কলকাতা ময়দানের ‘ফুটবলে’ নাটক। রাজনীতিও? শুক্রবার চাই ‘ড্র’। সাদার্ন সমিতির বিরুদ্ধে ড্র করলেই ডায়মন্ড হারবার লিগের সুপার সিক্সে চলে যাবে। বুধে ভবানীপুর ড্র করায় ডায়মন্ড হারবারের শেষ ম্যাচে ১ পয়েন্ট দরকার। নৈহাটিতে কলকাতা ফুটবল লিগে ভবানীপুর ক্লাব বনাম ইউনাইটেড এসসি-র ম্যাচে রাজনীতির গন্ধ। মঙ্গলে ভবানীপুর প্রথমে জানিয়ে দিয়েছিল, বুধবারের ম্যাচ তারা খেলবে না। মধ্যরাতে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে খেলার কথা জানায়। কেন প্রথমে না খেলার সিদ্ধান্ত? কেনই বা পরে সিদ্ধান্ত বদল? কারণটি ‘হীরকখচিত’। রাউন্ড রবিন লিগে ভবানীপুরের শেষ ম্যাচে জিতলে তাদের পরবর্তী রাউন্ড, অর্থাৎ সুপার সিক্সে যাওয়ার ভাল সুযোগ ছিল। এই ম্যাচ তারা ওয়াকওভার দিলে বা হেরে গেলে পরের রাউন্ডে চলে যাবে ডায়মন্ড হারবার এফসি। ডায়মন্ড হারবার তাদের শেষ ম্যাচে হেরে গেলেও তাদের সুপার সিক্সে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও বাধা থাকবে না। প্রশ্ন, পরের রাউন্ডে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা সত্ত্বেও ভবানীপুর রাউন্ড রবিন লিগের শেষ ম্যাচ খেলতে চাইছিল না কেন?
ডায়মন্ড হারবার এফসি-র কর্ণধারের নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুরের কর্ণধার সৃঞ্জয় (টুম্পাই) বসু। অভিষেক শাসক তৃণমূলের অঘোষিত দু’নম্বর। সৃঞ্জয়ের সঙ্গে তৃণমূলের গদগদ। সৃঞ্জয়ের ভবানীপুর যখন শেষমুহূর্তে বুধবারের ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃত হয়েছিল এই ভেবেই যে, তারা না খেললে অভিষেকের ডায়মন্ড হারবার সুপার সিক্সে চলে যাবে। ময়দানে গুঞ্জন শুরু? অভিষেকের ডায়মন্ড হারবার সদ্যসমাপ্ত ডুরান্ড কাপের ফাইনালে উঠেছিল। সেমিফাইনালে তারা হারিয়েছিল তাদের তুলনায় ‘দৈত্য’ ইস্টবেঙ্গলকে। ফাইনালে অবশ্য নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডের কাছে ৬ গোলে বিধ্বস্ত। সৃঞ্জয়ের দাবি, ‘‘আমাদের সুযোগ নেই। হাতে ফুটবলারও নেই। তাই এই ম্যাচটা খেলতে চাইনি। চুক্তি অনুযায়ী, ৩১ আগস্টের পর আমরা ফুটবলার ধরে রাখতে পারি না। সেই কারণেই আমরা আইএফএ-কে গত বছর থেকে বলে আসছি, লিগের প্রাথমিক রাউন্ডটা অগস্টের মধ্যেই শেষ করে দিতে। তা হলে যাদের পরের রাউন্ডে যাওয়ার আর সুযোগ থাকবে না, তারা ফুটবলারদের ছেড়ে দিতে পারবে। যারা সুপার সিক্সে উঠবে, শুধু তারাই ফুটবলার ধরে রাখবে। ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে দল নামানোর মতো ফুটবলার আমাদের এখন নেই।’’ভবানীপুর এখনও লিগ থেকে ছিটকে যায়নি। ‘বি’ গ্রুপে শীর্ষে ইউনাইটেড এসসির ২৬ পয়েন্ট। ইউনাইটেড কলকাতা দ্বিতীয় ২৩ পয়েন্ট, ডায়মন্ড হারবার তৃতীয় ২২ পয়েন্ট, ভবানীপুর চতুর্থ ২১ পয়েন্ট স্থানে। পরে সৃঞ্জয় বলেন, ‘‘কোচ আমাদের বলেন, হাতে যে ফুটবলার রয়েছে, তাদের দিয়েই উনি ম্যাচ খেলিয়ে দেবেন। ফলে আমরাও ফুটবলের স্বার্থে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’
নৈহাটিতে ভবানীপুর-ইউনাইটেড এসসি ম্যাচ বুধ বিকেল ৩টেয় নৈহাটির বঙ্কিমাঞ্জলি স্টেডিয়ামে বুধবার ভবানীপুর হেরে গেলে তারা ২১ পয়েন্টেই থাকত। শুক্রবার ডায়মন্ড হারবার হেরে গেলেও তারা পরের রাউন্ডে চলে যেত। ফলে সেই ম্যাচের আর গুরুত্ব থাকত না। কিন্তু ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছে। সুপার সিক্সে উঠতে গেলে এই ম্যাচ জিততেই হত বিদ্যাসাগর সিংদের। অমীমাংসিতভাবে শেষ হল গ্রুপ ‘বি’র এই ম্যাচ। সুপার সিক্সের লড়াইয়ে ভেসে রইল ভবানীপুর। বিদ্যাসাগর, সুকুরাম সরদাররা অসহায় ভাব দেখাল। সুকুরাম ৩২ মিনিটে ভালো জায়গায় ফ্রিকিক পেলেও গোল করতে পারেনি ভবানীপুর। ৩৬ মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত ইউনাইটেড স্পোর্টস। গোল লাইন সেভ করে ভবানীপুর ডিফেন্ডার। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য অবস্থায়। দ্বিতীয়ার্ধে ৫৬ মিনিটে সৌগত হাঁসদার ফ্রিকিক বাঁচালেন ইউনাইটেড গোলরক্ষক রৌনক ঘোষ। এর ঠিক পরের মিনিটেই ডান দিক থেকে উঠে এসে সাইড নেটে মেরে বসেন সুকুরাম। রক্ষণ মজবুত রেখে আক্রমণে উঠে এসেছে ইউনাইটেড স্পোর্টস। শেষমেশ কোনও পক্ষই কোনও গোল করতে পারেনি। ড্রয়ের ফলে ১২ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে সুপার সিক্সে নিশ্চিত ইউনাইটেড স্পোর্টস। ১১ ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট নিয়ে বি গ্রুপ থেকে সুপার সিক্সে পৌঁছেছে ইউনাইটেড কলকাতাও। ভবানীপুর ১২ ম্যাচে রয়েছে ২২ পয়েন্টে। পয়েন্ট টেবিলে তারা রয়েছে তৃতীয় স্থানে। ১১ ম্যাচে ২২ পয়েন্ট নিয়ে তালিকায় চতুর্থ ডায়মন্ড হারবার এফসি। ৫ সেপ্টেম্বর সাদার্ন সমিতির মুখোমুখি হবে। সেই ম্যাচ ড্র বা জিততে পারলে সুপার সিক্সে পৌঁছে যাবে ডায়মন্ড হারবার। ডায়মন্ড হেরে গেলে গোলপার্থক্যে এগিয়ে থাকার সুবাদে সুপার সিক্সে পৌঁছে যাবে ভবানীপুর?
জল্পনা শুরু। ভবানীপুরের কর্ণধার সৃঞ্জয় একদা তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদও ছিলেন। এখনও শাসকদলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। বস্তুত, সৃঞ্জয় যে আবার মোহনবাগানের সচিব পদে ফিরতে পেরেছেন, তার পিছনেও নবান্নের ‘বরহস্ত’ রয়েছে। ডায়মন্ড হারবারের সুপার সিক্সে চলে যাওয়ার পথ খুলে যাওয়া কি নেহাতই কাকতালীয়? নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক। তারা যে বুধবারের ম্যাচ খেলতে চাইছে না, এই খবর ছড়ানোর কিছু ক্ষণের মধ্যে ভবানীপুর সিদ্ধান্ত বদলে তড়িঘড়ি আইএফএ-কে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়, তারা বুধবার খেলবে। সূত্রের খবর, ম্যাচ না-খেলার সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক’ বলে মনে করার অবকাশ রয়েছে, এই মর্মে আলোচনা হওয়ার পরেই সিদ্ধান্ত বদল। সেই বদলের কারণ হিসাবে ভবানীপুর জানায় তারা ‘ফুটবল স্পিরিট’, ‘প্রতিযোগিতার মনোভাব’ এবং ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’-এর কথা ভেবেই ম্যাচ খেলছে। সৃঞ্জয় বলেন, ‘‘কোচ আমাদের বলেছেন, হাতে যে ফুটবলার রয়েছে, তাদের দিয়েই উনি ম্যাচ খেলিয়ে দেবেন। ফলে আমরাও ফুটবলের স্বার্থে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ ম্যাচ গোলশূন্য ভাবে শেষ হয়েছে। ভবানীপুর হেরে গেলে অভিষেকের ডায়মন্ড হারবার সহজেই সুপার সিক্সে চলে যেত। আর ভবানীপুর জিতলে ডায়মন্ড হারবারের সেই সুযোগ থাকত না। ম্যাচ ড্র হওয়ায় ডায়মন্ড হারবারের সামনে আরও ১ পয়েন্ট পেয়ে সুপার সিক্স একপ্রকার নিশ্চিত।




