Sunday, July 26, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

সকালবেলার সূর্যই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে!‌ আবদুল কালামের উত্থান-কাহিনি শিক্ষা দেয় জেন জি’কেও

RK NEWZ দেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। আবদুল কালাম হয়ে ওঠার গল্প। সকালবেলার সূর্যই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। প্রাচীন এই প্রবাদের কথা স্মরণ করলে বোঝা যায়, জীবনের সবক্ষেত্রে এটা বোধহয় এক শাশ্বত সত্যি। আর সেই ব্যক্তির নাম যদি হয় এপিজে আবদুল কালাম, তাহলে বিষয়টা আরও অন্যতর এক উজ্জ্বলতায় এই সত্যিকে উপস্থাপিত করে। সাধারণ পরিবারের এক ছেলে খ্যাতনামা মহাকাশবিজ্ঞানী হয়েছিল। পরবর্তী সময়েই সেই মানুষটিই হন দেশের রাষ্ট্রপতি। বাবার কাছ থেকে সততা ও আত্ম-শৃঙ্খলার গুণ তিনি পেয়েছিলেন। আবার মায়ের কাছ থেকে ভালো কাজের প্রতি বিশ্বাস ও গভীর সহমর্মিতা! পাশাপাশি আরও বহু মানুষ তাঁকে গড়ে তুলেছিল কালাম হিসেবে। তাঁর এঁহেন উত্থানের কাহিনি শিক্ষা দেবে আজকের নব্য প্রজন্ম- জেন জি’কেও।

১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে জন্ম কালামের। বাবা জয়নুলাবেদিন ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং একটি নৌকার মালিক। মা আশিয়াম্মা ছিলেন গৃহবধূ। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা একেবারেই ছিল না। তবু সততা ও মূল্যবোধ গড়ে তুলেছিল শৈশবের ইমারত। একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল ছোট্ট কালাম। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবৃত্তে মুসলিমদের পাশাপাশি ছিল হিন্দুরাও। এই সময় কিছু মানুষের সংস্পর্শে এসেছিল সে, যে তার মনের ভিতরে একে একে জ্বেলে দিয়েছিল ছোট ছোট মোমবাতি, যা অচিরেই হয়ে ওঠে বাতিস্তম্ভের মতো উজ্জ্বল। এই ছোট্ট লেখায় আমরা শুনব তেমনই একজনের কথা। একটি ঘটনায় তাঁর একটি মন্তব্য কালাম সারা জীবনেও ভুলতে পারেননি। কালামের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন শিবসুব্রহ্মণ্য আইয়ার। এই মানুষটিই তাঁর মনে বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণার বীজ পুঁতেছিলেন। আত্মজীবনী ‘উইংস অফ ফায়ার’-এ কালাম লিখেছিলেন- ‘আমার বিজ্ঞান শিক্ষক শিবসুব্রহ্মণ্য আইয়ার ছিলেন একজন গোঁড়া ব্রাহ্মণ। তাঁর স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল এক মহিলা।’ একদিন, ওই শিক্ষকের বাড়িতেই কালাম আমন্ত্রিত হলেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না! স্বামীর সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসে খাবে এই মুসলিম ছেলেটি! তিনি সটান জানিয়ে দিলেন কালামকে খাবার পরিবেশন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এমন আচরণের সামনে ধৈর্য হারাননি শিবসুব্রহ্মণ্য। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়াও করতে যাননি। বরং পরম যত্নে নিজের হাতেই খাবার বেড়ে দিলেন ছাত্রের পাতে। তারপর তারই পাশে বসে নিজেও খেতে শুরু করলেন। পুরো বিষয়টাই দূর থেকে, বলতে গেলে রান্নাঘরের বাইরে থেকেই দেখছিলেন তাঁর স্ত্রী। কালাম পরে লেখেন, তিনি বুঝতে পারছিলেন, সম্ভবত একজন মুসলিমের খাওয়ার সঙ্গে হিন্দুর পার্থক্য কোথায় সেটাই যেন বুঝে নিতে চাইছিলেন ওই মহিলা।

এরপর তিনি লিখছেন- ‘তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় শিবসুব্রহ্মণ্য আইয়ার আমাকে পরের সপ্তাহান্তেও ফের তাঁকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। আমার দ্বিধা দেখে তিনি আমাকে মন খারাপ না করার পরামর্শ দিয়ে বললেন, যখন তুমি কোনও প্রথা বা সিস্টেমের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেবে, তখন এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি তো হতেই হবে। পরের সপ্তাহে যখন আমি তাঁর বাড়িতে গেলাম, তখন আইয়ারের স্ত্রী আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতেই খাবার পরিবেশন করলেন।’ এই ঘটনা কালামকে জীবনের একটা মস্ত শিক্ষা দিয়েছিল। ‘সিস্টেম’ বদলাতে চাওয়া এবং সেই স্বপ্নকে সত্যি করার পথে কী কী সহ্য করতে হতে পারে সেই শিক্ষা সেদিন তাঁকে তাঁর শিক্ষক দিয়েছিলেন। কেবলই বিজ্ঞানের সাধনা করার অনুপ্রেরণা নয়, জীবন ও সমাজকে চিনে নেওয়ার এক অনন্য পাথেয়ও যেন ছাত্রের মনে তিনি গেঁথে দিয়েছিলেন। সেই সময় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে পেরিয়ার ইভি রামাস্বামীর যে জোরালো আন্দোলন পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা-ও তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শৈশবের এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে তৈরি করেছিল। আরও নিপুণভাবে নির্মিত হয়েছিল সংবেদনশীলতা। তিনি চেয়েছিলেন তার জীবন যেন কোনো অর্থবহ বার্তা বহন করে। তিনি মানুষের মনে আশার সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। যা তাঁকে শিখিয়েছিল তাঁর জীবন। তাঁর অভিজ্ঞতা। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন কালাম। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই প্রয়াত হন তিনি। সেই হিসেবে দশক পেরিয়ে গিয়েছে। তবু আজও তাঁর জীবনের এই সব টুকরো অভিজ্ঞতা, যা তিনি লিখে রেখে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর বলে যাওয়া নানা কথা- আলো দেখিয়ে চলেছে দেশের তরুণদের। কালাম বলে গিয়েছেন, ‘আমার জীবন কারও রোল মডেল হতে পারে— এমন বলার ধৃষ্টতা আমি দেখাতে চাই না। তবে কোনও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুবিধাহীন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা দরিদ্র শিশুটি হয়তো আমার জীবনের গতিপথের যে গল্প, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পেতে পারে।’

এদেশের তরুণদের সান্নিধ্য তাঁর বরাবরই অসম্ভব প্রিয় ছিল। মৃত্যুও হয়েছিল তাঁদেরই সংস্পর্শে! জীবনের শেষ দিনটায় তিনি শিলংয়ে যান পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তোলা নিয়ে একটি বক্তৃতা দিতে। তখনই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে অস্বস্তি অনুভব করেন তিনি। তবে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করেন। ভাষণ শুরু হওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চেতনা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কালাম। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও আর ফেরানো যায়নি তাঁকে। জানা যায়, আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট তাঁকে নিয়ে গিয়েছে অনেক দূরে। যেখান থেকে ফেরা যায় না। তবে সেখানে চলে গেলেও কালাম আজও রয়েছেন। এদেশের যুবাদের সামনে বাতিস্তম্ভ জ্বেলে রেখেছেন তিনি। তাঁর জীবন, তাঁর উক্তি রয়ে গিয়েছে। থাকবে আগামিদিনেও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles