রক্ষণাত্মক ফুটবল। খেসারত দিতে হল ভারতকে। এএফসি এশিয়ান কাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে এখনও জয় পেল না। সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে কোনও রকমে ড্র। হেরে মাঠ ছাড়ার শেষ মুহূর্তে রহিম আলির গোল মুখরক্ষা হল খালিদ জামিলের ভারতের। এশিয়ান কাপে সুযোগ পেতে হলে সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে জিততে হত ভারতকে। ভারতের খেলা দেখে মনে হল, জয় নয়, ১ পয়েন্ট পেতেই মাঠে নেমেছে তারা। নইলে কেন শুরু থেকে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলালেন খালিদ? ফিফা ক্রমতালিকায় ভারতের ১৩৪ থেকে পিছিয়ে থাকা সিঙ্গাপুর ১৫৮ অনেক বেশি আক্রমণ করছিল। শুরুর কয়েক মিনিটেই গোলের কাছে পৌঁছে যায় সিঙ্গাপুর। গোলরক্ষক গুরপ্রীত সিংহ সান্ধুকে একা পেয়ে গিয়েছিসেন সিঙ্গাপুরের ফুটবলার। কোনও রকমে বিপদ সামলান ডিফেন্ডার উবেইস। বিরতির ঠিক আগে সেই উবেইসের ভুলেই গোল করেন আনোয়ার। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে ধাক্কা খায় ভারত। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার সন্দেশ জিঙ্ঘনকে। প্রায় মাঝমাঠে সিঙ্গাপুরের ফুটবলারকে ফাউল করেন তিনি। কোনও প্রয়োজন ছিল না সেই ফাউলের। ফলে প্রায় গোটা দ্বিতীয়ার্ধ ভারতকে ১০ জনে খেলতে হয়। বাধ্য হয়ে রক্ষণে লোক বাড়াতে হয় খালিদকে। ফলে আক্রমণ আরও কমে যায় ভারতের। সুনীল ছেত্রী শুরু থেকে খেললেও গোটা ম্যাচে দেখা যায়নি তাঁকে। বোঝা যাচ্ছিল, বয়সের ভারে সমস্যা হচ্ছে সুনীলের। শেষ দিকে উদান্তা সিংহ ও রহিমকে নামিয়ে আক্রমণের ঝাঁজ কিছুটা বাড়ান খালিদ। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগে। ৯০ মিনিটের মাথায় নিজের দলের গোলরক্ষকের দিকে পাস দেন সিঙ্গাপুরের এক ফুটবলার। সেই ব্যাক পাস ধরে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন রহিম। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন খালিদ। সংযুক্তি সময়ে দু’বার গোলের কাছে পৌঁছে যায় সিঙ্গাপুর। আনোয়ার আলিকে পরাস্ত করতে পারেনি। দু’টি ক্ষেত্রেই অবধারিত গোল বাঁচান ইস্টবেঙ্গলের এই ফুটবলার। ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়ে ভারত। এই ড্রয়ের পর গ্রুপ সি-তে তিন নম্বরে রয়েছে ভারত। গ্রুপের বাকি তিন দলের বিরুদ্ধে একটি করে খেলেছে তারা। হংকংয়ের কাছে হেরেছে ভারত। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে ড্র করেছে তারা। তিন ম্যাচে ২ পয়েন্ট ভারতের। তিন ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে হংকং। তিন ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর। তিন ম্যাচে ১ পয়েন্ট নিয়ে শেষে বাংলাদেশ। এখনও তিন দলের বিরুদ্ধে একটি করে ম্যাচ খেলবে ভারত। এশিয়ান কাপের যোগ্যতা অর্জন করতে হলে তিনটি ম্যাচেই জয় চায় ভারতের। নইলে মূল পর্বে খেলা হবে না খালিদদের।
সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে ম্যাচ হারলে হয়তো এশিয়ান কাপে খেলার আশা ফুরিয়েই যেত। কিন্তু বঙ্গসন্তান রহিম আলির শেষ মুহূর্তের গোলে অ্যাওয়ে ম্যাচ থেকে এক পয়েন্ট নিয়ে ফিরছে ভারতীয় দল। সারা ম্যাচে ডিফেন্সিভ খেললেও শেষ মুহূর্তে সিঙ্গাপুরের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করেন রহিম। ভারতের সিনিয়র ফুটবল দলের হয়ে এটাই তাঁর প্রথম গোল। কিন্তু গোলের পরেও কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বসেও আক্ষেপ শোনা গেল রহিমের মা সীমা বেগমের গলায়।তিনি বলেন, ‘ইউটিউবে তো দেখায় না। টিভিতেও তো দেখতে পেলাম না। তাই ছেলের গোলটা দেখা হয়নি’। কিন্তু রহিমের গোলেই যে টিম ইন্ডিয়া হার বাঁচিয়েছে সে খবর পেয়েছেন আগেই। কথা বলতে বলতেই আনন্দ ঝরে পড়ছিল তাঁর গলায়। রহিমের খড়দার বাড়িতে গোটা পরিবার উচ্ছ্বসিত। তাঁর মা জানালেন, ‘সকালেই ফোনে কথা হয়েছে রহিমের সঙ্গে। খেলাটা টিভিতে দেখাবে না জানতাম। সকালে কথা বলার সময় আশীর্বাদ করেছি। বলে দিয়েছিলাম যেন মন দিয়ে খেলে, ভাল করে খেলে, টেনশন যেন একদম না করে। ছেলে গোল করেছে, খুবই খুশির ব্যাপার, আনন্দের ব্যাপার। আমি তো সবসময় বলি তুমি শুধু সামনের দিকে তাকাবে, কেউ তোমার জায়গা নিতে পারবে না, ওর বাবাও বলে, আমিও বলি। সবসময় আমাদের আশীর্বাদ ওর সঙ্গে আছে’। এদিন ম্যাচের শেষ দিকে সুনীল ছেত্রীর পরিবর্ত হিসেবে নেমেছিলেন রহিম। হতাশ করেননি ১৪০ কোটি ভারতবাসীকে। গোল করে মান রেখেছেন। রহিমের পরিবার এখন রয়েছেন খড়দার বাড়িতেই। তাঁর দাদা আকবর আলি জানালেন, ভাই তো ফ্ল্যাটও কিনেছে। গাড়ি কিনেছে একটা, সাজিয়েছে বাড়িটা সুন্দর করে। ১৪ তারিখ সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধেই ফিরতি লেগের ম্যাচ রয়েছে। মায়ের হাতের বিরিয়ানি রহিমের সবথেকে প্রিয়। বললেন, ‘ছেলে আমার হাতের খাবার খেতে ভালবাসে। আমার হাতের বিরিয়ানি খুব ভালবাসে। ছেলেকে এলে বলব, কী খাবে তুমি শুধু বলো’। সামনেই কালীপুজো আসছে। বাড়ির পাশের মাঠের পুজোতে প্রতিবার ঠাকুর দেয় রহিমের পরিবারই। বঙ্গ ফুটবলারের মা জানালেন, ‘আমাদের বাড়ির পাশের মাঠেই কালীপুজো হয়, প্রত্যেকবার রহিম ঠাকুর দেয়। এবার গোল করেছে, এবারও বড় করে পুজো হবে। বড় ঠাকুর দেব’।




