‘যাদবপুর আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিক, ফিরিয়ে দিক ওই মেয়েটিকেও তার বাবা-মায়ের কোলে’। যাদবপুরের ঘটনায় চুপ করে থাকতে পারলেন না দু’বছর আগে মৃত তরুণের বাবা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের সামনের পুকুর থেকে বৃহস্পতিবার রাতে উদ্ধার করা হয়েছে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অনামিকা মণ্ডলের দেহ। কী ভাবে তাঁর মৃত্যু হল, এখনও স্পষ্ট নয়। যাদবপুর থানার পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। আপাতত চার নম্বর গেটের সামনের তিনটি সিসি ক্যামেরায় নজর রয়েছে। রাতে কী ঘটেছিল, তা সেখানে ধরা পড়ে থাকতে পারে। ইতিমধ্যে ওই ছাত্রীর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেন্সিক দল। অনামিকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করছিলেন। তাঁর বাড়ি বেলঘরিয়া নিমতা এলাকায়। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও অনুষ্ঠান চলছিল। অনামিকা সেখানে ছিলেন। চার নম্বর গেটের কাছে ইউনিয়ন রুমের পাশ দিয়ে পুকুরপাড় বরাবর একটি সরু রাস্তা আছে। সেখান দিয়ে গেলে শেষ প্রান্তে রয়েছে দু’টি শৌচাগার। অনামিকা সে দিকে গিয়েছিলেন কি না, সেখান থেকে পুকুরে পড়ে গিয়েছেন কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাত ১০টা ২০ নাগাদ পুকুরে তাঁকে ভাসতে দেখেন ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা। তার পর উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় নিকটবর্তী কেপিসি হাসপাতালে। সেখানে অনামিকাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট দিয়ে ঢুকেই বাঁ দিকে কলা বিভাগের বিল্ডিং। সেখানে ইংরেজি বিভাগও রয়েছে। ওই বিল্ডিংয়ের মুখেই রয়েছে একটি সিসি ক্যামেরা। তা চার নম্বর গেটের দিকে তাক করা। এ ছাড়া, সিকিউরিটি রুমের কাছে একটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে এবং কলা বিভাগের দিকে রয়েছে আরও একটি সিসি ক্যামেরা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কী ঘটেছিল, তা এই সমস্ত ক্যামেরায় ধরা পড়ে থাকতে পারে। আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ছাত্রীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনও বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি। ২০২৩ সালের অগস্টে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রের মৃত্যু ঘিরেও রহস্য দানা বেঁধেছিল। তিনি হস্টেলের আবাসিক ছিলেন। অভিযোগ, মেন হস্টেলে র্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন তিনি। তিন তলার বারান্দা থেকে পড়ে মৃত্যু হয় তাঁর। সেই ঘটনা নিয়ে বিস্তর জলঘোলার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাড়িয়ে দেওয়া হয় নজরদারি। বসে অতিরিক্ত অনেক সিসি ক্যামেরা। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় আই-কার্ড এখনও যাচাই করা হয় না বলে দাবি পড়ুয়াদের একাংশের। শুক্রবারের ঘটনা কী ভাবে ঘটল, তা নিয়ে রহস্য ক্রমে বাড়ছে।
বছর দুয়েক আগে তিনি হারিয়েছেন নিজের সন্তানকে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে বড় ছেলেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেটাই যেন কাল হল! ভর্তির কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরল ছেলের মৃতদেহ। ১৮ বছর হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল এক তরুণের স্বপ্ন। এ বার ফের এক পড়ুয়ার মৃত্যু। ২০২৩-এর পর ২০২৫। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা ফের কাঠগড়ায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ক্যাম্পাসের চার নম্বর গেটের সামনের পুকুর থেকে ওই রাতেই উদ্ধার করা হয় তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অনামিকা মণ্ডলকে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন তাঁকে। অস্বাভাবিক মৃত্যু। শুরু হয়েছে তদন্ত। ২০২৩-এর ৯ আগস্ট রাতে মেন হস্টেলের নীচ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বাংলা প্রথম বর্ষের এক ছাত্রকে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকেও মৃত ঘোষণা করেছিলেন চিকিৎসকেরা। শুক্রবার অনামিকার খবর জানার পর থেকেই যেন নতুন করে শোক ঘিরে ধরেছে পুত্রহারা পিতাকে। কাঁপা গলায় তিনি বলেন, “সন্তান হারানোর বেদনায় আমরা প্রত্যেক মুহূর্তে জ্বলছি। আবার সেই একই ঘটনা। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিক ওরা।” অনামিকার মৃত্যুর জন্য সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন তিনি। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “পড়াশোনার থেকে বেশি নেশায় মন পড়ুয়াদের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উৎসাহেই এ সব চলে। তাঁদের উদাসীনতাই একের পর এক পড়ুয়ার জীবন অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছে। থানা, সরকার— সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়।” নদিয়ার বগুলা থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিল তাঁর ছেলে। বাবার অভিযোগ, যাদবপুরের র্যাগিং-সংস্কৃতির শিকার হয়েছিল সে। তাঁর গলায় আক্ষেপের সুর, “আমার ছেলের মৃত্যুর পর দু’বছর পেরিয়ে গিয়েছে। বদলায়নি কিছুই। পর্যাপ্ত পরিমাণে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়নি। যেগুলি রয়েছে সঠিক ভাবে কাজ করে কি না— তা খতিয়ে দেখা হয় না। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাও নেই তাতে।” তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের শাস্তি দেওয়া হোক।





