‘এবার ভোটে দাঁড়ালে আমরা কেউ খাটবো না’ — কথাগুলো বলতে বলতে একরাশ ক্ষোভ আর অভিমান ঢেলে দিলেন দীর্ঘদিনের তৃণমূল কর্মী। তিনি আবার বর্ষীয়ান মহিলা কর্মীও বটে। এই ক্ষোভ হাওড়া জেলার অন্দরমহলে। এই একজনকে নিয়ে তিতিবিরক্ত দলের অন্যান্য নেতারাও বলে তীব্র অভিযোগের পাহাড়। ‘‘কোথা থেকে টেনে এনে যে দিদি একে বসিয়ে দিলেন বুঝতেই পারলাম না। একদম বাজে একটা ছেলে। এমন মন্তব্য উড়ে আসছে প্রতিনিয়ত। ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের তৃণমূল মহিলা কর্মীর ক্ষোভের বাক্যবান ছিল এমনটাই —‘শুধু আশেপাশ জুড়ে বিহারীদের ছড়িয়ে রেখেছে। কারুর কথা মন দিয়ে শোনে না। সবচেয়ে কাছে থাকা বিহারীটা একদম বাজে লোক। আর নিজে শুধু মঞ্চে উঠে, বৌ কান্নাকাটি করে, বৌকে সময় দিতে পারিনা, বৌ ভালো, বৌ ওমুক, বৌ তমুক। এই আওড়ায়। আরে তোর বৌকে সময় দিতে পারিসনা তো রাজনীতি করছিস কেন? টাকা কামাতে? যত দু নম্বরি কেশব-ওমুক-তমুক-হেনা-তেনা প্রোমোটার দালালদের নিয়ে দহরম-বহরম। আর বিহারীদের ছড়াছড়ি। একদম ফালতু। আমরা বলেই দিচ্ছি, এবার ভোটে দাঁড়ালে আমরা কেউ খাটবো না’’। হাওড়ার শিবপুরে কান পাতলে যত্রতত্র এই কথাই শোনা যাচ্ছে অহরহ। ‘শিবপুর এলাকায় অনেক ভালো সৎ মানুষ রয়েছে। খুঁজে নিয়ে সেইসব মানুষকে বিধায়ক করলে শিবপুরের ভালো হবে।’ বললেন শিবপুরেই এক বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতাকর্মী। আরও জানান বিধায়কের গা ঘেঁষে সবসময় বিরাজ করে পুলিশের খাতায় নাম থাকা কয়েকজন। পুলিশের খাতায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাকেই আবার বেছে বেছে পদও দিয়েছে এই বিধায়ক বলেও অভিযোগ। তীব্র অভিযোগ ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের তৃণমূলে কর্মীদেরও। অভিষেক ব্যানার্জ্জীর সঙ্গে ছবি দিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে। অভিযোগ করলেন কর্মীরা। শিবপুরের কোনও এক ওয়ার্ডে এক ক্লাবের পূজোয় দীর্ঘদিন প্রধান ভুমিকায় ছিলের রাজ্যেরই প্রাক্তন এক মন্ত্রী। সবকিছুতেই সুখ দু:খে অগ্রণী ভুমিকা নিয়েছিলেন সেই স্বচ্ছ ভালোমানুষ হিসাবে পরিচিত সেই মন্ত্রী। হঠাৎই সেই পুজোয় শিবপুর বিধায়ক ও কালো দাগি প্রোমোটার বাহিনীর নামকরন ছাপা ও হস্তক্ষেপে বিচলিত এলাকার মানুষ ও কর্মীরাও। এই রকম অগনিত তীব্রতর অভিযোগের পাহাড় শিবপুর জুড়ে।
সমাজমাধ্যমে ছবি পোস্ট করে বিতর্কের ঝড়। একের পর এক কটু মন্তব্য। অভিষেকের সঙ্গে ছবি লটকে হাওড়ার বিধায়কের হুইপ জারি? এমনটাই আশঙ্কা করছে শিবপুরবাসী। হাওড়ার তৃণমূল শিবিরের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও শিবপুরের বিধায়ককে নিয়ে। নানান অনৈতিক কাজের নিদর্শন ও প্রমাণও রয়েছে। একই ভাবে হাওড়া পুরসভার চেয়ারম্যান ডা: সুজয় চক্রবর্ত্তীকে গলাধাক্কা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন উক্ত বিধায়ক। তাও আবার ক্রীড়ামন্ত্রীর সামনে। এছাড়াও প্রোমোটিং থেকে শুরু করে পুকুর ভরাট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নিজের দাদার সঙ্গে তুমুল গণ্ডগোলের ছবি হাওড়াবাসীর অজানা নয়। মহিলা ব্যাবসায়ীর থেকে টাকা তোলা আদায়ের নজিরও রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে খবর করার জেরে পর্দা ফাঁস হতেই, সাংবাদিককে নোটিশ পাঠানোর হুমকি দিয়ে থাকেন উক্ত বিধায়ক। এ সবই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কানে গেছে বলেই হাওড়াবাসীর ধারনা। হাওড়ার অন্যান্য বিধায়ক ও তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে করুন সম্পর্ক উক্ত বিধায়কের। হাওড়ার মানুষকে হুমকির সুরে বাক্যালাপ করেন উক্ত বিধায়কের সহকারী। এই নানান অভিযোগে উত্তাল শিবপুর বিধানসভা। একের পর এক অভিযোগের পাহাড় উক্ত বিধায়কের নামে। এরই মধ্যে তিনি অভি্যেক বন্দ্যোপাধ্যায়েক সঙ্গে ছবি তুলে তা নিজের সোস্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে ভয় দেখাতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠছে। বিস্তর অভিযোগের পাহাড়ে বসে থাকা বিধায়ককে আর চাইছেন না হাওড়াবাসী এমনটাই রব উঠেছে হাওড়ার বুকে। অভিযোগ, এখন চলছে এলাকা দখল, অন্য এলাকার অনামী দাগী প্রোমোটারকে দিয়ে পুজোর দখলদারীতেও সম্প্রতি ওই বিধায়কের নাম জড়িয়েছে বলে অভিযোগ।
অভিষেকের বৈঠকে হাওড়া পুরভোট প্রসঙ্গ। তৃণমূল সেনাপতি বিধানসভা ভোটের আগে জেলা নেতৃত্বের সঙ্গে সাংগঠনিক বৈঠকে। তৃণমূল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও হাওড়া সদরের দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সেই বৈঠকেই ফের সামনে এল হাওড়া পুরসভায় টানা সাত বছর ভোট না হওয়ার প্রসঙ্গ। দলের অন্দরেই উঠে এল অভিযোগ, নির্বাচনের অভাবে শহরে নিত্যদিনের পুরপরিষেবা ভেঙে পড়েছে, আর তার প্রভাব পড়ছে সরাসরি মানুষের জীবনে। বৈঠকে অভিষেক আশ্বাস দেন, এই ইস্যুতে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলবেন। ২০১৩ সালে সর্বশেষ পুরভোট হয়েছিল হাওড়ায়। তার পর থেকে একাধিক আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে নির্বাচন। ২০১৫ সালে রাজ্য সরকার হাওড়া পুরসভাকে বালি পুরসভার সঙ্গে যুক্ত করে বিল পাশ করে। কিন্তু তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় তাতে অনুমোদন দেননি। পরবর্তীতে আবার বালিকে পৃথক করার জন্যও নতুন বিল পাশ হয়। কিন্তু সেটিও নানা জটিলতায় কার্যকর হয়নি। ফলে ২০১৮ সাল থেকে বকেয়া পড়ে রয়েছে পুরনিগমের ভোট। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে কার্যত কাউন্সিলরশূন্য অবস্থায় চলছে হাওড়া পুরসভা। নাগরিক সমস্যার সমাধানে যে প্রতিনিধি-ব্যবস্থা সবচেয়ে জরুরি, তা না থাকায় প্রশাসনিক শূন্যতা প্রকট হচ্ছে। গত মার্চে বেলগাছিয়া ভাগাড় বিপর্যয়ের ঘটনায় সেই শূন্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে সম্প্রতি বালি পুরসভায় নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক রানা চট্টোপাধ্যায়। তবে এই পদক্ষেপে হাওড়ার তৃণমূল শিবিরের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে। রানার নামেও অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। রানাকে মেনে নিতে পারছেন না বালির জনসাধারনও। এমনটাই কান পাতলে শোনা যায় বালি বিধানসভার অন্দরমহলেও।
বৈঠকে হাওড়ার রাজনৈতিক অঙ্কও খতিয়ে দেখেন অভিষেক। দলের সূত্রে খবর, তিনি আলাদা করে উল্লেখ করেছেন, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে যে ব্যবধান ছিল, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে তা কেন কমেছে, সেই কারণ এখনই খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষত শিবপুর ও মধ্য হাওড়া কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি উত্তর হাওড়া এবং বালির নেতৃত্বকেও সতর্ক করে দেন, যেখানে সামান্য ব্যবধানে তৃণমূল জিতলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল হাড্ডাহাড্ডি। হাওড়া সদর সাংগঠনিক জেলায় মোট ৮টি বিধানসভা আসন রয়েছে। সব ক’টিতেই বর্তমানে তৃণমূলের দখল থাকলেও বিজেপির শক্ত ভিত অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, ভোট না হওয়ার বিষয়টিকে বড় হাতিয়ার করে সামনে আনবে বিরোধীরা। হাওড়ার এক তৃণমূল নেতার কথায়, শহরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মানুষ জানেন। ভোট না হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব দলকে ভোগ করতে হচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটা দলের জন্য বাড়তি চাপ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠকে তাই উন্নয়ন ও সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি পুরভোটের অনিশ্চয়তা বড় রাজনৈতিক অঙ্কে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পরেই এ নিয়ে কী পদক্ষেপ হবে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে হাওড়া তৃণমূল। জনৈক বিধায়ককে নিয়েও বেশ চাপানউতরে দল। মনোজ তিওয়ারী এবার ভোটে দাঁড়ালে আমরা কেউ কোনও কাজ করবো না। এই অভিযোগে উত্তাল হাওড়ার শিবপুর বিধানসভা এলাকার প্রায় অধিকাংশ ওয়ার্ড।





