শনিবাসরীয় মহারণ। ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে অভিষেকেই ডুরান্ড কাপের ফাইনালে ডায়মন্ড হারবার। শনি সন্ধ্যায় ফাইনালে সামনে গত বারের চ্যাম্পিয়ন নর্থইস্ট ইউনাইটেজ। প্রতিপক্ষকে সমীহ। প্রতিপক্ষ নর্থইস্ট দলে রয়েছে আলাদিন আজারেইয়ের মতো বিপজ্জনক ফুটবলার। ফাইনালে জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ডায়মন্ড হারবার কোচ কিবু ভিকুনা। কলকাতার তিন প্রধানের সমর্থকদেরও গ্যালারিতে থাকার বার্তা দেন। ফাইনালের আগে ডায়মন্ড হারবার শিবিরে সুখবর হল, ব্রাইট এনোবাখারে এবং সানডের ভিসা সমস্যা মিটেছে। কিবু বলেন, “জীবনে যেমন আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন, তেমন ফুটবলেও আত্মবিশ্বাস খুবই জরুরি। আমাদের দলের নতুন ফুটবলাররা প্রত্যেক দিন উন্নতি করছে। মনে রাখতে হবে, দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে ওরা লড়ছে। তাছাড়াও দলে লুকা মায়েচেন রয়েছে। রয়েছে জবি জাস্টিনের মতো ফুটবলারও। সুতরাং আমাদের দলে তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতা দুইয়ের মিশেলে সমৃদ্ধ। ফুটবলে সমস্ত কিছু সম্ভব। ফাইনালে তো লড়াই করতেই হবে। আমাদের দল পুরো ১০০ শতাংশ উজাড় করে দেবে। লড়াইয়ের মানসিকতা থাকলে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী খেললে সব সম্ভব। নর্থইস্ট যে চ্যাম্পিয়ন দল, সেটা আমরা জানি। কিন্তু সব সময় তো আর ফেভারিট দল জেতে না। অনেক সময় দলের ফুটবলারদের একতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়। সেটা দেখা গিয়েছে ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে। আমরা শুরু থেকেই লড়াই করব। ফাইনালে কেউ এগিয়ে থাকে না। যারা মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকবে তারাই জিতবে। গোটা টুর্নামেন্টটাই আমাদের মোটিভেশন। আমরা মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডানের সমর্থকদেরও পাশে চাইছি।” ডুরান্ড ফাইনালে ফাঁকা গ্যালারি? কলকাতার তিন প্রধানের এক প্রধানও ফাইনালে নেই। গ্যালারি ভরবে কী করে? ডুরান্ড কর্তৃপক্ষর থেকে শুধু নিজেদের ক্লাবের জন্য ২৫ হাজার টিকিট তুলেছে ডায়মন্ড হারবার ক্লাব। রাজ্য ক্রীড়া দফতরের কাছেও টিকিট রয়েছে। শনিবারের যুবভারতীর গ্যালারিও ভর্তি থাকবে। মাত্র চার বছরের মধ্যে আই লিগের মূলপর্বে ওঠার সঙ্গে ডুরান্ডের ফাইনালে ডায়মন্ড হারবারের খেলাকেও বেশ কৃতিত্বেরই মনে করছে ফুটবল মহল। নর্থইস্টকে হারিয়ে ১৩৪তম ডুরান্ড কাপের শিরোপা জিতে ইতিহাস তৈরির সামনে কিবু ভিকুনার দল।

গ্রুপ লিগে মোহনবাগানের কাছে পাঁচ গোল খাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল পুরো দলটা। মোহনবাগানের কাছে হার। তবে পাঁচ গোল খাওয়ার মতো দল? পুরো দলটা হতাশায় জর্জরিত, এই সময় ফোন করল দাদা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। জরুরি নির্দেশ, কোচ কিবু ভিকুনার হোটেলে কোচ-ফুটবলার এমনকী, আমাদের জুনিয়র দলের ফুটবলারদের নিয়ে একটা ডিনারের আয়োজন করার। রাজনৈতিক শিডিউলে যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, ডায়মন্ডহারবার নিয়ে প্রতিদিন খোঁজ নেন অভিষেক। মাঝে মধ্যেই কিবু ভিকুনার সঙ্গে ফোনে কথা বলে। খোঁজ নেন দলের।আই লিগ তৃতীয় ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আলিপুরের পাঁচতারা হোটেলে পার্টি দেওয়া হয়েছিল। সব ফুটবলারদের উৎসাহিত করেন অভিষেক। পরিকল্পনামতো ডিনারের আয়োজন। সেখানে অডিও রেকর্ড শোনানো হয়েছিল কোচ আর সব ফুটবলারকে। নিজের জীবনের নানা ওঠাপড়ার উদাহরণ দিয়ে অভিষেক বলেছিলেন, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, এরাও বিভিন্ন সময়ে বড় ব্যবধানে ম্যাচ হেরেছে। কিন্তু সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস তৈরি করেছে। জীবনে যখন ব্যর্থতা আসবে, তখন সেই ব্যর্থতাকে শক্তির হাতিয়ার হিসাবে প্রস্তুত করতে হবে। তাই এই হারেই সব শেষ হয়ে যায়নি। আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এই বার্তার পরই জামশেদপুর ম্যাচে পুরো ঘুরে যায় দলটা। এখন ডুরান্ড ফাইনালে দল। সাতসকালে অভিষেকের ফোন, ফাইনালে উঠে থেমে গেলেই হবে না। শেষ লড়াইটাও জিততে হবে। আসলে ফুটবলকে ঘিরে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্যাশনটা এরকমই। ২০১৭-র দিকে অভিষেক একদিন বলেছিল, এই যে ডায়মন্ডহারবারের বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলার এত আগ্রহ, সবাইকে নিয়ে একটা বড় করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে কেমন হয়? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু নিয়ে ভাবলেই সহযোদ্ধারা সেই ভাবনার যজ্ঞে নেমে পড়তে বাধ্য। ডায়মন্ডহারবারের সব ক্লাবকে নিয়ে হল ‘এমপি কাপ’। প্রথম বছরেই এমপি কাপ সুপার ডুপার হিট। দেখা গেল এই প্রতিযোগিতা ঘিরে এলাকার মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ। এমপি কাপ যেন একটা বাৎসরিক উৎসব। এমপি কাপ জেতার জন্য ডায়মন্ডহারবারের ক্লাবগুলি বছরের শুরু থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এমপি কাপের ফাইনালে ফুটবলারদের বাইকও উপহার দেওয়া হয়। কোভিডের পর ২০২২-এ ক্লাব খুলে এই মরশুম থেকে কলকাতা লিগে। ক্লাবের নাম, ডায়মন্ডহারবার এফসি। শুরু থেকেই ক্লাবের সঙ্গে ছিলেন প্রাক্তন ফুটবলার গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানস ভট্টাচার্যরা। প্রতিটি এমপি কাপের ফাইনালে ধারাভাষ্য দিতেন মানসদা। কাশীদা, অরিজিৎ সমাজপতি, রাতুল সকলেই। আইএফএর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রথম ডিভিশনে অ্যাফিলিয়েশন। লিগে খেলার জন্য দল তৈরি মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে। দল তৈরি নিয়ে আলোকেশ কুণ্ডু আর নবাব ভট্টাচার্যর সঙ্গে দ্রুত আলোচনা। সারা বছর দলটাকে হোটেলে রেখে প্র্যাকটিস। সঙ্গে পেশাদার পথে চলা। পরামর্শ, এরকম হেভিওয়েট দলে একজন বিদেশি কোচ রাখলে ভালো হয়। ভারতে কোচিং করে যাওয়া চারজন কোচের নামের তালিকায় কিবু ভিকুনার নাম। মোহনবাগানের তৎকালীন সচিব দেবাশিস দত্তর সঙ্গে কথা বলেই কিবুর সঙ্গে মিটিং। কিবুর ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলে কোচিং করাতে রাজি। প্রথম বছরেই লিগে গ্রুপে রানার্স। প্রথম বছরে অল্পের জন্য আই লিগের তৃতীয় ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হওয়া গেল না। এরপর পর পর দু’বছর আই লিগের তৃতীয় ডিভিশন, দ্বিতীয় ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন হয়ে আমরা আই লিগে। আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে মাথার উপর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সব সময় দলের প্রত্যেককে স্বাধীনভাবে ক্লাব চালানোর স্বাধীনতা দেন। কোচকে সব সময় স্বাধীনতা। দলের ব্যাপারে শেষ কথা বলবেন কিবু ভিকুনা। প্রথম ডিভিশন থেকে দলটাকে পেশাদার ভাবে চালানোর পাশাপাশি প্রথম বছরেই সারা শহর জুড়ে আমরা ডায়মন্ডহারবার এফসি-র ব্র্যান্ডিং। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শিখিয়েছেন, নিজেদের সেরাটা দিতে হবে। মাঠের ভিতর কোচ-ফুটবলাররা দেন। মাঠের বাইরে সহযোদ্ধারা। চার বছরের ডায়মন্ডহারবার এফসি আজ কলকাতার দুই বড় দলকে টপকে ডুরান্ডের ফাইনালে। ডায়মন্ডহারবার এফসি বাংলার প্রতিনিধি। চ্যাম্পিয়ন হওয়া মানে, বাংলার ফুটবলের জয়।

ডুরান্ড কাপ ফাইনালের আগের দিন, শুক্রবার বাইপাসের ধারের এক হোটেলে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন আয়োজকেরা। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন না ইস্টবেঙ্গলের কোনও প্রতিনিধি। আমন্ত্রণ জানানোর পদ্ধতিতে খুশি নন লাল-হলুদ কর্তারা। তাই নৈশভোজে কেউ যাননি। প্রতি বারই ডুরান্ড ফাইনালের আগের দিন বিভিন্ন ক্লাবের প্রতিনিধি এবং সেনাবাহিনির কর্তাদের নিয়ে নৈশভোজ আয়োজন করা হয়। এ বার নৈশভোজে ইস্টবেঙ্গলের না-যাওয়ার কারণ অন্য। কর্তা দেবব্রত (নীতু) সরকার বললেন, “আমার কাছে নৈশভোজের আমন্ত্রণ ছিল। তবে স্রেফ হোয়াট্সঅ্যাপ করা হয়েছিল। আর কিছু জানানো হয়নি। এ ভাবে আমন্ত্রণ জানানোয় আমি বিশ্বাসী নই। তাই নৈশভোজে যাইনি। খারাপ রেফারিংয়ের সঙ্গে নৈশভোজে না-যাওয়ার সম্পর্ক নেই। খারাপ রেফারিংয়ের প্রতিবাদ আমরা আগেও বার বার করেছি। আগামী দিনে আবার করব।” অনেকেই মনে করছেন, ডুরান্ডের সেমিফাইনালে খারাপ রেফারিংয়ের প্রতিবাদে নৈশভোজ বয়কট করেছে ইস্টবেঙ্গল। ডুরান্ডের সেমিফাইনালে ডায়মন্ড হারবারের বিরুদ্ধে রেফারি হরিশ কুন্ডুর ভুল সিদ্ধান্ত কেউ মেনে নিতে পারছেন না। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে অতীতে বার বার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্ত্বেও লাল-হলুদের ম্যাচে কেন হরিশকেই ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডুরান্ডের সেমিফাইনালের তিনটে ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। তিনটে ক্ষেত্রে পেনাল্টি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ডায়মন্ড হারবারের দ্বিতীয় গোলের ক্ষেত্রে লুকা মায়চেনের হাতে বল লাগলেও তা রেফারি উপেক্ষা করেছেন বলে আলোচনা হয়েছে দলের অন্দরমহলে।

ডুরান্ড কাপের ফাইনালের আগের দিন শহরের এক পাঁচতারা হোটেলে নৈশভোজে আমন্ত্রিত সস্ত্রীক অভিষেক ডালমিয়া। আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য অবশ্য উপস্থিত ছিলেন এবং ক্রিকেট জগতের মানুষ হয়েও যুবভারতীতে ফাইনাল দেখতে উপস্থিত থাকতে পারেন। শনি সন্ধ্যায় মেগা ম্যাচ। মুখোমুখি ডায়মন্ড হারবার এফসি ও নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি। কলকাতার যুবভারতী স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। গতবারের ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন ও মোট ১৭ বারের চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান সুপারজায়ান্টস এবারের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে গিয়েছে। ১৬ বারের চ্যাম্পিয়ন লাল হলুদও টুর্নামেন্টের বাইরে। এর আগে মহমেডান এফসি তো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে। তাই কলকাতা ফুটবলের সম্মান জড়িয়ে এবার ডায়মন্ড হারবারেরই হাতেই। নর্থইস্ট ইউনাইটেডের কাছে লক্ষ্য হচ্ছে ট্রফি ধরে রাখা, অন্যদিকে ডায়মন্ড হারবারের কাছে লক্ষ্য প্রথমবারেই বাজিমাত করা। কলকাতার এই নতুন দলের জন্য সমর্থনের জন্য তৈরি হচ্ছে বাংলার ফুটবল সমর্থকরা। অন্যদিকে উত্তরপূর্বের ক্লাবগুলোর সমর্থকরা তৈরি হচ্ছে নর্থইস্টের জন্য গলা ফাটাতে। মাত্র একটা ম্যাচ হেরে ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ডায়মন্ড হারবার এফসি, অন্যদিকে প্রতিটা ম্যাচ জিতে প্রবেশ করেছে নর্থইস্ট। ধারে ও ভারে নর্থইস্ট ইউনাইটেড শক্তিশালী। কারণ তারা আইএসএল-এর দল এবং দীর্ঘদিন ধরে খেলছে। অন্যদিকে ডায়মন্ড হারবারের শক্তি হচ্ছে লড়াই। যুবভারতী স্টেডিয়ামে আয়োজিত হবে এই ম্যাচ। ২৩ আগস্ট অর্থাৎ শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে শুরু ম্যাচ। সাধারণত প্রতিটা ম্যাচ সন্ধে সাতটা থেকে শুরু হয়েছে, কিন্তু ফাইনাল ম্যাচটা শুরু হবে সাড়ে পাঁচটা থেকে। ডুরান্ড কাপের ম্যাচ সম্প্রচারের স্বত্ব রয়েছে সোনি স্পোর্টস ইন্ডিয়ার কাছে। টিভিতে সোনি স্পোর্টস ২-তে সরাসরি দেখা যাবে ম্যাচ। অনলাইনে সোনি লিভ অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটেও সরাসরি দেখা যাবে ডার্বি। তবে এটার জন্য সাবস্ক্রিপশন নিতে হবে দর্শকদের। সোনি লিভ ছাড়াও আরও একটি জায়গায় ম্যাচ দেখতে পারবেন সমর্থকরা। জিওটিভি অ্যাপে লাইভ দেখা যাবে এই ম্যাচ। তবে এর জন্য জিও নম্বরের সিম এবং বৈধ রিচার্জ প্ল্যান থাকতে হবে। রিচার্জ থাকলেই বিনামূল্যে ম্যাচ দেখতে পারবেন সমর্থকরা।




