষ্য করে পটকা, বাজি ছুড়ে দীপাবলি ‘শুভ’ করেছেন অনেকে। এতে যে বড় বিপদ হতে পারে, সে সব যেন এই নাগরিকদের ভাবনাতেই নেই। কিছু জায়গায় পুলিশের টহলদারি দেখা গিয়েছে বটে, কিন্তু ‘খেলা’ হয়েছে পাড়ার ভিতরে। রাত দেড়টার পরেও পাটুলি, যাদবপুর ইত্যাদি এলাকায় শব্দবাজির দাপাদাপির ছাপ এবং প্রমাণ মিলেছে৷ বাড়িতে সমস্যায় পড়েন অসুস্থ, প্রবীণ মানুষেরা। বাইরে পথকুকুররা। সোমবার রাতে শেষ মেট্রো এবং বনগাঁ শাখার কথা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হলেও আরও কিছু ঘটনার খবর মিলেছে। যেমন, দমদমের আগে ও পরে ট্রেনের কামরা লক্ষ্য করে শব্দবাজি ছুড়ে মারার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। বেলগাছিয়া ও দমদম মেট্রো স্টেশনের মাঝামাঝি রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ যাত্রীদের লক্ষ্য করে চকোলেট বোমা ছোড়ার অভিযোগ শোনা গিয়েছে। পূর্ব রেলের বনগাঁ শাখার দুর্গানগর ও বিরাটি স্টেশনের মাঝে চলন্ত ট্রেনের মধ্যে জোরালো আওয়াজের কিছু শব্দবাজি ছোড়ার খবর মিলেছে।
কলকাতা এবং কলকাতা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলি হাওড়াতেও দীপাবলির রাতে ঘরে ও বাইরে, সর্বত্র লাগামছাড়া শব্দ এবং বায়ুদূষণ হয়েছে। শব্দবাজির তাণ্ডবে অস্থির এবং আতঙ্কিত গৃহস্থ। ভয়ে কাঁপছে পোষ্যেরা। এমনকি, পোষ্যের কানে যাতে জোরালো শব্দ প্রবেশ না করে সে জন্য বাড়ির মধ্যে রেখে তাদের কানে তুলো চাপা দিয়ে রাখেন কেউ কেউ। রাত ১২ টার পর তাৎক্ষণিক হিসাব থেকে জানা যাচ্ছে, বালিগঞ্জ ও বিধাননগর এলাকায় দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৪০০-র গণ্ডি পেরিয়েছে। ‘দূষণ’ পরিস্থিতি এমন যে, দিল্লিকে টেক্কা দিয়েছে কলকাতা ও সল্টলেক। রাত ৮টা থেকে ১০টার পর্যন্ত সবুজ বাজি ছাড়া অন্য কোনও বাজি পোড়ানোতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। বাজি পোড়ানোর সময় ছিল ১০টা পর্যন্তই। বড় জোর শব্দ হওয়া উচিত চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ ডেসিবেল। তবে প্রায় রাত ২টো বাজার পরেও দেখা গেল শব্দবাজির তাণ্ডব তখনও কমেনি। ‘উচিত’ মাত্রা ছাপিয়ে শব্দ তখন প্রায় দ্বিগুণ। সুপ্রিম কোর্ট ও পুলিশকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে ‘উল্লাস’। আতঙ্কিত শিশু থেকে বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষেরা। শব্দ-দাপটে অনেকেই অসুস্থ বোধ করছেন। মানুষের পাশাপাশি ভীত পশু ও পাখিরাও। সকলকে আতঙ্কে রেখে ‘তাণ্ডবকারী’রা করছেন উৎসব উদ্যাপান। আর এতেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে পুলিশের ‘উপযুক্ত’ পদক্ষেপ’ নিয়ে। যদিও লালবাজার সূত্রে খবর, নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে রাত ৮টা পর্যন্ত ৪৫ জনকে গ্রেফতার ও ৫২২ কেজি বেআইনি বাজি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ৮টার পর থেকে ‘বিকট’ শব্দের আওয়াজগুলি তবে কী ছিল?
রাত ১০ টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত মৌন ও জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে নির্ধারিত শব্দমাত্রা যথাক্রমে ৪০ ও ৪৫ ডেসিবেল। মঙ্গলবারেও ‘মাত্রাহীন’ হল সেই মাত্রা। জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল ট্যাংরা ও কালিকাপুরে শব্দের মাত্রা ছিল ৭৩ ও ৫৮ ডেসিবেল। মৌন অঞ্চলেও ভাঙল ‘নিয়ম’। বালিগঞ্জে ৬০, লেকটাউনে ৬০, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ৬৪, বেথুন কলেজের কাছে প্রায় ৭৩ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ৭৮ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছেছিল শব্দ। শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দূষণ ছড়িয়েছে বাতাসেও। রাত ১১টার সময়ে পিএম ২.৫ হিসাবে বাতাসের গুণমানসূচক বালিগঞ্জে ১৬৯, যাদবপুরে ২০৪ ও ভিক্টোরিয়াতে ২৫৯ ছিল। প্রসঙ্গত, গুণগত মানের হিসাবে ১০১ থেকে ২০০ পর্যন্ত মাত্রা ‘মাঝারি’ ও ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত ‘খারাপ’। পারটিকুলেট ম্যাটার বা পিএম হল বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা, যার মধ্যে ব্ল্যাক কার্বন ও অন্যান্য দূষক মিশে থাকে। দৈনিক প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ১০ ও পিএম ২.৫-এর পরিমাণ যথাক্রমে ১০০ ও ৬০ মাইক্রোগ্রাম অতিক্রম করলে তা জনস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। এই সীমার বার্ষিক সহনশীল মাত্রা যথাক্রমে ৬০ ও ৪০ মাইক্রোগ্রাম। কলকাতার বাতাসে যে পিএম ২.৫ ধরা পড়ছে, তার অন্যতম প্রধান উৎস জৈব ও কঠিন বর্জ্য পোড়ানো। কিছু মানুষের ‘অতি উল্লাসে’ আতঙ্কিত শিশু থেকে বৃদ্ধ ও অসুস্থেরা। ভীত পশু-পাখিরাও। ঘরের পোষ্যদের তাও নিরাপত্তা আছে। তবে সেটুকুও নেই পথপ্রাণীদের। এতেই প্রশ্ন উঠছে বেআইনি শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ‘উপযুক্ত’ ভূমিকা নিয়ে। যদিও কলকাতা পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মার দাবি, দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলির তুলনায় কলকাতার পরিস্থিতি ভাল। শুধু তাই নয়, গত বারের চেয়ে এ বারে মহানগরে কমেছে শব্দ ও বায়ু দূষণের মাত্রাও। লালবাজার জানিয়েছে, নিয়মভঙ্গকারীদের গ্রেফতার ও জরিমানার পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে বেআইনি বজিও বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। পলিশের বার্তা, সাধারণ নাগরিকদেরকেও সচেতন হতে হবে। দীপাবলি মানে আলোর উৎসব। শব্দ ও ধোঁয়ার ‘দাপটে’ দু’দিনে কার্যত অস্তিত্ব হারাল সেই ‘দীপ’-এরই ‘স্নিগ্ধ’ শিখা। দীপাবলিতে শব্দবাজির দাপট দেখা গিয়েছে সর্বত্র। নির্ধারিত সময়সীমা, নিষেধাজ্ঞা— কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করেই গভীর রাত পর্যন্ত দেদার শব্দবাজি ফাটানো হয়েছে। সেই আবহেই কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মার গলায় শোনা গেল ভিন্ন সুর! মনোজ দাবি করলেন, গত বারের তুলনায় এ বছর কলকাতার পরিস্থিতি অনেক ভাল। ভারতের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় এ বার দূষণও অনেক কম হয়েছে কলকাতায়। অথচ দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৪০০-র গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। ‘দূষণে’ দিল্লিকেও টেক্কা দিয়ে ফেলেছিল কলকাতার বেশির ভাগ এলাকা। রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সবুজ বাজি ছাড়া অন্য কোনও বাজি পোড়ানোতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বেশির ভাগ জায়গাতেই রাত ২টো বেজে গেলেও শব্দবাজির তাণ্ডব কমেনি। কোথাও রাস্তার মাঝে তুবড়ি, চরকি, চকলেট বোমা নিয়ে চলছিল উল্লাস। কোথাও আবার চলন্ত ট্রেনের কামরা লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছিল বাজি। আতঙ্কে সিঁটিয়েছিলেন পথচারী, যাত্রীরা ও বাসিন্দারাও।
সোম রাতে হুগলিতে তিন-তিনটি অগ্নিকাণ্ড। বরাতজোরে মানুষ প্রাণে বাঁচলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগুন লাগার কারণ ফানুস বা বাজি, এই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে প্রাথমিক ভাবে। চন্দননগরের বৈদ্যপোতায় জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটির মণ্ডপে আগুন ধরে যায় সোমবার রাতে। প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে, ফানুস থেকে এই মণ্ডপে আগুন লাগে। দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে মণ্ডপের উপরের অংশ। ওই মণ্ডপে একটি জগদ্ধাত্রী মূর্তিও ছিল। অগ্নিকাণ্ডে মণ্ডপের ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রথমে এলাকার লোকজনই জল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে দমকলকর্মীরা সেখানে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। স্থানীয় কাউন্সিলার ও চন্দননগর জগদ্ধাত্রী পুজো কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক শুভজিৎ সাউ বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার জন্য আবেদন করব। রকেট বা ফানুস না ওড়ালে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এলাকায় একাধিক জায়গায় পুজো হয়। সবাইকে সচেতন হওয়ার আবেদন করব।’ কালীপুজোর রাতে চন্দননগরের বড়বাজারে একটি আবাসনের একটি ফ্ল্যাটেও আগুন লাগে। সেখানে বসবাস করেন এক বৃদ্ধ। আগুন লাগার বিষয়টি নজরে আসার পরেই আতঙ্কে চিৎকার করতে শুরু করেন তিনি। স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই চিৎকার শুনে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকলের দু’টি ইঞ্জিন। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে অন্যান্য ফ্ল্যাটে তা ছড়িয়ে পড়েনি। তবে ধোঁয়ায় ওই প্রবীণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে, দীপাবলির জন্য মোমবাতি জ্বালিয়েছিলেন ওই বৃদ্ধ। অনুমান, সেখান থেকেই আগুন লাগে। হুগলিতে আরও একটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। চন্দননগর তালপুকুর ধারে দু’টি গুমটি ঘর আগুনে ভষ্মীভূত হয়ে যায়। কী ভাবে সেই আগুন লাগল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাজির ফুলকি থেকেই আগুন লাগে বলে দাবি স্থানীয়দের। এই ঘটনায় হতাহতের কোনও খবর নেই। কী ভাবে আগুন লাগল, তা খতিয়ে দেখছে দমকল।





